কিন্তু আশ্চর্য, আরেকখানা নৌকো মাঝগাঙে দাঁড়িয়ে– এদিকে আসছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। ওর কি ডর-ভয় নেই! ঝড়ের বেগ তো আরও বাড়তে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্য, মাল্লাদের ভিতর কণামাত্র দৌড়ঝাঁপ বা অন্য কোনও প্রকারের উত্তেজনা নেই। লড়ালড়ি যুঝাযুঝি সব করে যাচ্ছে অতিশয় আটপৌরে চালচলনসহ। হৈ-হুল্লোড় করল পুল তৈরির জন তিরিশেক মজুর।
বেতারে সতর্কবাণী দেওয়ার এক-দেড় ঘন্টার ভিতরই বৃষ্টি আরম্ভ হল। অবশ্য মেঘ জমতে আরম্ভ করেছিল সকাল থেকেই। ভোরে রৌদ্র ছিল। হাওয়া বইল দুপুর অবধি উত্তর থেকে। অথচ বৃষ্টি আর ঝড় এল পূর্ব এবং দক্ষিণ থেকে।
এখন ঝড়ের দাপট কমেছে। ঘাট পাড় জনশূন্য। পুলের মজুর সব অন্তর্ধান করেছে। নৌকোর ভিতরে মাল্লারা আশ্রয় নিয়েছে। গয়লানী তুফানের শুরুতেই গাই দুটো ভিতরে নিয়ে গিয়েছিল, এখন ঘুঁটে সরাচ্ছে। ওপারে নৌকোটা ওখানেই দাঁড়িয়ে। (ওখানে বোধ হয় চড়ার কাছে বলে জল কম) এবং এই বৃষ্টিতে দুটো বাদর ছোঁড়া সাঁতার কাটছে। বোধ হয় সেই প্রবাদটা শুনেছে, এমন সুবুদ্ধিমানও আছে যারা বৃষ্টির হাত থেকে এড়াবার জন্য পুকুরে ডুব দেয়।
দুপুরে ঘুমিয়ে উঠে দেখি (১৭.৩০), জোর বৃষ্টি হচ্ছে। যখন অল্পক্ষণের জন্য থামল তখন দেখি, বাগানে রাস্তায় জল দাঁড়িয়েছে– ওবেলা যেরকম দাঁড়িয়েছিল। দিনে দু বার এরকম ধারা পূর্বে হয়নি।
এখনও খাঁটি বর্ষাকালের পিটির পিটির চলছে।
কেউ বলবে না এটা গ্রীষ্মকাল।
এরকম আর কয়েকদিন চললেই তো এ বৃষ্টি মৌসুমি বৃষ্টির সঙ্গে মিলে যাবে। কারণ খবর এসেছে মৌসুম বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে এগিয়ে আসছে।
এখন অবধি চলেছে বর্ষার মতো। কখনও পিটির পিটির, কখনও দমকা হাওয়া। বাতাস একেবারে বন্ধ কখনও হয়নি। বিদ্যুৎও কম। যেটুকু তা-ও দূরে দূরে। বেতারকেও ব্যাঘাত করে না।
***
১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
যেন খাঁটি বর্ষা ভোর।
একটুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে বলে ওপারের গাছপালা ঝাপসা হয়ে দেখা যাচ্ছে। নদীঘাট জনহীন। মাত্র দুটি মেয়ে মুখোমুখি হয়ে কোমরজলে শীতে জবুথবু প্রায় দাঁড়িয়ে অন্যদিন তারা তলওয়ারের মতো খাড়া হয়ে ভীষণ বিক্রমে সর্বাঙ্গ মর্দন করত– মাঝখানে একটা উপু কলসি ভাসছে। কাছে কাছেই দু একটা শিশুক এসে জুটেছে। কাল সন্ধ্যায় একখানা জালিবোট ফিরে এসেছে। তার নবদ্বার বন্ধ। পাড়ে ছাতা মাথায় একটি লোক কোনও গতিকে পা টিপে টিপে নিচের দিকে নামছে। পোলটার মেরামতি হচ্ছে বলে ঢালু পাড়ির অনেকখানি নেমে ফের চড়ে সড়কে উঠতে হয়।
