***
কলকাতার কালীপুজো
১ নভেম্বর, ১৯৬৭
সকাল ৮.০০– বিকটতম পিছ-এ তীব্রতম ভলুমে মাইকবাদ্যসঙ্গীত।
চাপা দেবার জন্য রেডিয়োর একটি যা তা স্টেশনে classical music লাগালুম। ১০%-ও চাপা পড়ল না। কাজে মন দেবার চেষ্টা করলুম। ইয়াল্লা! হঠাৎ সেই classical বন্ধ হয়ে তারাও পাল্লা দিয়ে আরম্ভ করেছে ওই ফিল্মি গানা দিয়ে।
মোটর স্টার্ট নিচ্ছে না। রোজ সকালে সেটাকে অভিসম্পাত দিই। আজ সেটা নন্দনকাননের মধুরতম সঙ্গীত বলে মনে হল– মাইকটা বেশ চাপা পড়েছে। কপাল আমার! অন্য দিনের তুলনায় তাড়াতাড়ি স্টার্ট নিল। প্যান্ডাল যদি লং প্লেইং বাজাত তবে হয়তো বেঁচে যেতুম। দুটো রেকর্ডের মাঝখানের নীরবতাটাই যন্ত্রণার বহর বুঝিয়ে দেয়। কনফুস বলেছেন, নিরেট দেওয়ালটা কোন কাজে লাগছে! লাগছে তো তার মাঝখানের ফাঁকটা দরজাটা। এখানে ঠিক উল্টো। দুটো রেকর্ডের মাঝখানের ফাঁকটা না থাকলে ওই চিৎকারে অভ্যস্ত হয়ে যেতুম। ভাগ্যিস ওরা classical বা রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজাচ্ছে না। বিনোদ বলত, জোর করে কুইনিন খাইয়েছে কিন্তু রসগোল্লা হলে আরও কষ্ট হত। এটা ঠিক নয়। Rape case আসামির উকিল মেয়েটার Connivance ছিল প্রমাণ করতে গিয়ে শুধোল, কিন্তু তোমার ভালো তো লেগেছিল? মেয়েটা বলল, উকিলবাবু, জোর করে কেউ মুখে রসগোল্লা পুরে দিলে সেটা কি তেতো হয়ে যায়?
১০.১৫ — গব্বযন্ত্রণা থেকে মুক্তি?
১০.২৫ — Alas, false pain! ফের শুরু!
১১.৩২ — বেশি না, পাঁচ পাঁচ মিনিটের ভিতর পাঁচবার, পিন গ্রুভে আটকে গাঁ ওঁ উ, গাঁ ওঁ। cf বন্ধ ছিলেম এই জীবনের অন্ধকূপে।
দুপুর ১২.০০ — আমার সুখ-শান্তির বারোটা। চিৎকার করে গলা ফেটে গেল। উত্তরের বারান্দায় গিয়ে বুড়ো শয়তান, আর শয়তানের আণ্ডা দুটোই প্যান্ডেলে জাত-ইডিয়েটের মতো হাঁ করে লৌড-স্পিকারের দিকে তাকিয়ে আছে। খাসা excuse আছে– আমার ডাক শুনতে পায়নি।
আমি লবদ্বার বন্ধ করে অতিষ্ঠ। আর এরা তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে ভূমার সন্ধানে একেবারে লাউডস্পিকারের সদরে।
এরাই মহাজন! পরিবেশ– তা সে যা-ই হোক পছন্দ করতে জানে। আর আমার প্রতিবেশীদের ঈর্ষায় বুক ফেটে যাচ্ছে- আহা, ওরা যদি আমার বদলে এ বাড়ির বাসিন্দা হত।
৩.০০ — ওহ্! কী ভুল করিনু আমি যোগী!
