***
৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
সেই যে তের তারিখে বৃষ্টি হয়েছিল, তার পর আর গরম পড়েনি। সেই অতি সূক্ষ্ম ধূলিতন্ত্রেরও অবসান হয়েছে।
সমস্ত দিন মেঘলা আকাশ। আসন্নবর্ষণ না হলেও চেহারা বর্ষাকালেরই মতো। সর্বাঙ্গসুন্দর নিম্বাস (Nimbus) না হলেও ওই গোত্রেরই বটে। আকাশের কোনও কোনও জায়গা যেন নীলাঞ্জন-লিপ্ত। শুধু মাঝে মাঝে সাদা সাদা ভাব– কাজলটা যেন জলের সঙ্গে ঠিকমতো লেপা হয়নি। আবার সমস্ত উত্তর আকাশ জুড়ে পুঞ্জ পুঞ্জ পাক-খাওয়া-খাওয়া কালোয় ধুলায় মেশানো সেই বনসঙ্কর নিম্বাস।
শেষ বালুকণা আকাশ থেকে বিলীন হয়েছে বলে ওপারের হিন্দুস্থান দেখা যাচ্ছে। আমার শালীর ছেলের বয়স ১৫/১৬, সে কত অনায়াসে বলল, ওপারে? ওপারে ইন্ডিয়া।
এই জেনারেশনের কাছেই পরদেশ ইন্ডিয়া। প্রার্থনা করি, তার পরের জেনারেশন যেন ইন্ডিয়াকে মিত্রের চোখে দেখে।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই দুই দেশ যদি ঠিকমতো সহযোগিতা করে তবে চীনকেও সর্বক্ষেত্রে হারাতে পারবে।
***
১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
কাল রাত্রে হাওয়া বন্ধ ছিল। পাখা না চালিয়েও খুব কষ্ট হয়নি।
সকালে আকাশ মেঘহীন ছিল। ক্রমে দক্ষিণের বাতাস মেঘ জমাতে আরম্ভ করল। Cumulus Nimbus-এর দোআঁশলা। দক্ষিণের বাতাসটি গায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে যাচ্ছে।
ঢাকাতে শুক্র শনি রবিতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ার ফলে সংবাদ উল্টো গান গাইছে।
মার্কিন বৈজ্ঞানিক বলছেন, ক্যালেন্ডারের একই দিনে বৃষ্টি হয়। যদি অন্য সময় বেশি বৃষ্টি হয় তবে সে আকাশে মেটেওর-ফেটেওর কী সব কারণে।
আমার ক্যালেন্ডার তো তা বলে না। তবে কি অন্য Geo-physicalCalander রয়েছে?
দিল্লি থেকে সংবাদদাতা লিখছেন, ভারত-পাকিস্তানে entente cordial বাড়ছে। সাধু!
সন্ধ্যায় হাওয়া বন্ধ হয়ে গুমোট। আকাশেও মেঘ নেই। রক্তাক্ত সূর্যাস্ত। এই কি ফের গরম আরম্ভ? Pre-monsoon গুমোট?
রাবেয়া পাবনা গেল। কিসের যেন মুখপোড়ার Pre-census.
***
অমাবস্যা
১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
Birthday of রাসবিহারী বসু। আশুতোষের ৩৬তম মৃত্যুবার্ষিকী।
নজরুল্ ইসলামেরও জন্ম ১৩০৬ সালে।
কাজী আমিন উল্লা মুনশী তুফায়েল আলী
কাজী ফকীর আহমদ মূসম্মৎ Zaheda খাতুন।
কাজী নজরুল ইসলাম
তাঁর পিতৃব্য কাজী বজল-ই-করীমের কাছ থেকে নজরুল ইসলাম বিস্তর ফারসি শোনেন। আত্মীয়েরা তাকে দুখু মিয়া ডাকত, অন্যেরা ক্ষ্যাপা। আসানসোল বেকারি। কাজী রফীকুদ্দীন সইন্সপেকটর অব পুলিশ তাঁকে কাজীর সিমলা (Kazir Simla) গ্রামে (মৈমনসিংহে) পাঠান। সেখানে তিনি class X অবধি ওঠেন। ১৩২৯-এ ত্ৰৈসাপ্তাহিকধূমকেতু প্রকাশিত। ২৩ বছর বয়সে ১ বছরের জেল। ৩৯ দিনের অনশন। আব্দুলা সুহাওর্দীর অনুনয়ে অনশন ভঙ্গ– he carried a message from the nation requesting him to do so Mrs M. Rahman took charge of him, fic, আশালতা সেন (পরে নাম প্রমীলা)–কুমিল্লার মেয়ে–
সকাল থেকে গুমোট। ভাবলুম, এই বুঝি শুরু হল ফের গরম।
দুপুরে পাখা চালালুম! অবশ্য সবসুদ্ধ তেমন কিছু পীড়াদায়ক নয়।
সন্ধ্যা ছ-টায় ঘনঘটা করে এক মিনিটের জন্য দক্ষিণ থেকে ফাইন বৃষ্টি।
এখন অতি ফিনফিনে বৃষ্টি পূর্ব থেকে (১৯.১৭), ঠাণ্ডা। আরামদায়ক।
বিশীর বাড়ি থেকে রাত্রে ফিরে ঘরটা গরম বোধ হল।
রাত্রে দোমনা হয়ে শুলুম, গুমোটই, পাখা না চালিয়ে। ভোরের দিকে বৃষ্টি হয়েছে। ছাত ভেজা।
কলকাতায় বর্ষাকালীন আবহাওয়া বিরাজ করছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন ও দু এক পশলা Sie i Main monsoon proceeding to Calcutta.
