***
১৪ আগস্ট, ১৯৪৭
ফটোগ্রাফ ভোলাবার সময় মানুষ যেরকম কাঠের পুতুল হয়ে বসে, আজ সকাল থেকে জল স্থল আকাশের সেই অবস্থা। যে মেঘের টুকরো ভোর হওয়ার সঙ্গে আড্রয়ারের আকাশে বাসা বেঁধেছিল সে এখনও ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে টেলিগ্রাফের খুঁটিতে শূলবিদ্ধ হয়ে। কৃষ্ণচূড়ার চিকন পাতার স্পন্দন সমস্ত নিস্তব্ধতাকে যেন আরও নিস্তব্ধ রূপ দিচ্ছে, সিগারেটের ডগা থেকে ছাইটুকু মাটিতে পড়ল ডাইনে-বাঁয়ে এতটুকু না পড়ে।
কী অসহ্য থমথমে গরম। যেন ইলেকট্রিক উনুনে রান্না হচ্ছে–আগুনের হল্কা চোখে পড়ে না। কালোজাম পচতে আরম্ভ করেছে, নিমপাতা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে, কলতলার কলরব চিৎকার-বিদীর্ণ। দূর জেলেপাড়া থেকে মেয়েটি কলসি কাঁখে করে, আসছে যেন রোদ্দুরের বন্যা উজান ঠেলে ঠেলে। এদিকে অজন্তা-স্তনওয়ালী মালীবউ সবুজ মেরুনের শাড়ি কাঁচছে, আর থেকে থেকে কপালের ঘাম মুছছে।
এতদিন হাওয়ার গর্জন আর সমুদ্রের হুঙ্কারে বাড়িঘরদোর ডুবে থাকত বলে বাইরের পৃথিবীর বিচিত্র কোলাহল কানে এসে পৌঁছত না। আজ বাতাস নেই, সমুদ্র ক্লান্ত তাই অনেক রকম শব্দ কানে এসে পৌঁছচ্ছে, এমনকি পাশের বাড়ির কড়া পর্দানশিন মুসলমান মেয়েদের জীবনযাত্রার অর্ধগুঞ্জরণ এখানে এসে পৌঁছচ্ছে। রোজার শেষের দিক, কড়া গরম, হাওয়া বন্ধ– তাই সে গুঞ্জরণে ক্লান্তি জড়ানো।
পশ্চিমের বর্ষা এদেশে দুর্বল– পুবের বর্ষার এখনও ঢের দেরি। ইংরেজ রাজত্বের অবসান হয়েছে, দেশি লোক এখনও আসনে বসেননি– তারি ফাঁকে লাহোর কলকাতার অরাজকতার মতো গরমের একচোট নির্মম প্রহার!
***
১৬ আগস্ট, ১৯৪৭
যখন বন্ধু কলকাতায় তখন তিনি কাজকর্মে বড্ড ব্যস্ত থাকেন বলে চিঠিপত্র লিখতে পারেন না, যখন বোম্বায়ে তখন dul feel করেন বলে– তা সে বর্ষার জন্যই হোক অথবা কোনও কাজকর্ম নেই বলেই তোক চিঠি লিখতে পারেন না; তার ওপরে তারই ভাষায় মাঝে মাঝে চিঠি না লেখার spell আসে বলে চিঠি লিখতে পারেন না। এ তিন ফাড়া কাটিয়ে চিঠি লেখার শুভলগ্নে পৌঁছতে পৌঁছতে আমাদের বন্ধুত্ব এত পাকাঁপোক্ত হয়ে যাবে যে তখন চিঠি লেখার আর প্রয়োজন থাকবে না। অনুপস্থিতি নাকিদুই বিরহী হৃদয়কে এক করে দেয়– চিঠিপত্র না লেখার নীরবতা দুই হৃদয়কে আরও এক করে দেয়। তার ওপর আরও একটা প্রবাদ রয়েছে– নীরবতা হিরন্ময়।
আমার হাসি পেল, অগোচরে যে অবহেলা রয়েছে সে-ই এসব ফাড়াজুটিয়ে দিয়ে অপরাধী বিবেকদংশনে প্রলেপ লাগায় এবং অজানাতে সেই প্রলেপ যুক্তির রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। মানুষ ভাবে সে দুর্গন্ধপ্রলেপ বন্ধুর কানে সুধাবর্ষণ করবে।
***
১৭ আগস্ট, ১৯৪৭
