ভূত নাচাইয়া পতি ফিরে ঘরে ঘরে।
না মরে পাষাণ বাপ দিলা হেন বরে!
তা, ও, একই কথা। তা পাষাণ বাপ মরুক আর না-ই মরুক, ভাইয়ের
অভিমানে যে বড় লাগে এটি বড়ই খাঁটি, আমাদের পাড়াগাঁয়ের ঘরোয়া বাঙালির গোপন গন্ধে-ভরা বেদনা।
অভিমানে সমুদ্রেতে ঝাঁপ দিল ভাই,
যে মোরে আপন ভাবে তার ঘরে যাই।
১৮.০০– শাঁখ বাজল না, লাউডস্পিকারও থামল না। উত্তরের বারান্দায় গিয়ে অবশ্যি শুধানো যায়। সর্বনাশ! ঈশুর রক্ষতু! আমার মতো মঙ্গলাকাভক্ষী, পাড়ার মুরুব্বিকে উৎসাহিত কৌতূহলী দেখে তারা না আমাকে ডবলাপ্যায়িত করার জন্য আরেকটা লাউডস্পিকার-এর সন্ধানে ভূতের ঘোড় চেপে ছুট লাগায়!
১৯.০০– ডাক্তার যা বলে বলুক না কো, আমার দৃঢ়তম বিশ্বাস exercise physical movements of any sort স্বাস্থ্যের পক্ষে অতিশয় খতরনাক। কিন্তু আর পারা গেল না। প্যান্ডেলের সঙ্গীত উচ্চতর হয়েছে। রাস্তায় নামতে হল।
প্রথমেই শুনলুম, লাউডস্পিকার বলছে, আজ রাত্রি আটটার সময় নির্ধারিত যাত্রা হবে না! আমি প্রথমটায় উল্লাস বোধ করেছিলুম। সঙ্গে সঙ্গে বলল, কাল হবে।
সেটা নিশ্চয়ই মিন লা, স্পি, হবে না। সেটা কি এর চেয়েও খুনিয়া হবে? কে জানে!
এখান থেকে প্রায় একশো গজ দূরে একটি ছোট্ট ঘরে আরেক কালী। প্যান্ডেল লাউডস্পিকার কিছুই নেই। দু চারটি বউ বাচ্চাদের নিয়ে দাঁড়িয়ে। রাস্তায়ও যুবতী মা-ই বেশি। সন্তানের যেন অমঙ্গল না হয়।
২০.১৫ — এবারে আরম্ভ হয়েছে যা তা অতুলনীয়। আধঘণ্টা ধরে রেকর্ড বাজছিল না। এখন organizer-রা বেসুরা গান গাইছেন, মাইক চরম চড়ায় তুলে। তবলাও চলছে। চতুর্দিক নীরব হয়ে যাওয়ার ফলে এবারে আমার suffering চরমে উঠেছে। কালীপূজায় রাত জাগাটা তো স্বাভাবিক।
সকাল ১০.৩০– ফের রেকর্ড চলছে।
***
২১ নভেম্বর ১৯৪৭
মৌলবি বাজার
প্রিয় কণামিয়া,
কিসের কণা ভাবিয়া মনে হদিস নাহি পাই
হলপ তবু করিতে পারি তাহার সাথে নাই
জ্ঞানের যোগ, ইলিম আর বুদ্ধি যারে কয়
পেয়েছ মেলা সুযোগ তবু দাওনি পরিচয়।
না হলে এতদিনে
আসিতে হেথা, বলিতে হাসি, নিয়েছি আমি চিনে
যেমন করে মেঘের ডাকে ময়ূর উঠে নাচি
অলখকর-পরশ পেয়ে কুমুদ উঠে বাঁচি
–তপ্ত-খর নিদাঘ-দাহ দিবার অবসানে–।
অজানা কোন টানে?
কিসের পরিচয়?
ডাউকি হতে ছুটিল জল সাগরে হবে লয়?
মেঘের বাণী, শুক্লা নিশি, সিন্ধু পারের ডাক,
চিনেছি আমি ভাষায় ভরা কভু বা নির্বাক।
উপযুক্ত তত্ত্বকথা করিতে সপ্রমাণ
চলিয়া আসো তুরিতগতি চড়িয়া মোটর যান।
সঙ্গে এনো তাবৎ লেখা তব
অছাপা ছাপা বেবাক মাল প্রাচীন আর নব।
কহেন গুণী, বাড়ির জোরে বিশেষ এক প্রাণী
তেরিয়া হয়ে বীরেরে যায় হানি।
আম্মো তাই সাহস করি তবে
–হুঙ্কারিয়া টঙ্গি ঘরে নাচিয়া ভৈরবে
মনের সুখে করিব গালাগাল,
বলিব, তব তাবৎ লেখা নেহাত জঞ্জাল
রদ্দি ওঁচা, ভ্যাপসা পচা, থাডো কেলাশ অতি
ওরে রে দুর্মতি
বাড়াস কেন এ দুনিয়ার বিভীষিকার ভার
নাম যে কণা, কণামাত্র সন্দেহ নেই আর।
***
১২ জুন ১৯৫৫
মডার্ন কবিতা
এখানে কত রকম গরমই না পড়ে।
এবং বৃষ্টিও নামে কোনওপ্রকারের নেটিশ না দিয়ে।
কাল দুপুর রাতে হঠাৎ ঝমাঝঝম।
সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল, প্রাণ যেন গান গেয়ে উঠল।
আজ সকাল থেকে ভ্যাপসা গরম।
কী করি, কী করি, কী করে গরম ভুলি।
এমন সময় এক বন্ধু এলেন এক ঠোঙা কালো জাম নিয়ে!
