***
১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
সকালবেলা দেখি বালুপাড়ের গায়ে যেন কে নীলাম্বরি শাড়ি শুকোতে দিয়েছে। আলো-আঁধারে ভালো দেখা যাচ্ছে না। এদিকে দক্ষিণের বারান্দায় পুবের রোদ এসে পড়েছে, নিমগাছের ফাঁকে ফাঁকে। অনেকক্ষণ ধরে বাইরের দিকে চেয়ে রইলুম। মন বোধহয় শান্ত ছিল তাই কোনও পরিবর্তন লক্ষ করিনি। বেলা যখন বেশ হয়েছিল তখন দেখি পুবের রোদটুকু বারান্দাটি যেন মুছে দিয়ে চলে গেছে।
ওদিকে দেখি নীলাম্বরি শাড়ির উপর রুপালি জরির অগুনতি চুমকি কুচি ফুটে উঠেছে। সাদাসিধে নীলাম্বরি কখন যে হঠাৎ জড়োয়া হয়ে গেল টেরই পাইনি।
একসারি খুঁটি পোঁতা, কাত হয়ে, দেখছিলাম সকালবেলা নীলাম্বরির পারে। জেলেরা জাল টেনে তুলছে। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি তারা আর নেই– বালুচর পেরিয়ে, সবুজ মাঠের উপর জেলেনিরা চলেছে মাথায় কঁকা করে বাজারের দিকে।
মাঠের গরুগুলো ঠিক সেইরকম ছবিতে আঁকা। শুধু compositionটা বদলে গেছে। একদিকে বেশিরভাগ জড়ো হয়েছে অন্যদিকে দুটো-চারটে ছিটকে-পড়া।
পেছনের বস্তিতে জেলেনি কলতলায় কাপড় কাঁচছে। এমনি আঁটসাট গঠন যে সমস্ত শরীর দু ভাঁজ করে পায়ের কাছে কাপড় আছড়ানোতেও শরীরের কোনও জায়গা দুলে উঠছে না। আমাদের মালীর বউ নাইতে বসেছে। কাকের কা-কার সঙ্গে কাপড় কাঁচার ধোপধাপ আর কলতলায় ঝট দেবার শব্দ।
জোয়ার আসার সময় হয়েছে। বাতাসের ফাঁকে ফাঁকে তার প্রথম মৃদু গর্জন শোনা যাচ্ছে।
সন্ধেয় গিয়ে দেখি কপাল জুড়ে চওড়া লাল আবির মেখেছেন, এক কান থেকে আরেক কান অবধি।
অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?
আজ সন্ধেয় কি বাসর-সজ্জাটাই না পরেছিলে!
এতবড় কালো ঘোমটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলে?
***
১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
আজ সন্ধেয় গিয়ে বললুম মাটির মানুষ আমি। মাটির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে এসেছি যেখানে মাটির শেষ। তোমার নীল কোলে জায়গা দাও।
গরম বালুতে পা পুড়িয়ে রোজ আসি– তুমি আমার পা শীতল করে দাও।
একদিনের তরে সমস্ত ভেতরটা ঠাণ্ডা করে দাও না কেন?
.
গভীর অন্ধকার– পরশু মহাশিবরাত্রি শুধু বা আর স্পর্শ। গুরু গুরু গর্জন ঘন ঘন মিশে যাচ্ছে পাগল হাওয়ার এদিক ওদিক ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে। কখনও কানে আসছে দুয়ে মেলার শব্দ। কখনও হাওয়া যেন গর্জন থেকে খসে পড়ে যায়। তার পর হঠাৎ গমগমানি যেন নিজেকে একা বোধ করে থেমে যায়। নোনা বাতাস কপালের উপর হাত বুলিয়ে দিয়ে যায়, কখনও-বা জোর লাগিয়ে চাদরখানা সরিয়ে দেয়।
তবু যেন অন্ধকারেরই জয়। দূরের গর্জন, মাঝামাঝি অন্ধকার, কাছের স্পর্শ সবকিছু তলিয়ে পড়ে কী যেন অজানা অন্য কোনও অন্ধকারের তলায়।
এই গভীর বিলুপ্তি অতল বিস্মৃতি নিয়ে আসে না কেন?
