বারান্দায় বসে আছি জোর আলো জ্বালিয়ে কিন্তু বাইরের অন্ধকারের গায়ে যেন আঁচড়টি কাটতে পারছে না। ওদিকে সমুদ্র হুংকার দিয়ে বারে বারে শোনাচ্ছেন, আজ হোথায় যাওয়া বারণ। কাল মহাশিবরাত্রির আয়োজনে কোনও কাঁপালিকদের ডমরু আজ সন্ধে থেকেই বাজতে আরম্ভ করল।
নোনাগন্ধে খানিক খানিক আভাস পাচ্ছি।
***
২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
বড়লোক দেউলে হওয়ার অনেকদিন পরও জাকজমক সমানই চলতে থাকে বরঞ্চ অনেক সময় বেড়ে যায়। পালাপরবে গমগমানি বরঞ্চ বেশি হয়– ওদিকে আটপৌরে খরচে টানাটানি চলে।
আকাশের একটানা লাল নিভে গেল কিন্তু টুকরো টুকরো মেঘে তার জাকজমক জেগে রইল অনেকক্ষণ ধরে–আরও বেশি লাল হয়ে। দেউলে-হয়ে-যাওয়া জমিদারের ইয়ারবকসি যেন এরা। মনিবের শেষের তলানিটুকু খেয়ে মাতলামির লালে লাল। হুজুর লুকিয়ে থেকে গাদা গাদা আবির ছুড়ছেন।
আটপৌরে আকাশ ম্লান কিন্তু মেঘে মেঘে পালাপরবের বাড়াবাড়ি জাঁকজমক। আড়াল থেকে অস্তগত সূর্য পেলা দিচ্ছেন। দাক্ষিণ্য থেকেই দারিদ্র্য ধরা পড়ে।
পুবে-পশ্চিমে দেখনহাসি ইলেকটেরিতে খবর পাঠানো না বয়স্কাউটের নিশানে নিশানে কথাবার্তা। পশ্চিম লালের ইশারায় পুব লাল হল। সেই লাল ফিকে হচ্ছে–কি গোপন কায়দায় তার খবর পুবে পৌঁছচ্ছে? মাঝের বিস্তীর্ণ আকাশ তো ফিকে, কোনও রঙ নেই, ফেরার নেই। কী করে এর হাসি ওর গায়ে গিয়ে লাগে–এর বেদনা ওর বুকের সাড়ায় প্রকাশ পায়!
***
২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
আকাশ যেন উবু হয়ে শুয়ে সমুদ্রকে চুমো খাচ্ছে– এদিকে সমুদ্রের পা ওদিকে মুখ। রঙে রঙে সমস্ত জিনিসটা ঘটল। প্রথম চুম্বনে দিগ্বলয় লাল হল। তার পর নিবিড়তর চুম্বনের কাতরতায় বেগুনি হল, সেই বেগুনি ফিকে হতে লাগল, এদিকে ঢেউয়ের দোলায় সুন্দরীর পা যেন কেঁপে কেঁপে উঠেছে–সমস্ত দেহ শান্ত। চুম্বনের তরঙ্গ শান্ত শরীরের ভিতর দিয়ে ওপার হতে এপারে এসে ঢেউয়ে ঢেউয়ে ফুলে ফুলে উঠছে কেন্দ্রীভূত আনন্দ এপারে এসে বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
তার পর বেগুনি সম্পূর্ণ কেটে গিয়ে ছাইরঙ হল। এ যেন সর্বশেষ নিবিড়তম চুম্বনে হৃৎপিণ্ডের শেষ রক্তবিন্দু ঠোঁট দিয়ে শুষে নিয়ে চলে গেল। এপার ওপার জুড়ে পড়ে রইল প্রাণহীন ফ্যাকাসে শবদেহ।
কালো চাদরে সর্বাঙ্গ ঢাকা পড়ল। তার পর আকাশে ছোট ছোট মোমবাতির পিদিম জ্বালিয়ে শবের পাহারা।
সেই কালো চাদরে সবকিছু ঢাকা। দক্ষিণমুখো হয়ে বারান্দায় শুয়ে আছি। বাঁ দিক থেকে আসছে কান্নার শব্দ শোক যেন উথলে উথলে উঠছে। ডানদিকে নারকোলের ডগায় বাতাসের ঝিরিঝিরি– যেন মাথার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে। পায়ের তলায় ঝিল্লির রিনিঝিনি। সামনে মোমের ফোঁটা ফোঁটা চোখের জল জমে গিয়ে কালো চাদরের গায়ে লেগে আছে।
