কত গরিব আমাদের দেশ। সামান্য একটুকরো কাপড় কেনার পয়সা নেই।
রাত সাড়ে দশটায় লু আরম্ভ হল। উত্তর দিকে দূরে দূরে মেঘের আড়ালে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। শব্দহীন। আকাশেও মেঘ নেই। আজ ধুলো কম। না হলে এই বাতাসেই আমরা ফের ধূলিতন্ত্রের অধীন হতুম। বৃষ্টির আশা কম। কালকের তুলনায় আজ ভ্যাপসা ছিল কম।
ঘণ্টাখানেক এই লু উৎপাত করে চলে যাওয়ার পর এখন (০১.০০) হাওয়া একদম বন্ধ। কী উৎপাত। কাল এই সময় কী হিল্লোলে হিল্লোলে তরঙ্গে তরঙ্গে হাওয়া আসছিল।
***
২১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
আজ সকালে স্নানের ভিড়। দশেরা? এ-সময়ে দশেরা কী রে বাবা? আজ দুপুর এবং এখন (১৮.৪০) সত্যই গরম। ভ্যাপসা, ধুলো, দক্ষিণের হাওয়া নেই। পুবের হাওয়া এখানে ঢোকে না। পদ্মা চলেছে বোঝা যায় তার শব্দ থেকে হাওয়া থেকে নয়। জুস শেষপ্রান্তে।
আজ কতরকম আবহাওয়াই না যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় ছিল গুমোট। তার পর সন্ধ্যাবেলাতেই পুবের বাতাস। তার পর পুব-দক্ষিণ থেকে ধূ ধূ হাওয়া। দরজার একটা পাটি বন্ধ করে দিতে হল; না হলে কাগজ উড়িয়ে নিয়ে যায়। মেঘ ছিল অল্প– তা-ও খুব বর্ষণপ্রদ নয়, লম্বা লম্বা ফালি ফালি। তার পর অসহ্য গুমোট। হাওয়া এমনই মোক্ষম বন্ধ হল– এরকম ধারা জীবনে কখনও দেখিনি– যে বেশ কিছু মশা সর্বাঙ্গের চতুর্দিকে ভন ভন করে অস্থির করে তুলল। ওদিকে উত্তর-পশ্চিম আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ আর মেঘের ডাক। ঠিক বৃষ্টি হব হব ভাব। তার পর হঠাৎ জোর বাতাস ধূলিতন্ত্র। নিরাশ হয়ে দোর জানালা পর্যন্ত বন্ধ করলুম না।
এই হাওয়া-গুমোটের তামাশা কবার হয়েছিল জানিনে।
শেষরাতে অনুভব করলুম, বৃষ্টি হয়েছে। সকালে দেখি ছাত বেশ ভেজা।
***
২২ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
ঈদ-উজ-জোহা/ আজ হল না
১০ জু’অল হজ্জ
সকালে দেখি ছাত ভেজা। অল্প অল্প বাতাস। তাতে ধূলিকণার অত্যাচার কম। এখন ৫.৫৫-এ ঢাকা ফোরকাস্ট দিল আজ চাটগাঁ, দক্ষিণ ঢাকা ও দক্ষিণ রাজশাহী বিভাগে ঝড় বিদ্যুৎ-বৃষ্টি তাবৎ কিছুই হবে। এই মুহূর্তে এখানে নিদারুণ গুমোট, বাবলাগাছের বিন্দুপারা পাতাটিও নড়ছে না। বৃষ্টি হলে বাঁচি। তবে ঈদের বাজারের সর্বনাশ হবে।
.
ঈদ
২৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
আজ আবার নীল চাঁদ দেখলুম। এই নিয়ে জীবনে তিনবার। আর দু বার বছরের ঠিক এই সময়েই দেখেছিলুম। এবারে বু, কিংবা fine emareld green.
আজ চাঁদের শুক্লা দ্বাদশী। সূর্যাস্ত এখানে রাজশাহীতে আজ ১৮.৫২-তে। দেখলুম ঠিক ১৯.০০। পাঁচ মিনিটের ভিতরেই চাঁদ সোনালি হয়ে গেল। বোধহয় অন্ধকার বাড়ল বলে চাঁদের জ্যোতিও বাড়ল। তাই সবুজ-নীলত্ব লোপ পেল। ১৯.৫৫-এ নিত্যিকার চাঁদ।
অতি সূক্ষ্ম মসলিন মেঘ তখন আকাশ ও চাঁদের গায়ে। এমনকি তখনও সূর্যাস্তের লালিমা আকাশের হেথা হোথা-লেগেছিল।
.
