সকালবেলা দেখি সমস্ত আকাশ কালো কম্বল দিয়ে পালঙ্ক ঢাকা দিয়েছে দুই মেঘের মাঝখানে ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়ে তারা যেন গভীর নিবিড় আলিঙ্গনে গড়িয়ে পড়েছে, বাকি পৃথিবীকে তারা দেখতে দিতে চায় না।
***
২৬ আগস্ট, ১৯৪৭
অশান্ত ক্রন্দন।
সমুদ্রপারে অশান্ত মন নিয়ে যেতে নেই। মন জানে যে সমুদ্র প্রাণহীন তার গর্জনে অথবা ক্রন্দনে কোনও অর্থ নেই এমনকি গর্জন বা ক্রন্দন শব্দ দিয়ে এই অনুভূতিহীন ধ্বনিকে চৈতন্যের স্তরে নিয়ে আসা ভুল। সুস্থ লোক এ তত্ত্ব জানে, এবং তার অবচেতন মনেও এ সম্বন্ধে কোনও দ্বিধা নেই বলে সমুদ্রের ধ্বনি সম্বন্ধে সে খানিকক্ষণ পরেই অচেতন হয়ে যায়।
কিন্তু যার অবচেতন মন বিক্ষুব্ধ সে বেশিক্ষণ বুদ্ধিমানের মতন স্বীকার করে বসে থাকতে পারে না যে সমুদ্ৰধ্বনি নৈসর্গিক প্রাণহীন শব্দতরঙ্গ মাত্র।
সে শুধায় :
এর হৃদয়ের অন্তস্তলে কী আলোড়ন? সে আলোড়নের কেন্দ্র কোথায়? সে কি দূরে উদয়-দিগন্তেরও পেছনে? সেই আলোড়ন কি দৃষ্টির অগোচরে অন্তরালে উদ্বেলিত হয়ে হয়ে এই সিন্ধুপারে এসে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে শুভ্র অশ্রুজলের কোটি কোটি তে বুদ্বুদে ভেঙে পড়ছে?
না এ অনাদৃতা সুন্দরী? ক্ষণে ক্ষণে নীল অঙ্গনের উপর শুভ্র ফেনের আলিম্পন একে রবিকরকে তার চটুল নৃত্যে প্রলুব্ধ করছে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে নৃত্যভঙ্গের ভয়ে দ্রুততর গতিতে নব নব আলিম্পনের পরিবেশন করে যাচ্ছে। সব চেষ্টা বিফল হল বলে শেষ রশ্মি মেলাবার সঙ্গে সঙ্গে তার সকরুণ ক্রন্দন নিষ্ফল আক্রোশ গর্জনে পরিণত হচ্ছে।
না এ অভিমানী শিশু। দূর থেকে দেখতে পাই ছুটে আসছে, তার ঠোঁট কাঁপছে, ডাইনে-বায়ে কোণের কাছে বিকৃত ভঙ্গি নিয়ে ফাট-ফাট হচ্ছে, তার পর কাছে এসে পারের উপর আছড়ে পড়ে শতধা অশ্রুতে বিগলিত হয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠছে। পারের মা কিন্তু হাত বাড়িয়ে কোল দিলেন না। ওদিকে কে যেন সেই থমকে-গিয়ে-চুপ করে যাওয়া শিশুকে মায়ের পায়ের কাছ থেকে ভাটার টানে সরিয়ে নিল।
না কাণ্ডজ্ঞানবিবর্জিত মাতাল? বেহুঁশ বেখেয়ালে ক্রেমদ্য খাতের উপর বোতলের পর বোতল সোডার ফেনা ঢেলেই যাচ্ছে ঢেলেই যাচ্ছে। আর সেই মাতলামোর ভেতরে ও যতই দেখছে হুইস্কি-সোডার রঙ আসছে না ততই রোষে ক্রোধে গর্জন করে যাচ্ছে?
