এতদিন ধরে এই হাঁসের বাচ্চার মতো অপেক্ষা করেছি এই নীল আণ্ডা ফাটবে কবে আর আমি এই বন্দিশালা থেকে বেরিয়ে যাব। কিন্তু যতই ভাবি ততই কূল-কিনারা পাইনে যে এই আণ্ডার বাইরে আছে কী। হাঁসের বাচ্চা ডিমের ভেতরে বসে কী ভাবে জানিনে কিন্তু সে যতই কল্পনার ছুট লাগাক না কেন, সে কি কখনও বাইরের পৃথিবীর কল্পনা করতে পারে? তাই কল্পনা করে কী লাভ।
দুপুররাতে ঘুম ভাঙল দেখি চাঁদ যেন আকাশের আণ্ডাতে ফুটো। অনেকক্ষণ ধরে তাকালুম যে এর ভেতর দিয়ে মুক্তির পৃথিবীর সন্ধান মেলে কি না।
***
২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭
পশ্চিমের তপ্ত বাতাস থেকে থেকে কালোজাম গাছের ঝুঁটি ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে। কৃষ্ণচূড়া আর নিমের চিকন পাতার ঝুঁটি হাতের মুঠির ধরা এড়িয়ে যায় বলে তারা শুধু দোল খায়।
কৃষ্ণচূড়ার বীজপুট চারমাস হল শুকিয়ে গিয়েছে কিন্তু কিছুতেই গাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাটিতে পড়তে চায় না, এরা না খসলে গাছ ফুল ফোঁটাবে কী করে?
এ যেন মরাস্বামী বিধবার সর্বচৈতন্য অভিভূত করে ভূতের মতো চেপে বসে আছে, নতুন প্রেমের নব কিশলয় ফোঁটাতে দিচ্ছে না।
দূরে একফালি নীল সমুদ্র বালুচর আর দিম্বলয়ের মাঝখানে সেঁটে দেওয়া নীল রিবন। এর দিগন্তব্যাপী বিস্তীর্ণতা এখান থেকে কিছুতেই হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। মৃত্যুর মতো এর রঙ নীল। মৃত্যু অহরহ মানুষের চতুর্দিকে রয়েছে তবু মানুষ তার উপস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন নয়– এ সমুদ্রেরও যে শেষ নেই সেকথা মন জানলেও সে সম্বন্ধে সে সচেতন নয়।
গাছ, সবুজ মাঠ, বালুপার, নীলজল– সবকিছু রৌদ্রস্নানে গা এলিয়ে দিয়েছে কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, কেউ শুয়ে শুয়ে। মেঘমুক্ত আকাশ শরতের নীলরঙ এখনও ধরেনি– বর্ষার ভয়ে এখনও সেই পুরনো ফ্যাকাসে বরষাতি দিয়ে গা জড়িয়ে রেখেছে। বাতাস নিষ্কর্মা ভবঘুরের মতো এ-গাছে ও-গাছে ধাক্কা দিচ্ছে– মেঘ বয়ে নিয়ে আসার বেগার থেকে যেন রেহাই পেয়েছে।
জেলেপাড়ার নারকোলপাতার ছাউনি বর্ষায় ভিজে কাকের মতো জবুথবু হয়ে বসে ছিল। রৌদ্রে এখন যেন পালক শুকিয়ে উস্কোখুস্কো হয়েছে। যদি একদিন উড়ে চলে যায় তবে নগ্ন দারিদ্র্যের এই চক্ষুশূল থেকে হেথাকার মানুষ নিষ্কৃতি পাবে।
গতিহীন, বেগহীন নির্জীবতা পুব বাঙলার নদীর পারে গড়ে ওঠা মানুষকে বাড়ির কথা, দেশের কথা বারে বারে স্মরণ করিয়ে দেয়।
***
২৯ জুন, ১৯৫৫
স্বপ্ন
সকালবেলা ঘুম ভেঙে গেল স্বপ্ন দেখে।
কী স্বপ্ন?
আমি যেন একটি রসিকতা তৈরি করার চেষ্টা করছি। ইংরেজিতে যাকে বলে humourous story– ওই যেসব বস্তু Tit-Bits-এ বেরোয়।
কী গল্প তৈরি করলুম।
এক ভদ্রমহিলা ভিখিরি trampকে শুধাচ্ছেন, তা, তুমি কাজকর্ম কর না কেন?