আজ সকালে উঠে বুঝলুম, কালকেরই মতো বৃষ্টি হয়েছে।
বেতার বলল, ঢাকাতে বৃষ্টি সত্ত্বেও নামাজের জনসমাগমে মানুষ কম হয়নি।
দিনটা মোটামুটি গরমই। তবে এখন ২২.১৫ হাওয়া বইছে। সন্ধ্যা থেকেই পুব থেকে ছিল। বর্ষা কাছে আসার সঙ্গে পুবের বাতাসের প্রাধান্য বাড়ছে।
***
২৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
কালকের চাঁদের কথা ভুলে গিয়েছিলুম বলে এবং visitors ছিল বলে নীল চাঁদ দেখার চেষ্টা করিনি। দুঃখ হচ্ছে।
সাঁওতাল রমণীর বর্ণনা– শান্তিনিকেতন।
স্পষ্ট মনে হচ্ছে চুলে তেল দেয় না।
খোঁপা কি আমাদেরি মতো বাঁধে?
পরনে কমলা রঙের শাড়ি বেগুনি পাড়।
ডান হাতে বাজুবন্ধ।
গলায় সাদা পুঁতির হার।
কানে পেতলের সাদাসিধে গোল একটি কানফুল– just a big full stop। ডান হাতে সুতো বাঁধা– ওতে কি কবজ?
***
RAJSHAHI– CALCUTTA
২৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
ফিরোজ ভজু স্টেশনে এসেছিল। তাদের মুখ শুকনো। থাক, সে আমি বলতে পারব না।
বউ ঈশ্বরদী অবধি এল। আমাদের বগিটা অনেকক্ষণ ধরে শানটিং করল।
আমার মনে হচ্ছিল, আমরা যেন হানিমুনে। বউ ঘুমিয়ে পড়ল। বেচারি ওই ঢাকা এই পাবনা একাধিকবার বাসে করে ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।
রাত দেড়টার সময় আমার গাড়ি ছাড়ল। সে-ও শুকনো মুখে বিদায় নিল।
এ বড় পীড়াদায়ক। এসব কথা আর লিখব না। এ তো কাল্পনিক পীড়ার জাল বুনে বুনে উপন্যাস লেখা নয়।
***
সমুদ্র-প্রকৃতি
১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭
বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে পিচঢালা চওড়া কালো রাস্তা। তারি সঙ্গে গা মিলিয়ে একফালি ঘন সবুজ মাঠ, ছোঁড়ারা ক্রিকেট খেলে– তার সঙ্গে গা মিলিয়ে ফের আরেক ফালি সোনালি বালুপাড়–একপাশে জেলেদের বস্তি, গাছ নেই পালা নেই কতকগুলি কুঁড়েঘর– বালুপাড়ির সঙ্গে গা মিলিয়ে আরেক ফালি লম্বা একটানা নীল সমুদ্র।
চোখে পড়ে চার ফালি কালো পথ, সবুজ মাঠ, সোনালি বালু আর নীল সমুদ্র। নীল হল কথার কথা। তা না হলে দিনে যে সুন্দরী ক-বার কাপড় বদলাল তার হিসাব রাখা দায়– বাকি তিনজন কুঁড়ের বাদশাহ, তাদের রঙের ফেরফার হয় না।
সমুদ্রের একদিকটা গিয়ে লেগেছে আডিয়ার নদীর মোহনায়। দুইজনের ধাক্কাধাক্কিতে টক্কর খেয়ে একটা ঝিল তৈরি হয়েছে সে এঁকেবেঁকে আমাদের দিকে অনেকটা এগিয়ে এসেছে জেলেদের গা ছাড়িয়ে। ঝিলটা নিতান্তই খরা, তার উপর নৌকা চলে না, জেলে জাল ফেলে না, তার রঙেরও অদলবদল হয় না। তবু এঁকেবেঁকে গেছে বলে মাঠ, বালু সমুদ্রের ফালি কেটে সব জিনিস যেন দূরে নিয়ে গিয়েছে।