কত বৎসরের পরে কালো জাম!
মনে পড়ল,
বন্ধুরা হাসাহাসি করেছিল;
আমি যখন একদিন এই রঙের একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলুম,
কারণ আমার রঙ তখন ছিল ফর্সা,
–আজ আমার ছেলে ফিরোজের মতো।
হার্টটা দুম করে বন্ধ হলে গেল।
***
৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬০
HEINE
[আজ সকালে হাইনের কবিতা অনুবাদ করলুম]
সত্যি সত্যি আমরা দুজনে মিলে
অদ্ভুত এক গড়েছি প্রেমের জোড়া
প্রিয়া মোর পায়ে না পারে দাঁড়াতে ভালো
আর আমি? আমি একবারে হায় খোঁড়া।
ব্যামোতে কাতর সে যেন বেরাল-ছানা
আমি তো কুকুর শুয়ে শুয়ে কাতরাই,
আমার মনেতে সন্দেহ আছে মেলা
দুজনার সাথে বেশ কিছু আছে বাই!
তার মনে লয় কমলিনী তিনি নাকি
কল্পনা করে গড়েছে আপন মনে
ফ্যাকাশে চেহারা– তাই লয় মোর মন
নিজেরে হেরো না, চন্দ্রমাসম গণে!
কমলিনী ওই খুলিল পাপড়িগুলি
চন্দ্রমা পানে তুলে ধরে তার আঁখি
কোথায় না ভরা সফল জীবন পাবে
হাতে তার, হায়, কবিতাটি শুধু রাখি।
***
রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষে
১২ এপ্রিল ১৯৬১
শতাব্দী হয়েছে পূর্ণ। আজি হতে শতবর্ষ পরে
নরনারী বালবৃদ্ধ কাব্য তব বক্ষোপরি ধরে
ভাবিয়া অবাক হবে কী করে যে হেন ইন্দ্রজাল
বঙ্গভূমে সম্ভবিল। পরাধীন দীন দগ্ধ-ভাল
অন্ধভূমি। তারি তমা বিনাশিতে উদিল যে রবি
স্বর্গের করুণা সে যে। বঙ্গ কবি হল বিশ্বকবি।
তার পর এ যুগের লোকে স্মরি মানিবে বিস্ময়
কোন পূণ্য বলে মোরা পেনু তার সঙ্গ, পরিচয়!
***
১৪ এপ্রিল ১৯৬১
নববর্ষ
(১৩৬৮)
স্নেহের মুকুল,
তুমি তো আক্কেল ধরো, বলো তো আমারে
নববর্ষ লয়ে কেন ফাটাফাটি প্রতিবারে!
পুরনো বছরটারে বাতাস কুলার
দিয়ে কেন ঝাঁটা দিয়ে করে দেয় বার?
কী দোষ করেছে, কও, পুরনো বছর
তারেই তো নিয়ে বাবা, করে নিলে ঘর
তিনশ পষট্টি দিন। গেল কি খারাপ,
উঠেনি কি সূর্য বুঝি, দেয়নি কি তাপ?
উঠোন বাজারে মাছ ভালো মন্দ যাই,
ব্লেডেতে কাটিয়া মাছ দিন কাটে নাই?
মদ্য খেয়ে চাচা বুঝি হয় নাই টং
পুপু পুটু মীরামাই করে নাই ঢং
যার যাহা, অভিরুচি? টেটেন পটের
বিবি সেজে বেরোয়নি? মেজদা ঘটের
বুদ্ধিটি খরচ করে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের
মাথায় বুলায়ে হাত এনেছে এন্তের
খরচ করেনি তারো বেশি? পদি পিসি
করেনি ক্যাটের ক্যাট? ভাঙা ফাটা শিশি
করেনি কি বিক্রি, রামা, টুপাইস তরে?
বৌদি চষেনি মাঠ চক্করে চক্করে
টাট্টু ঘোড়া যেন হায়! যাবে অলিম্পিকে।
বড়দা করেনি রাঙ্গা বাড়িটারে পিকে?
পাক মাম গুড়গুড়ি বাবুজি জামাই
করেনি কি দিবারাত্রি শুধু খাই খাই?
রকেতে দুজনা বসি করিনি কি প্ল্যান
টুপাইস কামাবো বলি- খুদা যদি দ্যান!
কে জানে জর্মনি বসে হয়তো ভাইয়া
করে রেখে আছে ব্লন্ড গুণ্ডা দুই বিয়া!
