***
১৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
সকালবেলা শুকনো–যেমন তেমন।
দুপুরে ভ্যাপসা পীড়াদায়ক গরম। পাখা চালিয়েও শান্তি নেই। একদিনেই হেন পরিবর্তন! রাজশাহী গরম জায়গা by nature.
বউ ফিরেছেন।
ঘুম থেকে উঠে বাইরে গুমোটে ফের কষ্ট। যদিও হাওয়া অল্প-স্বল্প ছিল। ঠাণ্ডা হতে হতে বেশ সময় লাগল। এখন ০১.০০ সুন্দর হাওয়া দিচ্ছে।
আজ সন্ধ্যায় বেতার বলল, রুশিয়া স্পষ্ট বলেছে, যেসব আড্ডা থেকে বিদেশি প্লেন গুপ্তচরী করতে রুশ আকাশে উড়বে সেসব আড্ডার উপর বোমা ফেলা হবে। আরও বলল, এসব প্লেন যেন না ভাবে, তারা এমন উপর দিয়ে উঠতে পারবে যেখানে তাদের রকেট পৌঁছতে পারে না।
শাবাশ! এইবার তা হলে পাকাপাকি পাঁয়তারা কষা আরম্ভ হল। কিন্তু এসব কথা শুনে তো বুকে রক্ত হিম হয়ে যায়। রুশে-মার্কিনে লড়ুক না, কিন্তু আমাদের নিয়ে কেন টানাটানি?
আরেকটা প্রশ্ন, ওদের রকেট যদি সবকিছুই যত উপরেই হোক না কেন, নষ্ট করতে পারে তবে হাওয়াই আচ্ছা ধ্বংস করার হুমকি কেন? ওদের মেরে ফেললেই পার। আমার মনে হয় পারে না। আর ওই যে মার্কিন বিমান ভেঙেছে ওর চালক কম্যুনিস্ট।
***
১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
কালকের মতোই দিন গেল। চতুর্দিক থেকে ফোরকাস্ট-ও হয়েছে যে বৃষ্টি কমবে। আজও তাই কালকের মতো শুকনো গেল। গরম কিন্তু অসহ্য নয়। কালকেরই মতো সন্ধ্যা থেকে ধূ ধূ হাওয়া।
সকালে চারবার দাস্ত হল। মাছের ডিম খেতে নেই। মনকে একাধিকবার বুঝিয়েছি।
আকাশ এত পরিষ্কার যে শরৎকালের মতো তারা সব জ্বলজ্বল করছে। ছায়াপথ দেরিতে ওঠার পর তাকেও অতি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ভাটার সমুদ্রের মতো পদ্মা কখনও গর্জন করছে জোর, কখনও ক্রন্দন খানিকটে কমিয়ে দিচ্ছে।
এত হাওয়া– সে শুধু একেবারে পদ্মার বুকের উপর খাড়া এই বাড়ির কল্যাণে। সেকথা একাধিক লোক আমাকে বলেছেন।
কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই ভুলতে পারিনে। সমুদ্রপারেই বল আর এখানেই বল, ধূ ধূ হাওয়ার মাঝখানে মন যেন শান্তি পায় না, কোনও কাজে পুরোপুরি concentrate করা যায় না। একদিকে গায়ে ক্রমাগত হাত বুলোচ্ছে, অন্যদিকে কানের কাছে শব্দ করছে– একসঙ্গে দুটো disturbance.
***
১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
এ কদিন গরম ছিল ভ্যাপসা। ঘামও হচ্ছিল। বোধহয় আজ তাই সকাল থেকে আকাশ মেঘলা করে, এই মিনিট দশ আগে (৮.৩) অতি সূক্ষ্ম একপশলা বৃষ্টি এক মিনিটের তরে হল। তার পর দূর-দূরান্ত অবধি সেই পাতলা জলকণাযবনিকা ঢাকা মাঝনদীর চর, ওপারের সবুজ রেখায় বিলীয়মান জনপদভূমির তরু-বনানী, আকাশের দিগ্বলয়প্রান্ত শ্যাম কাজলে মসীমাখা।
আবার পুবের বাতাস-এতদিন ছিল দক্ষিণের। তারই জোরে মহাজনি নৌকো চলেছে বুক ফুলিয়ে। এদের গতি এতই মসৃণ আয়াসহীন যে এর কাছে রাজহাঁসও হার মানে।
এরই মাঝখানে দেখি, আকাশ-ভরা মেঘের এক জায়গায় অতি ছোট একটা চক্র তার ভিতর দিয়ে ট্যারা হয়ে সূর্যরশ্মি পড়েছে শুভ্র বালুচরের উপর– সে রশ্মি যেন বিচ্ছুরিত হচ্ছে নীল মেঘের, নীল আকাশের উপর। বালুচর যেন আতশি কাঁচ হয়ে সূর্যের সঙ্গে চোখ-ঠারাঠারি করছে।
এইবারে রাক্ষুসী পদ্মা ধরেছেন জেব্রার ঢঙ।
আকাশের অনেক জায়গায় মেঘ ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। ফালি ফালি ডোরা ডোরা হলদে পদ্মার জল, আর অন্য জায়গায় নীলের ডোরা। সেই পরশুরামের দক্ষিণরায়, মোশয়, ডোরা ডোরা আঁজি আঁজি!
