এ দক্ষিণ বাতাস ঠাণ্ডা নয়, গরমও নয়। এ এসেছে সবাইকে চঞ্চল করে দেবার জন্য। কলতলায় সুন্দরী কাপড় সামলে স্নান করতে পারছে না, নারকোল ঘন ঘন মাথা দুলিয়ে আপত্তি জানাচ্ছে, কলতলার শ্রীকৃষ্ণ কিছুতেই বিড়ি ধরাতে পারছেন না– এক চোখ সুন্দরীর দিকে, পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে ভিজে শাড়ি হেলতে হেলতে ধুলোয় জবুথবু হয়ে পড়ে গেল।
***
৯ মার্চ, ১৯৪৭
সমুদ্রের গর্জনে নানা সুর। কোনওদিন অশান্ত উদ্বেলিত হাহাকার, কোনওদিন গুমরে-ওঠা চিৎকার, কোনওদিন একটানা করুণ আর্তনাদ। যেদিন জোর পুরবীয়া হাওয়া বয় সেদিন সব গর্জন ক্রন্দন ছিন্নভিন্ন হয়ে পারের দিকে আসে– আজ হঠাৎ দক্ষিণ বাতাস বন্ধ হল সন্ধ্যাবেলায়, কিন্তু পুবের বাতাস এল না। আজ তাই সমুদ্রের একটানা কান্না লহমার তরে বিরাম নিচ্ছে না। ওদিকে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ চুপচুপ দাঁড়িয়ে, আজ পর্যন্ত তাকে কখনও কোনও শিহরণে বিক্ষুব্ধ হতে দেখিনি।
কে শুনছে? পারে লোকজন নেই। গয়লাপাড়ার শেষ বাতি নিভে গেছে। ডাইনে-বাঁয়ে কোনও কোনও বাড়িতে আলো নেই। চুনকাম করা দেয়ালের গায়ে খোলা জানালা চৌকো চোখের মতো বাইরের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন অন্ধের তাকানোর মতো। মাঠে, রাস্তায়, বালুপাড়ে চাঁদের আলোর অতি ক্ষীণ স্তিমিত আস্তরণ। শুধু সমুদ্রের জলে যেখানে চাঁদের আলো পড়েছে সেখানে গালানো রুপা বালুচর থেকে সোজা পূব আকাশে গিয়ে মিলেছে।
জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ কেমন যেন মনে হয় গাছগুলো সমুদ্রের মতোই প্রাচীন। তারা বহুকাল ধরে এই নানা সুরের কান্না শুনেছে। তারা যেন তার কারণও জানে। একে অন্যের দিকে মাথা দুলিয়ে কী যেন বলে, আর সবাই শিরশিরিয়ে উত্তর দেয়, ছিছি, ছিছি।
***
১১ মার্চ, ১৯৪৭
টলটল নীল রঙ সমুদ্রের আর দূরের আকাশ ঘন বেগুনি। পশ্চিমের আকাশ লাল টুকটুকে মাথার উপরে প্রকাণ্ড এক থাবড়া মেঘ শুভ্রমল্লিকার স্কুপের মতো জমে বরফ হয়ে গিয়েছে। দক্ষিণমুখো হয়ে আডায়ারের দিকে চললুম। যেতে যেতে যেখানে আডায়ার নদীর মোহনা সেখানে পৌঁছলুম। তিনদিকের ঢেউ সেখানে এলোপাতাড়ি মারামারি করে দিশেহারা হয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ছে। নদীর বালু জমে জমে সমুদ্র ওই জায়গাটায় অগভীর। গোটা পাঁচেক জেলে গোড়ালি-জলে সুতো দিয়ে মাছ ধরবার চেষ্টায় ডাইনে-বাঁয়ে চলাফেরা করছে। সাদা পাল তুলে সায়েব মেম আডিয়ার উজিয়ে চেট্টিনারের বাড়ির দিকে হু-হু করে ভেসে যাচ্ছে।
মোহনার জল নীল হতে আরও নীল হতে লাগল। দূরের আকাশ বেগুনি ছেড়ে গাঢ় নীল হতে লাগল। তার পর আস্তে আস্তে দুই নীলে মিলে গিয়ে মোহনার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল– দূরের আকাশ আধা আলো-অন্ধকারে আর প্রায় দেখা যায় না। সে-নীল এমনি জোয়ারের মতো সবকিছু ছাপিয়ে কাছে আসতে লাগল, যেন মনে হল বাতাস পর্যন্ত নীল হয়ে গিয়েছে। জেলেদের ময়লা কাপড় সে-নীলে ছুপিয়ে রঙ ধরল– আমার মনে হল যেন নীল রঙ ঠেলে ঠেলে এগিয়ে চলেছি।
নীলের বানে সবকিছু ডুবে গেছে। আমি চোখ বন্ধ করলুম। সেখানেও নীল চোখের সাদা-কালো কি দুই-ই নীল হয়ে গেল?