***
৩১ আগস্ট, ১৯৪৭
চোখ বন্ধ করে বসে ছিলুম। অন্ধকার নেবে আসছিল মুমূর্ষর চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে আসার মতো করে।
ভেতরে ভেতরে যেন সাড়া পেলুম–না সত্যি শুনতে পেলুম আমার পাশ দিয়ে কে যেন চলে গেল।
চোখ মেলে দেখি সত্যি তো। আমার চোখের সামনে দিয়ে কে যেন সমুদ্রের উপর সোনালি জল শাড়ি থেকে নিংড়ে ফেলে ফেলে, সমুদ্রকে যেন দুই ভাগ করে সোজা উদয় সীমান্তে পৌঁছে গিয়েছে– চোখ বন্ধ ছিল, তাকে দেখতে পাইনি। শেষ প্রান্তে পৌঁছে ওই সাদা দেয়াল বেয়ে অভিসারিকা যেন কার বাড়ির ঝরোকায় দাঁড়িয়ে মুখ ফিরিয়ে দেখতে পেল সমুদ্রের উপর তার চলে যাওয়ার সোনালি চিহ্ন ঝলমল করছে– অবাক হয়ে তাই দাঁড়িয়ে আছে। মুখে ঘোমটা নেই।
পূর্ণচন্দ্র।
এক মিনিটের তরে। যার জন্য অভিসার সে যেন তাড়াতাড়ি এসে কালো মেঘের কম্বল দিয়ে সুন্দরীর মুখ ঢেকে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সোনালি রাস্তা যেন মন্ত্রবলে অন্তর্হিত হল। আকাশ-বালুপার সব আড়ি-পাতার-দল অন্ধকারে গা-ঢাকা দিল।
***
১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭
পাছে অন্য লোকের হাতে পড়ে যায় তাই খবরের কাগজ দিয়ে জানাল সন্ধে সাতটা পনেরোয় দেখা হবে। আমাকে খুঁজে নিতে তোমার অসুবিধে হবে না জানতুম তাই ডাঙায়-তোলা নৌকাখানার আড়ালে সমুদ্রের দিকে মুখ করে বসলুম।
রাক্ষুসে সমুদ্র লক্ষ লক্ষ সাদা দাঁত দিয়ে বালুপারের গায়ে অবিরাম কামড়াচ্ছে। সূর্য ডুবল সাড়ে ছটায়। আকাশের শেষ লালিমা মোছর সঙ্গে সঙ্গে বেলাভূমি নির্জন হতে লাগল, সাতটা বাজতে না বাজতে বেশ অন্ধকার হয়ে এল, জনমানবের চিহ্ন নেই, আমি এক নৌকার আড়ালে বসে– মনে কোনও ভয় নেই, আমাকে ঠিক খুঁজে পাবে, কতবার পেয়েছ, কোনওদিন ফাঁকি যায়নি।
নির্জন, অন্ধকার। তোমার আসার সময় হল বলে। চিরকাল এসেছ নিঃশব্দ পদক্ষেপে তাই শুধু চোখ দিয়ে তোমার প্রতীক্ষা করেছি।
অন্ধকারে ঘড়ির কাঁটা জ্বলজ্বল করছে।
তোমার আসার সময় পেরিয়ে গেল।
তার পর সাড়ে সাতটা বাজল, পৌনে আটটা, আটটা। এ কী! তুমি তো কোনওদিন এক মিনিটের তরেও আসতে দেরি কর না। আমাকে কোনওদিন খণ্ডিত বিপ্রলব্ধ করনি। তবে আজ! খবরের কাগজে দিয়ে লগ্ন মুহূর্ত পাকাপাকি জানিয়ে দিয়ে।
এক ঘণ্টা ধরে ঘড়ির কাঁটা দেখছি, বুকের কাটা গম্ভীর হতে গভীরতর হয়ে ঢুকেছে।
সোয়া আটটায় উঠে দাঁড়ালুম।
বাড়ির দিকে চলার মুখে একবার ফের শেষবারের মতো পেছনের দিকে তাকালুম।
কৃষ্ণ-সপত্নের আলিঙ্গনে এতক্ষণ মুখ ঢেকে রেখেছিলে? তারি জটার ভেতর দিয়ে আমার অবমানিত প্রত্যাগমনের ওপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে গিয়ে ধরা দিলে!
লজ্জা পেয়ো না সুন্দরী। বহু লাঞ্ছিত অপমানিত রক্তসিক্ত এ দেহে আর স্থান নেই যেখানে তোমার দৃষ্টিক্ষেপ নব অবমাননার অচেনা বেদনা হানতে পারে।
তুমি যেন বেত্রাহত গায়ে উল্কি সাজালে!
***
২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭
পূব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ প্রায় চতুর্দিকেই ভোলা বলে গোলচক্রবাল, গম্বুজের মতো আকাশ। মনে হয় সোনালি নীল আণ্ডার মাঝখানে বসে আছি হাঁসের বাচ্চাটির মতো– ছেলেবেলায় বারুণীতে জাপানি খেলনা কিনতুম, গোল কাঁচের ভেতর সোনালি হাঁসের ছানা।
