(২)
তবে কি পুরানা সাল ছিল দিশি সস্তা
তাহারে বিদায় দিয়া ভরি বস্তা বস্তা
আনিবে জর্মন-মাল কিংবা সে বিলাতি
নববর্ষ- গ্যারান্টিড পাকা সে বেসাতি!
চলিবে দশটি সন এক নব বর্ষে
কই, দিদি, বলে না তো চোখেতে সরষে–
দেখি যবে, বলে কি না এরেও বিদায়
দেওয়া হবে। বারো মাস হয়ে গেল, হায়!
(৩)
তুমি তো সেয়ানা মেয়ে চালাও সংসার
বল দেখি তবে কেন এহেন ব্যাভার?–
বাজে খর্চা একদম– পুরানটা যবে
দিব্য কাজ দিয়ে যায়; নয়া আনা তবে?
***
২ জানুয়ারি ১৯৬২
বর
মুখ খান্ কেনে মেঘলা মেঘলা
চউক্ষে কেনে পানি
ঠোঁট ফুলাইয়া থাকিলে পরে
কেমুন কইরা জানি।
কনে
ছলে বলে বানছো আমায়
কাইরা নিছো মন
কাইলকা যা কইছিলাম, নাগর
আছে কি স্মরণ?
বর
জেওর-বেসর যত চাইছ
ঢ্যাইল্যা দিমু পায়
একটুখানি হাস কন্যা
পরান জ্বইল্যা যায়
***
৯ এপ্রিল ১৯৬২
পিলসুজপরে হেরো জ্বলে দীপশিখা;
চতুর্দিকে যে আঁধার ছিল পূর্বে লিখা
মুহূর্তেই মুছে ফেলে।
কিন্তু অবহেলে
মাভৈ বলিয়া তারে ছেড়ে দেয় স্থান
যে-আঁধার পায়ে ধরে মাগে পরিত্রাণ।
[দিনলিপি-তে উল্লিখিত ব্যক্তিগণের পরিচয়।
১। রাবেয়া– লেখকের স্ত্রী।
২। ফিরোজ লেখকের জ্যেষ্ঠ পুত্র।
৩। ভজু লেখকের কনিষ্ঠ পুত্র।
৪। বিশী–প্রফুল্লকুমার বিশী (লেখক শ্রীপ্রমথনাথ বিশীর মধ্যম ভ্রাতা)।]
পত্রাবলি – ১০
পুত্রদ্বয়কে লিখিত পত্র
(১)
১৬ মে ১৯৫৫
বাবা ফিরোজ,
এই বারে তুমি আমাকে দেখেই চিনতে পারলে। এর পূর্বে যতবার তোমাকে দেখতে গিয়েছি তুমি আড় নয়নে তাকিয়েছ, তোমার মায়ের হাঁটুতে ধাক্কা দিয়ে দিয়ে পেছিয়েছ আর ভেবেছ, এ লোকটা কে?
এবারে চট করে তুমি আমাকে চিনে নিলে।
দু মিনিট যেতে-না-যেতেই বললে, মোটর।
আমি তৎক্ষণাৎ বাক্স খুলে তোমাকে মোটর দিলুম।
তুমি খুশি হয়ে ভজুকে কাছে নিয়ে মোটর নিয়ে খেলা করলে।
খানিকক্ষণ পরে আবার এসে বললে, মোটর।
আমি বললুম, ওই তো ফিরোজ। মোটরটা দেখিয়ে দিলুম।
তুমি বললে না, কঁ-ক-ক, কঁ-ক-ক সেই মোটর।
বুঝতে পারলুম না।
তোমার মা বুঝিয়ে দিলে, তুমি খেলনার মোটর চাও না, তুমি চাও আসল মোটর– যে মোটরে তুমি যখন কটকে এসেছিলে, ঘুরে বেড়াতে।
তোমার ঠিক মনে আছে।
—আব্বু
.
(২)
২৮ মে ১৯৫৫
বাবা ফিরোজ
তুমি যেসব কথা বলো তার মানে কি তুমি বুঝতে পারো? অনেক সময় তুমি না বুঝে আবোল-তাবোল বলে যাচ্ছে, আবার অনেক সময় দেখি যা বলতে চাও ঠিক তাই বলেছ– কথাগুলো আদপেই অর্থহীন নয়।
মাঝে মাঝে তাই ধোঁকা লাগে।
তোমার মা বলছিলেন তুমি নাকি একদিন ঘড়িটাকে নিয়ে বড় ঝুলোঝুলি লাগিয়েছিলে। পাছে তুমি সেটা ভেঙে ফেলো তাই তিনি তোমাকে ওটা কিছুতেই দিতে রাজি হচ্ছিলেন না। শেষটায় তুমি নাকি হঠাৎ মাটিতে পা মেরে বললে, লাথ মারো দুনিয়াকো।
বলেই গুম গুম করে বেরিয়ে গেলে।
পরে জানা গেল, ওটা নাকি ফিলমি গানার এক লাইন! তুমি তোমার আজীজ ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছ।
—আব্বু
.