***
প্রতিপদ ৬/৫৯, ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
সকালে চড়চড় করে গ্রীষ্মের রোদ উঠল। ভাবলুম, খেয়েছে, আমাদের ঠাণ্ডার হনিমুন শেষ হল।
তার পর কোথা থেকে ঘন মেঘ জমতে আরম্ভ করল– যদিও ঠিক বর্ষণদ নয়। আর ধূ ধূ বাতাস। কাঁচের দরজা বন্ধ করে বসতে হয়েছে। কোদাল কাটা পদ্মায় সাদা ফেনা। গাছপালা, মেয়ে-মন্দের শাড়ি-ধুতি হেন বস্তু নেই যা শান্ত থাকতে পারে। চানের ঘাটেও হৈ-হৈ জনা পঞ্চাশেক প্রচুর তোলপাড় করে স্নান করছে।
আর পূর্ব দিগন্তে মেঘে, জলে, বালুচরে কী অপূর্ব রহস্যময় সমন্বয়ে সবকিছু পেলব করে দিয়েছে। ইতোমধ্যে দুফোঁটা বৃষ্টিও হয়েছে। সর্বব্যাপী অনিশ্চয়তা। তার পর অনেকক্ষণ হালকা পাতলা বৃষ্টি হল– প্রায় ঘণ্টা-দেড়। বিদ্যুৎ না, মেঘের ডাক না। হাওয়া এখনও বইছে। তবে জোরটা কমেছে।
নারকোল গাছ এখানে সর্বোচ্চশির। কখনও মনে হয় windmill, কখনও-বা আনাড়ি হাতে তৈরি দশভূজার মূর্তির মতো।
দিনটা সুন্দর গেল। সন্ধ্যায় মেঘলা ছিল বলে ঈদের চাঁদ দেখার কোনও প্রশ্নই উঠল না।
***
১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
কত না দৃশ্য দেখা যায় এখানে ঝড় উঠলে।
খাড়ির ভিতরে দু খানি জালি বোট এবং আর সব নৌকো নিশ্চিন্ত। খাড়ির বাইরে কুণ্ডের বাইরে ছিল মহাজনি নৌকো–বালুভর্তি। সে খাড়ির ভিতর আশ্রয় নেবার জন্য রওনা দিল। একজন জল সেঁচছে– একজন হাল ধরেছে, আর দু জনা জোর বৈঠা চালাচ্ছে। ভাটাতে যাচ্ছে বটে কিন্তু পূর্ব-দক্ষিণের হাওয়া বলে তাকে পুরো লড়াই লড়ে ইঞ্চি ইঞ্চি করে এগুতে হল। খাড়িতে ঢুকে নিষ্কৃতি।
মাঝ-নদীর চর থেকে আসছে আরেকখানা মহাজনি। ওখানে হাওয়ার থেকে কোনও আশ্রয় নেই। হয়তো-বা নৌকোতে বালু। সে যদি পুরো ভেজে তবে নৌকো ডুবিয়ে দেবে। তাই এই ঝড় মাথায় করে পুবের বাতাসের সঙ্গে লড়তে লড়তে এল। খাড়ির মোহনায় পৌঁছতে এতই বেগ পেতে হয়েছে যে সেখানে পৌঁছনোমাত্রই একজন রশি হাতে মাটিতে নেবে বাকিটা টেনে নিয়ে এল।
