সমুদ্রের একটানা কান্নার শব্দ ভেসে আসছে তার মাঝে ডুকরে ডুকরে ওঠা গুমরানো।
নিমগাছ ডাল নাড়ছে, কালোজামের পাতা কাঁপছে, বারান্দার টবে বেতগাছের সরু পাতা ক্ষণে ক্ষণে শিউরে উঠছে। দিনের বেলা তারা রঙ বদলায়, পাখি এসে বসে তাদের উপর, সূর্যোদয়, মধ্যাহ্ন, সূর্যাস্তের কতরকম আলো তাদের উপরে এসে পড়ে তারা সাড়া দেয়– তাদের জীবনপ্রবাহের ঢেউ ওঠে, তারাও দোল খায়।
রাতের অন্ধকারে তারা শুধু সমুদ্রের কান্না শোনে একমনে। বাতাস সে কান্না বয়ে নিয়ে আসে, আর সেই বাতাসের ডাকে সাড়া দিয়ে সমুদ্রের কান্নার সঙ্গে যেন নিজেকে মিশিয়ে দেয়।
সমুদ্রের কান্না থামে না বলে, ওদেরও যেন চোখে ঘুম নেই।
এখানকার সংসারের সবরকমের সবকটা তার যেন সমুদ্রের কান্নার সুরে বাঁধা।
***
২৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
এ খেলা তিন দিন ধরে চলেছে। আকাশ, সমুদ্র, বালুচর বিবর্ণ নিরস দেখায় যতক্ষণ সূর্য একেবারে না মিলিয়ে যান– মনে হয় আর সবাই ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে আছে। সূর্য যেই অদৃশ্য হলেন অমনি কী গোপন লিঙ্গায় আকাশের গাল লাল হয়ে আসে– ভাসুরঠাকুর উঠে যাওয়া মাত্রই কনেবউ যেরকম বরের দিকে তাকায় প্রথমটায় আমেজ লাগার মতো। তারি রেশ সমুদ্রের ফেনায় লেগে গোলাপি হয়ে ওঠে– তারি পরশভেজা বালুতে গোলাপজামের ফিকে গোলাপি হয়ে দেখা দেয়। তার পর বরবধূতে কী কথাবার্তা হয় জানিনে কনে লজ্জায় টকটক করতে থাকেন– ফাগ সিঁদুর সব রঙ তখন হার মানে। আর সে লালের সঙ্গে সঙ্গে পেছনের আকাশ হয় ঘন আসমানি, দূর সমুদ্রের জল হয় গাঢ় পান্না। সমস্ত দিনের মূৰ্ছা কেটে গিয়ে বিরাট আকাশ যেন গমগম করে ওঠে, পশ্চিম থেকে পূর্ব জুড়ে লম্বা লম্বা রঙিন কড়িকাঠ যেন পূর্বাচল-অস্তাচলকে জুড়ে দেয়, দূরে পূর্বদক্ষিণ সমুদ্রের কোণে।
তার পর লজ্জা-শরম ইশারা ঠারাঠারিতে কী খুশি হয় জানিনে। দেখতে পাই পিদিম যেন কেউ নিভিয়ে দিল–না বউ কালো কপাটের দরজা বন্ধ হয়ে দিল–না কালো ঘোমটা বুকের কাছে টেনে নিয়ে চোখের সামনে থেকে সরে গেল।
দুপুররাতে ঘুম ভাঙল। এ কী কাণ্ড! চাঁদের আলো জ্বালিয়ে আকাশে তারার খুঁটি সাজিয়ে বরবধূতে এ কী খেলা!
***
৫ মার্চ, ১৯৪৭
এখানে সমুদ্র নেই। উঁচুনিচু সবুজ ক্ষেত– মাঝে মাঝে তালগাছ আলের কাছে কাছে দাঁড়িয়ে। তার পর নিকটের পাহাড়– বড় বড় পাথর স্পষ্ট দেখা যায়। তার পেছনে দূরে নীলাভ পাহাড়–লাইন বেঁধে পূর্ব থেকে পশ্চিম সমস্ত দক্ষিণ দিকটা জুড়ে।
বর্ষাকালে এই শুষ্ক দেশও সম্পূর্ণ সবুজ হয়ে গিয়েছিল। বসন্তের মাঝামাঝি এরি মধ্যে ফালি-ফালি হলদে ক্ষেত বেরিয়ে সেই সবুজের গা যেন জখম করে দিয়েছে। সূর্যোদয় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত আকাশ কী যেন এক ব্যাকুল ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে পালাবার পর্যন্ত সাহস নেই। পুবের বাতাস আসছে ধীরে ধীরে এবং অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে। মৃদু তপ্ত এবং অল্প ভেজা-ভেজা। দু দিন বাদেই পশ্চিম থেকে হু-হু করে জোর গরম বাতাস বইতে আরম্ভ করবে– পুবের বাতাস এখনও ঠিক মনস্থির করতে পারছে না এদেশে আর আসবে কি না।
পশ্চিমের হাওয়া পৌঁছায়নি বটে কিন্তু গাছপালা তার খবর পেয়ে কোন আশ্চর্য উপায়ে সব ফুল গা থেকে আছড়ে ঝেড়ে ফেলেছে। রক্তকরবী ঝরেনি কিন্তু কে যেন আগুন দিয়ে ঝলসে দিয়ে গেছে। শুধু বুগনভিলিয়া আর রাঙাজবা–না স্থলপদ্ম?