মডারন্ কবিতা আকছারই মেশিনারি থেকে নিরন্তর inspiration পায়। W. C.-তে বসে শুনছিলুম– উপায়ান্তর সেই অন্তত সেখানে একটা গানে বার বার যেন পিন গ্রুভে আটকা পড়ে যাচ্ছে। শেষে বুঝলুম, অহহহা। এটা deliberate নয়া টেকনিক। গাওয়াইয়া ঠিক groove-এ খাবি-খাওয়া পিনের অনুকরণে হুবহু একই শব্দ পাঁচবার তার পর কিছু নির্ঝঞ্ঝাট গান– ফের একই শব্দ পাঁচবার তার ওই গাঁ ও উঁ, গাঁ ও ঊর অনুকরণে গান গাইছে।
১৩.১০ — আহ কি আরাম! মহাসঙ্গীত থেমেছে। ঢাকের বাদ্যি নাকি থেমে গেলে ভালো লাগে (সে আমলে গ্রামাঞ্চলেও শব্দকাতর সজ্জন ছিলেন। আশ্চর্য); যদি বলি এই মহাসঙ্গীতের বদলে আমি ঢাকের বাদ্যি any day prefer করব।
যে গুণী বলেছিলেন।
কী কল পাতাইছ তুমি!
বিনা বাইদ্যে নাচি আমি ॥
তিনি প্যান্ডেলের এ মহাবাদ্য শুনলে কী করতেন।
১৩.৪০ –ওরে মূর্খ, ওরে উন্মাদ, ওরে ঘটোৎকচ! ঝড়া তেরোটি বছর স্কুল কলেজে ইংরেজি পড়ে এই প্রবাদটুকু শিখিসনি, অরণ্যানীর লতাগুলু বিচ্ছিন্ন করে জনপদে পদার্পণ না করা পর্যন্ত হর্ষোল্লাস করে উঠিসনি। কিন্তু সেই বোগদাদি মূর্খ অন্-নশৃশারের মতো আণ্ডার ঝুড়ি সামনে রেখে রাজকুমারীকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখিসনি।
আবার আবার সেই কামানগর্জন।
লাঞ্চ খেতে গিয়েছিল। এবং এরা অত্যন্ত আইনসম্মত আচরণ করে বলে সরকারি কর্মচারীদের মতো আধ ঘণ্টার বেশি লাঞ্চ আওয়ারে নেয় না। সোনারচাঁদরা বাঁচলে হয়!
কামানগর্জন বললুম, কিন্তু কামানগর্জন গম্ভীর সিংহগর্জনের মতো আদৌ কর্ণপটাহ-বিদারক নয়। এমনকি চ্যাংড়া মেশিনগানের ক্যাটক্যাটও প্যান্ডেলের তাণ্ডব-আরাবের সমানে ভূঁইফুলের গানের মতো মোলায়েম।
সেদিন যেন কৃপা আমার করেন ভগবান।
মেশিনগানের সম্মুখে গাই জুঁই ফুলের ওই গান।
গেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। হুঁ। কিন্তু এই প্রচণ্ড প্রলয়বাদ্যের সামনে তিনি কি গাইতেন?
১৪.০০ — রাত্রে আমার সুনিদ্রা হয় না। আমার ভরসা দুপুর। দুপুর থেকে তিনটে অবধি দিবান্দ্রিায়। ঘুম লেগে আসছে, এবার কে যেন কেসিয়াস ক্লে-ই হবে– পেটে মারে মোক্ষম উত্তা। ফের no loudspeaker, এবারে ক্রশের কাঁটা দিয়ে পাঁজরে খোঁচা। চলল নিদেন আধঘণ্টা।… যা দেখলুম, এ যাবৎ আমার ঘুমটাই একমাত্র হিরো যে ওই বিটকেল মুজিকির সঙ্গে lost batle-এর rearguard action লড়ল।
মা কালী! একটা প্রশ্ন শুধব মা, তুমি দুপুরবেলা অ্যাটু দিবান্দ্রিা দাও না?
না এই উৎকট– সেই যে তুলসীদাস বানরদের লঙ্কা আক্রমণের সময়কার বিকট শব্দ অনুপ্রাস সহযোগে প্রকাশ করেছেন–
কটকটহি মরকট বিকট ভট কোটি কোটিগহ ধাবহি—
কী বলছিলুম মা, এই কটকটহি-ই কি তোমার অতি বিকটিনী দিবান্দ্রিা আয়েশের আফিং!
১৭.৩০ — আমি তো অগা। তাই শুধাই, সন্ধ্যা তো হল। দেবীর আরতিটারতি হবে না? তখন তো শাখটাখ বাজার কথা। সেটা শুরু হলে বাঁচি।
ম্যাডাম কালী ভূতনাথের কোন পক্ষ যেন হন। না, সে বুঝি অন্নপূর্ণা–
