তাই প্রশ্ন, চারুকলার ইতিহাস (হিস্ট্রি) পাব কবে?
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট গ্রাজুয়েট বিভাগে আর্ট হিস্ট্রি পড়াবার সুব্যবস্থা আছে। প্রতি বৎসর কয়েকটি ছেলেমেয়ে এ বিষয় অধ্যয়ন করে ডিগ্রি নেন একটি মিশরি ছেলে সরকারি বৃত্তি পেয়ে এ বিষয়ে পড়তে কলকাতা এসেছে এবং খুব সম্ভব পরে বেকার থাকে।
আমার মনে হয় আর্ট হিস্ট্রি ফার্স্ট ইয়ার থেকেই পড়ানো উচিত। লজিক, সংস্কৃতের ন্যায় যে কোনও ছেলে যেন বিষয়টি বেছে নিতে পারে। যারা এতে অনার্স নেবে তারা যেন জেনারেল আর্ট হিস্ট্রির কোনও বিশেষ অংশ– সঙ্গীত, নৃত্য, চিত্রভাস্কর্য, স্থাপত্য ইত্যাদি যে কোনও একটি বিষয় নিয়ে গভীরতার চর্চা করে।
এইসব গ্রাজুয়েট পরবর্তীকালে স্কুল-শিক্ষকের কর্ম নিলে সেখানে অনায়াসে কলাচর্চার গোড়াপত্তন করতে পারবেন।
***
দিল্লি সম্মেলনে স্কুলের ড্রইংমাস্টারদের নিন্দে করা হয়েছে। জানি, সম্মেলন যা বলেছেন সেসব অতি খাঁটি কথা কিন্তু তবু আমার বেদনা বোধ হল।
ছেলেবেলায় যে দুটি ড্রইংমাস্টার আমাদের ছবি আঁকা শেখাতেন তারা রাফায়েল-টিশিয়ান ছিলেন না; এমনকি আজ বুঝতে পারি, তারা উত্তম ছবির আদর্শ বলতে রঙিন ফটোগ্রাফই বুঝতেন– তখনও অজন্তা-মুগল আমাদের ক্ষুদ্র মহকুমা শহরে এসে পৌঁছয়নি।
সেজান চিত্রকর, জোলা সাহিত্যিক। এঁর ছবি ওঁর চিন্তাধারাকে, ওঁর চিন্তাধারা এঁর ছবির ওপর প্রভাব বিস্তার করে অপূর্ব সৃষ্টির সহায়তা করেছিল।
আমার ড্রইংমাস্টাররা সংস্কৃত এবং ফারসির শিক্ষকদের মতো অবহেলিত, অনাদৃত ছিলেন।
এঁরা যদি কোনও কলা-ঐতিহাসিক শিক্ষকের দিগদর্শন পেতেন, তবে ভ্রান্তপথ বর্জন করে আমাদের ঐতিহ্যগত কলা-সৃষ্টির নির্মাণে নিজেকে অতি সহজে নিয়োজিত করতে পারতেন এবং তাতে করে এঁদের জীবন সার্থক হত।
সবাই অবহেলা করে এদের বলত পটুয়া– এমনকি সহকর্মীগণও এদের সঙ্গে ব্যবহার করতেন এমনভাবে যেন এঁরা ব্রাত্য, অপাঙক্তেয়– যোগাযোগের ফলে জাতে উঠেছেন। ডাঙায় নগণ্য মাইনে, জলে অবহেলা– শেষটায় একজন ঢাকার থিয়েটারের সিন এঁকে আর সব মাস্টারদের পয়সার দিক দিয়ে কানা করে দিলেন। কিন্তু আমি জানি, তিনি সুখী হননি। আমাকে তিনি স্নেহ করতেন; নিজে সেকথা বলেছেন। আজ বুঝতে পারি, কেন তিনি সুখী হননি।
রঙিন ফটোগ্রাফ হোক কিংবা আর যাই হোক, যখন তিনি মাস্টার ছিলেন, তখন তার একটা আদর্শ ছিল, স্টেজের সিন আঁকতে সে আদর্শটি লোপ পেল পেলেন তিনি টাকা।
***
বহু বহু বৎসর পরে আমি বার্লিন শহরে কয়েক মাস বাস করেছিলাম। সেখানে কয়েকজন মেধাবী চিত্রকরের সঙ্গে হৃদ্যতা হয়। এদের একজন আমার ঘরে এ-বই ও-বই নাড়াচাড়া করছেন। তার ভিতর ছিল চয়নিকা– ওই একখানা বই আমি সবসময়ই বিদেশে সঙ্গে নিয়ে যেতুম, বিস্তর বই নিয়ে যাবার উপায় নেই বলে।
সে বইয়ের প্রথম সাদা পাতায় আঁকা ছিল আমার ড্রইংমাস্টারের আপন তুলিতে আঁকা সূর্যোদয়।
আমার জার্মান আর্টিস্ট বন্ধু হতবুদ্ধি হয়ে সে ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন, হোয়াট এ রটন পেন্টিং– বাট হোয়াট মাস্টারি অভার টেকনিক!