অতি সূক্ষ্ম বারিকণা ওই ওপার হিন্দুস্থান থেকে ধেয়ে আসছে। ভুল বললুম, আস্তে আস্তে সবকিছু ঝাপসা করে দিয়ে এগিয়ে আসছে। যেন পাহাড়ে কুয়াশার পর্দা এগিয়ে আসছে। এখন এসে পৌঁচেছে মানার্থিনীদের কাছে। বালুচর, ওপারের বনরাজি দেখা যাচ্ছে না– যদিও দূরত্বটা বোঝা যাচ্ছে। নদীর মাঝখানে অতি ঝাপসা দেখা যাচ্ছে কাল ঝড়ের সেই দুঃসাহসী দুদে-নৌকোটা। ভুতুড়ে, ফ্যানটম বোট যেন।
এ-ছবি জাপানিরা আঁকে চমৎকার।
আবার জোর দমকা হাওয়ায় মেশানো বৃষ্টি। সমস্ত দিন কাটল ঝোড়ো বৃষ্টিতে– মাঝে মাঝে থেমেছিল বটে। এসেছে সর্বক্ষণ উত্তর দিক থেকে এবং এমনি ট্যারচাভাবে যে উত্তরের চওড়া বারান্দা ভেজা– শুকোবার ফুৎ পায়নি অথচ ঝড় সাইক্লোন তো আসবার কথা দক্ষিণ থেকে।
সেটাই বোধহয় এল এখানে ২০.০০। খুলনা থেকে এখানে আসতে লেগেছে প্রায় ছ ঘণ্টা। এখন একটানা শোঁ শোঁ শব্দ! তবে যে বেগে হঠাৎ এসেছিল, সেই বেগেই চলছে বাড়েনি এখনও (২১.০০)। ঝড়ের গোঙরানোটা কিন্তু অদ্ভুত শোনাচ্ছে। বৃষ্টি খুব নয়। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে না।
বর্ধমান চারদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার পর ও মাঝে মাঝে বৃষ্টির পর কাল রাত থেকে অবিরাম বৃষ্টি।
২৫/৫। অদ্য সিউড়িতে প্রবল বৃষ্টি আরম্ভ। শুক্রবারেও হয়েছে।
***
১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
কাল ২০.০০ থেকে এখন ৮.৩০ নাগাড়ে চলেছে বৃষ্টি–যদিও জোর নয়–আর ঝোড়ো বাতাস। বাতাস আসছে দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে। কেন জানিনে বিজলির জুস এত লাফাচ্ছে যে রেডিয়ো খুললেই এত শব্দ হয় যে কিছুই ভালো করে বোঝা যায় না। এই জলঝড়ে রাবেয়া পাবনা থেকে আসবে কী করে?
উজানে বর্ষা না নামলে নদীর জল বাড়ে না। কিন্তু এই লোকাল বৃষ্টিই পদ্মার জল বেশ বাড়িয়েছে। ভাটির দিকে হাওয়া বইছে বলে কোনওকিছুর সঙ্গে ধাক্কা না খাওয়াতে পদ্মার বুকে তেমন তরঙ্গ উঠছে না– কিন্তু যা উঠছে তা-ও এর পূর্বে কখনও দেখিনি।
বানুর বিশ্বাস, এটাই মনসুন। কী করে হয়?
বর্ষাঋতু চলল ১৫.৩০ অবধি। তার পর ঘুমুতে গেলুম। ১৭ নাগাদ উঠে দেখি সবকিছু শুকনো, হাওয়া বন্ধ; বর্ষার ভাব পুরো কেটে গেছে। তবে আকাশ মেঘলা, যদিও তার ভিতর দিয়ে চাঁদ দেখা গেল। চতুর্থী কি পঞ্চমী। পাবনা অঞ্চলে বোধহয় বাস ছাড়ার সময় অবধি বৃষ্টি ধরেনি। বউ তাই আসেনি।
নৌকোগুলো ফের খাড়ির মুখে জড়ো হয়েছে। নদীপারে সন্ধ্যায় ফের জনসমাগম। এখনও বৃষ্টিহীন অল্প গুমোট আবহাওয়া। গাছের পাতাটি পর্যন্ত নড়ছে না।
সন্ধ্যার পর আমার অল্প– যদিও অতি অল্প গরম বোধ হচ্ছিল।
ন-টায় অতি সুন্দর মলয় বইতে লাগল। এখনও (০১.০০)।
এই দিনেই শান্তিনিকেতনে ৪.৩০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হয়। Highest of the month according to V. B. Bulletin.