ম্যাডাম, কাজ দেয় কে?
আমি দিচ্ছি। আমার বাগানটি বড় অযত্নে আছে। তুমি ওটাকে একটু সাফ-সুরো করে দাও।
ট্রাম্প একটু ভেবে বলল, তাই সই।
মহিলা বললেন, যন্ত্রপাতির কী কী দরকার হবে তার একটা ফর্দ করা যাক। বলে তিনি একটা কাগজেকোদাল, কাস্তে এসব লিখলেন। তার পর ভ্যাগাবন্ডকে বললেন, আমার আর তো কিছু মনে পড়ছে না। আচ্ছা তুমি কাগজ-পেসি নিয়ে ভেবেচিন্তে বাকিগুলো লেখ। আমি ততক্ষণ তোমার জন্য গোটা দুই স্যানউইচ নিয়ে আসি।
ফিরে এসে দেখেন, ভাগাবন্ড লিখেছে, বেশ বড় বড় হরফে–
একখানা খাট
দুটি বালিশ!
ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবলুম। স্বপ্নে এরকম গল্প বানাবার প্রবৃত্তি আমার হতে যাবে কেন? আমার বন্ধু-বান্ধবদের কেউই তো কখনও বলেননি যে তারা স্বপ্নে রস-গল্প তৈরি করেছেন। কোনও humourist-এর আত্মজীবনীতেও এরকম ঘটনার কোনও উল্লেখ পাইনি।
হ্যাঁ, জানি, কেউ কেউ একটা episode দেখেছেন। যেমন মনে করো রবিবাবুরগানভঙ্গ। তিনি দেখলেন, বড়বাবু (দ্বিজেন্দ্রনাথ) তাঁর বাল্যসখা এক বুড়োকে মজলিসে গান গাইতে হুকুম দিলেন। সে গান গাইতে গিয়ে কেঁদে ফেলল বলে, তিনি তার হাত ধরে তাকে সভাস্থলের বাইরে নিয়ে চলে গেলেন।
তাই নিয়ে রবিবাবু ‘গানভঙ্গ’ লিখলেন।
এরকম ধারা আরও বিস্তর হয়েছে।
কিন্তু এই humourous story by itself, স্বপ্নেই সম্পূর্ণ তৈরি করে দেওয়া–উপরের episode-গুলো, কিছুটা স্বপ্নে বাকিটা জাগরণে– এর উদাহরণ তো জানিনে। এটা কী করে হল।
তখন মনে পড়ল, আইয়ুব, কচিতে, আমাতে একদিন কথা হচ্ছিল, আমরা উপন্যাস, গল্প, কবিতা, নাট্য সবই লিখতে পারি। ওস্রাবে কি না, সে হচ্ছে অন্য কথা। আমরাই হয়তো তখন বলব, এ গল্প কিন্তু গল্প হল না, এ উপন্যাস কিন্তু উপন্যাস হল না, ইত্যাদি। কিন্তু tit-bits-এর গল্প লেখা আমাদের সাধ্যের বাইরে। এসব গল্পের উৎস কোথায়, কী করে আরম্ভ হয়, তার কোনও পাত্তাই আমরা জানিনে। তাই যদি জোর করে কিছু লিখি তবে সেটা হবে nothing : আমাদের ছোটগল্প লোকে বলবে খারাপ ছোটগল্প, উপন্যাস পড়ে বলবে, খারাপ উপন্যাস, ইত্যাদি, কিন্তু আমাদের জোর-করে লেখা tit-bits প্রচেষ্টাকে লোকে চিনতেই পারবে না, বলবে এটা Just nothing।
এ-আলোচনা আমাদের ভিতর কবে হয়েছিল আমার আর মনে নেই। দশ, পনেরো পঁচিশও হতে পারে, কিন্তু এ আলোচনার কথা আমি বহুবার ভেবেছি।
তাই কি আমার অবচেতন মন যে-সমস্যা তার গোপন কোণে সঞ্চয়ন করে রেখেছিল তাই দিয়ে এই গল্প গড়ল?