কিসের প্রতীক্ষা? কোনও চন্দ্রোদয়ের? যেন তিনি সুধাভাণ্ড নিয়ে অতল গহর থেকে উঠে এসে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়ে কোনও মৃতদেহে প্রাণ দেবেন।
***
২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
সূর্য অস্ত যাব-যাব করছেন এমন সময় পারে পৌঁছলুম। আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ ছিল, অন্যদিনেরই মতো। ভাবলুম কালকের মতো আজও ফাগের খেলা জমে উঠবে। প্রথম লক্ষণ দেখাও দিল। আকাশ ফিরোজা সবুজ শাড়ি পরল–আস্তে আস্তে গয়না চাপাব চাপাব করছে, এমন সময় দেখি শাড়িখানাই ফিকে হয়ে হয়ে, কেমনধারা সেই ছাইনীল হয়ে গেল। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখি তারও সেই ফিকে শ্যাওলা সবুজ রঙ। চারদিকেই কেমনধারা আধমরা ছাইরঙ ধরতে লাগল।
কালকের দিনের সব সাজসরঞ্জামই ছিল কিন্তু কেন জানিনে খেলা শুরু হতে হতে বন্ধ হয়ে গেল।
তখন দেখি আকাশে দ্বিতীয়বার অতি ক্ষীণ চাঁদের অত্যন্ত ম্লান ঝিলিক।
যেন হিমালয় তার সব রঙ সব সৌন্দর্য মুছে দিলেন, আড়ম্বর-আভরণহীনতার মাঝখানে দুখিনী কন্যাকে ঘরে তুলবেন বলে। চাঁদের মুখে তাই কি ধীরে ধীরে হাসি ফুটতে লাগল?
অন্ধকার যখন ঘনতর হল তখন চাঁদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর সবাই, মেঘ জল বালুচর আপন আপন আলো নিভিয়ে দিয়ে চাঁদের দিকে উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে।
বরণশেষে বাড়ি ফিরলুম।
ফাল্গুন মাস কিন্তু কোনওদিকে নবজাগরণের কোনও চিহ্ন নেই। এদেশে শীতের ঘুম নেই, বসন্তের জেগে-ওঠাও নেই।
***
২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
মাঝআকাশ থেকে একটুখানি ঢলে-পড়া তৃতীয়ার ক্ষীণ শশী; সূর্য হেলে পড়েছেন কিন্তু তখনও জ্যোতির্ময়। তাই ভস্মভাল শিবের ললাটে হীনজ্যোতি শশাঙ্ক-কলা। উমা কি এখনও ঘরের কাজ শেষ করে উঠতে পারেননি– বেলা যে গড়িয়ে এল। জেলেদের পাড়ায় কাজকর্মে ভাটা পড়েছে জেলেনিরা রঙিন-শাড়ি পরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে সমুদ্রপারের লোক বোধহয় স্বল্পভাষী হয়, ঢেউয়ের গর্জনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কথাবার্তার মেহনতে গল্পগুজব জমে না, ঝগড়াঝাটিতে গলা চিরে যায় জেলেরা বোধ করি বাজারে গেছে– নারকোলপাতার ছাউনির কুঁড়েঘর ওই নারকোলগাছের গা-ঘেঁষে যেন রোদ থেকে শরীর বাঁচাচ্ছে।
উমার কাজ শেষ হয়েছে। ভস্ম মুছে ফেলে, ঘোর আসমানি রঙ দিয়ে শঙ্করের কপাল ঢেকে দিয়েছেন তার উপরে দিয়েছেন তিনটান টকটকে ফাগ– আর মাঝখানে একে দিয়েছেন উজ্জ্বল, নবকান্তি, অকলঙ্ক শশাঙ্ক।
হাসি ফুটেছে। সমুদ্রের জল আসমানি রঙ নিয়েছে ধূসর বালুচর সোনালি হল। সমুদ্রের লোনা হাওয়ার জোর কমল–উত্তর থেকে হিমালয়ের বাতাস এল নাকি উমার চঞ্চল অঞ্চল আন্দোলনে?