***
১২ মার্চ, ১৯৪৭
বালুপাড়ে কত অজানা পদচিহ্ন; তার ওপর সাগরের ঢেউয়ের কী রাগ। দূর থেকে ছুটে এসে আছড়ে পড়ে, আকুলিবিকুলি হাত বাড়িয়ে মুছে দেবার কী অবিরাম চেষ্টা। উঁচু পাড়িতে বসে দেখি জোয়ারের জলে মুছেই যাচ্ছে, মুছেই যাচ্ছে। এদিকে লোকজনের চলাচল কমে গেল– নতুন পদচিহ্ন আর পড়ে না বললেই চলে। তার পর যতদূর দেখা যায় সাগরের জল ধুয়ে-মুছে সবকিছু পরিষ্কার করে দিয়েছে।
এবারে ভাটার জল আর এগুচ্ছে না। ঢেউ ভেঙে পড়ে লম্বা লম্বা হাত আর এগিয়ে দিচ্ছে না– এখন যেন লক্ষ লক্ষ রুপার নূপুর নেচে নেচে নাচের গরমে গলে গিয়ে জলে মিশে যাচ্ছে।
সকালবেলা গিয়ে দেখি সেই পরিষ্কার থোয়া-মোছা বালিতে সাগর ঝিনুকের গয়না সাজিয়ে দিয়ে গিয়েছে প্রথম আলোর সঙ্গে সঙ্গে তারা ঝিলমিলিয়ে উঠল।
বাড়িতে কুড়িয়ে আনলুম। দেখি ম্লান হয়ে গিয়েছে। যেন সুন্দরীর কানের দুল ভেলভেট বাক্সের কফিনে সাজানো ফ্যাকাসে মড়া।
***
১ আগস্ট, ১৯৪৭
এবারে প্রথম সন্ধ্যায় সমুদ্রপারে গিয়ে দেখি সবাই যেন বেজার মুখে ঘাড় বাঁকিয়ে বসে আছেন। আপন আপন কাজ করে যাচ্ছেন সবাই কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে–বাড়ির বউরা যেমন মুখ গুমসো করে শাশুড়ির দিকে না তাকিয়ে আপন আপন কর্তব্য করে যান। আমি এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করে অনেকক্ষণ চলাফেরা করলুম কিন্তু কেউ একটিবারের তরেও সাড়া দিল না।
সবাই আপন আপন কাজ করলেন আবার–মিনিমাল রেট। আকাশ যে সেই শেলেটের রঙ নিয়ে মুখভার করে বসেছিল তার রদবদল হল না– জল যে সেই ফিকে শ্যাওলার রঙ নিয়েছিল তার উপরে সূর্যাস্তের কোনও রঙ এক লহমার তরে গায়ে মাখল না– আকাশ কতকগুলি সাদা মেঘের বুদ্বুদ ওড়াচ্ছিল, সেগুলোকে নড়াল না, ফাটাল না- জলের ঢেউ একটানা দড়ি পাকিয়ে পারে এসে সেগুলোকে কুটিকুটি করে ছিঁড়ল, পারের দিকে এগুলো না, সমুদ্রের দিকে পেছুল না।
আমি অবহেলায় লজ্জা পেয়ে বাড়িমুখো হলুম।
এমনকি সেই চারজন জুয়াড়ি ঠিক সেইরকম উবু হয়ে আধা আলো-অন্ধকারে জুয়া খেলছে। এই চারটি মাস যেন হা করে তাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গিয়েছে।