এতদিন ঘুঘু ডাকেনি। তপ্ত মধ্যাহ্নে এখন অত্যন্ত ক্লান্ত তার ডাক। সমস্ত শীতকাল ময়ুর নিস্তব্ধ ছিল– মেঘ আসার কোনও লক্ষণ নেই তবু থেকে থেকে ডেকে ওঠে- ঠিক যেন একা কৈ? একা কৈ প্রশ্ন শুধায়।
প্রজাপতি পালিয়েছে দল বেঁধে না তাদেরও ডানা ঝলসে গিয়েছে?
দুপুরবেলা শুনি সাপে যেন কার গলা চেপে ধরেছে– চাপা গলার ক্ষীণ আতাঁরব– এ কি খাণ্ডবদহনের অগ্নিদেব পশুভোজনের বিরাট পর্ব আরম্ভ করেছেন?
না দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ? সবুজ অঞ্চল গেছে- এখন যেন অঙ্গবস্ত্র প্যাঁচের পর প্যাঁচ খুলছে গ্রীষ্ম দুঃশাসন– বীভৎস আনন্দ যেন ধীরে ধীরে রসিয়ে রসিয়ে চেখে নিচ্ছে।
ধরণীর কণ্ঠশাস রুদ্ধপ্রায় পত্রে-পুষ্পে; কূপগহ্বর অন্ধের উপড়ে নেওয়া চোখের মতো– ক্ষতজল পর্যন্ত শুকিয়ে গিয়েছে।
***
৬ মার্চ, ১৯৪৭
বহুকাল পূর্বে পড়েছিলুম কারও ফাঁসির হুকুম হলে রুশিয়ার কোনও জেলে জেলরের সুন্দরী মেয়ে কয়েদির সঙ্গে প্রেম করতে যেত। তার সঙ্গে ফুর্তিফার্তি করে সেপাইদের হুকুম দিত শেকলে তাকে আচ্ছা করে বাঁধবার। তার পর সেই মেয়ে সিগারেট ফুঁকে ফুকে আসত তার কাছে। হাত দিয়ে জ্বলন্ত সিগারেট তার চোখের দিকে আস্তে আস্তে এগিয়ে ধরত। কয়েদি মাথা পেছনের দিকে সরিয়ে সরিয়ে দেওয়াল পর্যন্ত নিয়ে যেত। তার পর মেয়েটা সিগারেট চোখের উপর চেপে ধরে তাকে অন্ধ করত।
দ্বিপ্রহরের সূর্য ক্রমেই কুয়োর জলের দিকে এগিয়ে আসছে– জল ক্রমেই নিচের দিকে নেবে যাচ্ছে। তার পর শেষের দিন আসবে যেদিন তার স্বচ্ছ টলটলে চোখ কানা হয়ে গিয়ে থলথলে ঘোলাটে কাদা বেরুবে। তার পর তা-ও শুকিয়ে গিয়ে কাঠ হয়ে যাবে।
থাকবে অন্ধকার কোটর।
***
৮ মার্চ, ১৯৪৭
সকালবেলা এবারে এখানে পৌঁছে দেখি চতুর্দিক নিস্তব্ধ। পুব-পশ্চিম কোনও দিক থেকে হাওয়া বইছে না। সমুদ্রে জমে-যাওয়া নীল বরফের মতো স্কেটিং রিঙ্ক। তারি মাঝখানে দক্ষিণ বাতাস এল জোর। নারকোল, গোলমোহর, নিম, বকুল দুলে উঠল– সমুদ্রের সর্বাঙ্গ যেন হাল চালিয়ে চষে দিল।