***
২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
শান্তিনিকেতনে যেরকম নিত্য নিত্য আবহাওয়ার চার্ট রেখেও এত বৎসর পরেও কোনও পূর্বাভাস দিতে পারিনে, এখানেও তাই। কখন যে কোন দিক দিয়ে ডিপ্রেশন হয় এবং ফলে ঝড়বৃষ্টি হয় (যদি সত্যই তাই হয়) তার কোনও হদিস আগের থেকে পাওয়া যায় না।
গত বছর অনেক দেরি অবধি বর্ষা চালু থেকে বন্যা ঘটাল।
শান্তিনিকেতনের মাটি ভেজা রইল অনেকদিন। কিন্তু শীতের বৃষ্টি যেটা প্রতি বৎসরের পাওনা, হল না। এমনকি পুব বাঙলায়ও না–বেশিরভাগ জায়গায় সাত মাস ধরে বৃষ্টি হয়নি।
জোর ঝঞ্ঝা ঝড় হওয়ার কথা বৈশাখ মাসে। হল না। হল ৩০ বৈশাখে। সেটা আবার চলল একটানা ২৯/৩০ অবধি। সচরাচর কি এরকম হয়?
তার পর এখনও ঠিক গরম পড়েনি। পশ্চিম বাঙলা অন্তত ২৬ তারিখ অবধি ঠাণ্ডা ছিল।
ইতোমধ্যে কলকাতা একদিন বলল, মনসুন বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে আসছে। তার পর চুপ।
এখন প্রশ্ন সত্যকার আসল বর্ষা নামবে কবে?
এসব অস্বাভাবিক অবস্থার ফলে পেছিয়ে যাবে, না মাঝ-জুনে যথারীতি নামবে।
তেরো তারিখে বৃষ্টি নামার পূর্বে দিনকয়েক যে হাওয়া বন্ধ হয়ে গুমোট করেছিল তা নয়। কাজেই আজকের দিনের জোর হাওয়া দেখে বলা, যে বৃষ্টি হতে অনেক দেরি এটিও অভিজ্ঞতাবিরুদ্ধ।
.
সুন্দর বাতাসে ভোর আটটা অবধি সুনিদ্রা।
পদ্মার দিকে তাকাতেই দেখি, তিনি এক রাত্রেই ডুবে ডুবে অনেকখানি জল খেয়েছেন। কুণ্ডের একটা পাশ ডুবে গিয়ে এখন স্রোতের ধারা প্রায় পাড়ের সঙ্গে সমান্তরাল। ছোট্ট চরটি সম্পূর্ণ অন্তর্ধান করেছে।
আকাশে ভালো করে মেঘ জমেছে। বর্ষা-সকালের আবহাওয়া।
খাড়ির সবকটা নৌকাই যেন একে একে পাড়ি দিয়েছে উজানের দিকে পশ্চিম পানে। তাদের গতি এমনই মসৃণ পিচ্ছল অনায়াস যেন পাকা স্কেটিঙের সর্দারনীর বুকে ফোলানো প্রফাইল দেখতে পাচ্ছি পারের থেকে।
এই দেখে মনে পড়ল, আমাদের দেশে যখন কোনও নৌকো পাল তুলে তর তর করে উজানে ধায়, আর দেখে অন্য কোনও নৌকো পাল নেই বলে বৈঠা মেরে মেরে অবিরাম ঘামছে তখন চেঁচিয়ে বলে, হালের বলদ বন্ধক দিয়ে পাল কেন।