.
সমুদ্রপারে কখনও শান্তি পাওয়া যায় না–
***
১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
ওমর খৈয়াম বলেছিলেন, আমার দুঃস্বপ্ন দুশ্চিন্তা কালো ভারতবাসীর মতো। সুরাৎ মাহমুদ তার তলোয়ার চালাতেই তাদের আর সন্ধান পাওয়া যায় না–Scatters and slays with his enchanted sword– আমার হয়েছে সত্যিকার তাই, কাক– দুপুরের শান্তির প্রধান অন্তরায়। সমুদ্রের গুরুগম্ভীর গর্জন, দমকা হাওয়ায় দোল-লাগা নারকেলপাতার শিরশিরি সব চাপা পড়ে যায় ওই কর্কশ লুব্ধ চিৎকারের তলায়। এ চিৎকারে যেন সমুদ্রপারের পচা মাছের গন্ধ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
নীল ফরাস পেতে রেখেছ এতক্ষণ ধরে নাচ শুরু হোক না।
সমুদ্রের বুক চিরে যেন অন্ধকার বেরিয়ে এসে, আলাদীনের জিনের মতো সমস্ত আকাশ বালুপার কালো বিষ ঢেলে একাকার করে দিল।
জলের ভেতরে কি আরেকটি জিন এখনও পোরা রয়েছে নাকি? তার লাথালাথির গমগমানিতে সমুদ্র আকাশ পর্যন্ত কেঁপে উঠছে।
পশ্চিম আকাশের লাল কাগজের ফানুসবাতিতে যেন হঠাৎ আগুন ধরল। দেখতে না দেখতে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে আলোটাও নিভে গেল। পুবে-পশ্চিমে একটানা অন্ধকার।
***
১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
বউমার ঘুম কিছুতেই ভাঙছে না। ডানদিকে বালুচরের লম্বা কোলবালিশ, বা দিকে ঘন ঘোলাটে মেঘ পাকিয়ে পাকিয়ে বানিয়ে তোলা তুলতুলে আরেক কোলবালিশ। কে যে পাখার হাওয়া করছে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু মেঘের সঙ্গে রঙ মিলিয়ে ঘোলাটে শাড়ির জমি হেথা-হোথা সর্বত্র বারে বারে কেঁপে উঠছে। দুঃস্বপ্ন দেখছেন কি না বলা যায় না, মাঝে মাঝে গুমরে উঠছেন, পাখার হাওয়ায় সেটা মিলিয়ে যাচ্ছে- পাপষ্টি কিছু বলার উপায় নেই।
পাখার হাওয়া ঝড়ের হাওয়া হতে চলল যে। হঠাৎ কখন একপাশের শাড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে সাদা ফ্যানার পেটিকোট না লেসের সেমিজের শেষের দিকটা?
কালোজাম, গোলমোহর, নিম-নারকোলে কী মাতামাতি। সমস্ত অশান্ত হয়ে উঠেছে। বাইরের দিকে তাকাবার উপায় নেই। শুধু ওই ইলেকটেরির খুঁটিটা এক পায়ে দাঁড়িয়ে। ওর কোনও নড়নচড়ন নেই। এতবড় সমুদ্র– তিনিও দুলে দুলে ওঠেন প্রাণের কাঁপনে কিন্তু খুঁটিটার কাঁপন নেই, জীয়ন মরণও নেই।
পারের সবাইকে তাড়াবার জন্য আজ গুমরে গুমরে বড় বড় ঢেউ পারে এসে আছাড় খাচ্ছিল। কী মতলব কে জানে। তাড়াতাড়ি অন্ধকার টেনে আনার জন্য আকাশে একরত্তি মেঘও ছিল না। কাল অমাবস্যা– আজ এত তাড়া কিসের?
অন্ধকার যেন পেছন থেকে তাড়া করে করে বাড়িতে ভাগাল।