.
১৯.
পূর্ব-পশ্চিমের বহু গুণী-জ্ঞানী দার্শনিক-পণ্ডিতজন দেহলি-প্রান্তে সমবেত হইয়া সপ্তাহাধিককাল মানবের মূল্য ও শিক্ষা-দর্শন সম্বন্ধে বহুমুখী আলোচনাকরতঃ স্ব স্ব দেশে প্রত্যাগমন করিয়াছেন– কেহ কেহ ভারতভ্রমণে বহির্গত হইয়াছেন।
চরম সত্য ভঙ্গের প্রাক্কালে সমবেত দার্শনিকমণ্ডলী একবাক্যে স্বীকার করেন, পূর্ব ও পশ্চিমের চিন্তাধারা এবং জীবনদর্শনে কোনওপ্রকারের দ্বন্দ্ব কিংবা অন্তর্নিহিত পার্থক্য নাই।
তৎসত্ত্বেও আমার মনে সে সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ দ্বিধা রহিয়া গিয়াছে। কিন্তু সে তত্ত্ব এস্থলে সবিশদ আলোচনা না করিয়া অন্য একটি বিষয়ের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করি।
পূর্ব-পশ্চিমের স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য আছে সেকথা স্বীকার করিয়া লইলেও তো কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হয় না। আমরা ইউনিটি বা ঐক্যের সন্ধান করিতেছি– সমতা বা ইউনিফর্মিটি আমাদের কাম্য নহে। বঙ্গবাসী পাঞ্জাববাসীর ন্যায় রুটি এবং মাংস না খাইলে কি উভয়ের ঐক্য অসম্ভব? বরঞ্চ বলিব, পাঞ্জাবি এবং বাঙালি উভয়েই আপন আপন বৈশিষ্ট্য স্বীকার করিয়া আপন মনীষার নব নব বিকাশ নব নব উন্মেষণ করিয়া যদি বৃহত্তর ঐক্যে সম্মিলিত হয়, তবে সেই ঐক্যই হইবে সত্য ঐক্য।
প্রাচ্য-প্রতীচ্য সেইরূপ যদি আপন আপন বৈশিষ্ট্য রক্ষা করিয়া সহযোগিতা করে, তাহাতেই তো বৃহত্তর মঙ্গল; বরঞ্চ বলিব, একে অন্যের অণুকরণ করিয়া করিয়া ক্ষুদ্র সমতার সন্ধান করিলে উভয়ই আপন আপন ঐতিহ্যভ্রষ্ট হইয়া আড়ষ্ট এবং ক্লীব দর্শনের পীড়াদায়ক পুনরাবৃত্তি করিবে মাত্র।
***
জনৈক ফরাসিস দার্শনিক বলিলেন, প্রাচী বরঞ্চ প্রতীচী সম্বন্ধে বহু জ্ঞান ধারণ করে, কিন্তু প্রতীচী সেই অনুপাতে প্রাচীর অল্প পরিচয় লাভ করিতে সক্ষম হইয়াছে।
আপাতদৃষ্টিতে তাহার মনে হয়। কারণ যেসব ভারতীয় পণ্ডিত এই দার্শনিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তাহাদের অনেকেই বহু বৎসর ইয়োরোপে বিদ্যাভ্যাস করিয়াছেন এবং সেই সূত্রে ওই মহাদেশ সম্বন্ধে নানাপ্রকারের তত্ত্ব এবং তথ্য সঞ্চয় করিয়া স্বদেশপ্রত্যাগমন করিয়াছেন। কিন্তু প্রশ্ন, মাক্স মুলার, যাকোবি, লেভি, উইন্টারসিস, গেল্ডনার এবং পূর্ববর্তী যুগে যেসব ইয়োরোপীয় পণ্ডিত ভারতবর্ষে বাস করিয়া বহু সংস্কৃত, পালি, প্রাকৃত পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করিয়া উত্তম উত্তম সংস্করণে প্রকাশ করিলেন; কানিংহাম, ফাগুসন, স্টিফেন, হেভেল ভারতীয় কলা সম্বন্ধে যে প্রকারের গবেষণা করিলেন, সেই তুলনায় কয়জন প্রাচ্য দেশবাসী গ্রিক কিংবা লাতিন পুস্তকের চর্চা করিয়া ইয়োরোপীয়দিগকে জ্ঞান দান করিয়াছেন? কয়জন ভারতীয় কিংবা চৈনিক বিদগ্ধ ব্যক্তি ইয়োরোপীয় কলার ক্রমবিকাশ সম্বন্ধে প্রামাণিক এবং সর্বাঙ্গসুন্দর পুস্তক লিখিতে সক্ষম হইয়াছেন? ব্যোটলিঙ্ক-রোই যে বিরাট সংস্কৃত অভিধান প্রণয়ন করিয়া গিয়াছেন, সেই জাতীয় গ্রিক অভিধান যখন ভারতে রচিত হইবে বুঝিব আমরা সত্যই প্রতীচ্য বৈদগ্ধ্যের কিঞ্চিৎ সন্ধান পাইয়াছি।