কয়েকদিন ধরে বেশিরভাগ সময় হাওয়া বন্ধ থাকে বলে গরমে মনপ্রাণ কচ্ছপের মতো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকে। কাল বেতারে বলল আজ এ অঞ্চলে বৃষ্টি হবে। সকালে দেখি হাওয়ার দিক পরিবর্তন হয়েছে। বর্ষার গোড়ার দিকে যেরকম পশ্চিম দিক থেকে হাওয়া বইত ঠিক সেইরকম গরম বাতাস বইতে শুরু করেছে কিন্তু উপরের আকাশে অষুহীন পাণ্ডুমেঘ পুবসাগর থেকে বেরিয়ে ধীরে ধীরে পশ্চিমের দিকে চলেছে। দুপুরবেলা হাওয়া বন্ধ হয়ে গেল–বিকেলের দিকে ফের পুবের বাতাস বইতে আরম্ভ করল। ভাবছি এই দু-টানার ভেতর আকাশ মনস্থির করে বর্ষণ করবেন কী করে। এযাবৎ যা অবস্থা তাতে তো মনে হয় না বৃষ্টি হবে। অথচ বর্ষায় সমুদ্রের প্রলয়নাচ দেখার জন্যই তো এখানে এলুম। গরমে প্রাণ যায়, নতুন বই আরম্ভ করতে কিছুমাত্র উৎসাহ বোধ করিনে।
জানি অভ্যাস নেই বলে লিখতে কষ্ট বোধ হয়। মানুষ সে কষ্ট নানা কারণে সয়ে নিয়ে বই লেখে। কেউ টাকার জন্য, কেউ প্রিয়জনদের কাছে নিজের দাম বাড়াবার জন্য, কেউ আত্মম্ভরিতার তাড়নায়। আমার বেলা শুধু প্রথম কারণটা খাটে, অথচ টাকার জন্য লিখতে মন যায় না। মনে হয় তার চেয়ে অল্প মেহনতে খবরের কাগজে লিখে টাকা পাওয়া যাবে।
***
১৯ আগস্ট, ১৯৪৭
মাদ্রাজ উপকূল দুই বর্ষার সঙ্গমভূমি। পশ্চিমের বর্ষা এখানে আসে ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গায় পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে। কিন্তু এখানে এসে তার আর সে ঝামর মুখ কৃষ্ণগম্ভীর হয়ে বর্ষণ-আশা সঞ্জীবিত করে না। বাঙালোরেই দেখেছি পশ্চিমের মেঘ পুব দিকে যাচ্ছে কী রকম পানসে চেহারা নিয়ে। এখানে দেখি সে মেঘ প্রায় সাদা হয়ে গিয়ে শরতের হংসও ঝালর হয়ে নীল চন্দ্রাতপে দুলছে। এখান থেকে আর পুব দিকে যেতে চায় না, এক সমুদ্রপার থেকে রওনা দিয়ে অন্য সমুদ্রপারে পৌঁছে আর যেন এগুবার উৎসাহ তার নেই।
তাই কোনও কোনও দিন দেখি অদ্ভুত দৃশ্য। নিচে পশ্চিম সাগরের মেঘ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, আর উপরে পুর্ব সাগরের মেঘ মন্থরগতিতে পশ্চিম দিকে রওনা হয়েছে। আর কখনও-বা দেখি পশ্চিমের মেঘ সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে আর ঊর্ধ্বে, অতি উর্ধ্বে পুবের মেঘে শান্ত শুভ্র স্থির হয়ে সমস্ত আকাশ জুড়ে বসে আছে– দুই স্তরের মাঝখানে বিপুল ব্যবধান।
কখনও আসে পশ্চিম থেকে গরম বাতাস দাক্ষিণাত্যের তৃষ্ণার্ত উষ্ণ জনপদের বহ্নিদাহনের শুষ্ক ও চর্মদাহক। কখনও আসে বাতাস– ভিজে ভিজে। বঙ্গসাগরের ঠাণ্ডা জলের পরশ পেয়ে পেয়ে সুশীতল।
কাল রাত্রে দুই বাতাসে আর দুই সমুদ্রের মেঘে কী বোঝাঁপড়া হল জানিনে। মাঝরাতে বৃষ্টি আরম্ভ হল। বাতাস আর বৃষ্টি এল পশ্চিম দিক থেকে।