(৩)
১২ জুন ১৯৫৫
বাবা ফিরোজ,
তুমি নাকি একদিন আদর করে ভজুকে জিগ্যেস করলে, ভজু, তোর আলু কোথায়?
আমি তখন ঢাকাতে তোমাদের দেখতে গিয়েছিলুম। তুমি তোমার আব্বকে পেয়ে ভারি খুশি। কিন্তু ভজুকে ভালোবাসো বলে দুশ্চিন্তা হল– আমার তো তাই মনে হয়– এর আব্দু একবারও আসেনি কেন?
—আব্বু
.
(৪)
৪ জুলাই ১৯৫৫
গাড়িতে পাটনা থেকে হৈদ্রাবাদ
বাবা ফিরোজ,
তুমি বড় হলে আমারই মতো গরমকাতর হবে না প্রার্থনা করি। যদিও জানি গরমকাতর হবেই। কারণ সেপ্টেম্বর মাসেও এক মিনিটের তরে পাখা বন্ধ হলেও তোমার ঘুম ভেঙে যায়।
তাই মনে করি বর্ষা ঋতু তোমার জীবনেও সেই স্থান দখল করবে যেটা সে আমার জীবনে করেছিল।
বর্ষাকালে ফসল হয়, তাই অন্নপ্রাণ মানুষ তাকে ভালোবাসে। যাদের কবিতৃবোধ আছে তারা তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়। আমার কাছে তার সর্বাধিক মূল্য তার শৈতল্যে। তুমি বলবে, সে কি, বাবা তার কবি-মনোবৃত্তি নিয়ে এটাকেই সবচেয়ে বেশি দাম দিলে। হ্যাঁ বৎস, তাই।
যৌবনে আমি ১২৬° ভিতর দিয়ে খাইবারপাস পার হয়েছি। কষ্ট পেয়েছি, কাতর হয়ে পড়েছি, কিন্তু তাই বলে ভ্রমণের উৎসাহ কমেনি।
এখন কিন্তু মস্তকে বজ্রাঘাত হয়। এই গরমে কোথায় যাব! বাড়িতেই প্রাণ অতিষ্ঠ।
.
ভোজপুর। (শাহাবাদ Dt)
কচুরিপানা নেই।
আমবনের জমা-জলে গাছের কালো ছায়া। দেখে মনে হয়, গ্রামের কলহ বর্জন করে, গাওবুড়োরা সভায় বসেছেন।
ধান পর্যন্ত ফলাচ্ছে জলে ক্ষেত ভর্তি করে। মাঝে মাঝে পলিমাটি, আমার দেশে ওরকম নেই। বাঁশ!
বর্ষার ঘোলা জলে সন্ন্যাসীর স্নান। গঙ্গা থেকে দূরে, নিশ্চয়ই ইঁদারা নেই। প্লাটফর্ম : বুড়ি সম্পূর্ণ দন্তহীন– হাতে উল্কি বাহারে-পেড়ে শাড়ি বাসন্তী রঙের ওড়না– হাতে বিরাট বিরাট মকর-মুখো রুপোর বালা–সোনালি রেশমি চুড়ি। নাতনি পাশে। সোনালি ওড়না, কিন্তু হাতে সোনা-রুপো নেই, শুধু কাঁচ। নাতনির বয়স ১০-১২ কিন্তু সবসুদ্ধ নিয়ে বুড়িটাই সুন্দরী।
আরেক মেয়ে লম্বা ঘোমটা টেনে, বস্তার আড়ালে কখনও ঘোমটা টেনে, কখনও মাছি তাড়াতে তাড়াতে আম খাচ্ছে গোগ্রাসে।
(দিলদার নগর)
হঠাৎ মাঠ কতদূরে চলে যায়, আবার কাছে আসে।
বর্ষা এসে আমার দেশ আর এদেশের তফাত ঘুচিয়ে দিয়েছে সম্পূর্ণ না, অনেকখানি। বিহারের বিখ্যাত আমবাগানের পাশ দিয়ে ছুটে চলেছি।
