***
২ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭ সমস্ত বাংলায় ভীষণ ঝড়, রাত্রে খড়গপুরে বৃষ্টি।
ভোরবেলা থেকে ধূ ধূ প্রচণ্ড উত্তরের বাতাস। ঘরে মশারির ভিতর গায়ে চাদর জড়াতে হল। আকাশ মেঘলা। একদিকে আসন্ন বর্ষণের কালো রঙ মাখা।…
***
৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
ভোর থেকেই সুন্দর দক্ষিণের বাতাস।
কখন মেঘ জমতে আরম্ভ করেছে লক্ষ করিনি। পৌনে তিনটে নাগাদ স্নান করতে যাবার সময় দেখি, উত্তর-পশ্চিম কোণে কালো মেঘ। তার কিছুক্ষণ আগে থেকেই খানিকটে গরম আর গুমোট ছিল বলে পাখা চালাতে হয়েছিল। বাথরুমে থাকা অবস্থাতেই লু উঠল। খেতে বসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বেশ জোর বৃষ্টি নামল।
উত্তর দিক থেকে। কয়েকদিন আগে W. F. বলেও ছিল বটে, উত্তর-পশ্চিম থেকে ঝড় বইতে পারে।
তোড়ে বৃষ্টি। দু একবার শিলঙের মতো দু ঝাঁপটা বৃষ্টি মেঘের মতো বারান্দা পেরিয়ে ঘরে এসে ঢুকল।
বোধহয় ১৫/২০ মিনিটের বেশি বৃষ্টি হয়নি– সমস্তটাই উত্তর থেকে– তবু ঘরের মাঝখান অবধি শুধু ভিজে যায়নি, রীতিমতো জল দাঁড়াল। চৌকাঠ না থাকার ফল। বেশিক্ষণ এরকম তোড়ে বৃষ্টি হলে ঘরের জিনিসপত্র রাখবার জায়গা থাকত না।
রাবেয়া আজ ফিরল না কেন বুঝতে পারলুম না।
সন্ধ্যায় পদ্মার জল অদ্ভুত অলিভগ্রিন হল।
এখনও বেশ মোলায়েম ঠাণ্ডা। অতি মৃদু দক্ষিণের বাতাস (০০.৩০), তবে দু চারটে মশার ভনভনানি কানের কাছে।
***
৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
আজও সন্ধ্যার পর সামান্য বৃষ্টি হল। এ কদিন রাতদুপুরে হাওয়া বন্ধ হত। আজ আর তা হল না। পরদিন পর্যন্ত সুন্দর হাওয়া ছিল।
***
৫ জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৭
দুপুরবেলা খুব ঘন মেঘ জমল।
খুব হাঁকডাক। এন্তের আঁক দেমাক। বুঝি আকাশ ফেটে পড়বে।
আধ আউন্স শিলাবৃষ্টি হল।
তার পর তিন আউন্স বৃষ্টি। সে-ও পূর্বদিনের মতো উত্তরের বাতাসে জলকণা।
তার পর হাওয়া বন্ধ।
এখন (১৯.৪৫) সুন্দর বাতাস।
পুবের বাতাস যখন বইছিল তখন পশ্চিমের স্রোতের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পদ্মার বুকে যা সাদা ফেনার ঢেউ জাগাল, তা-ও আবার এমন chopped যে সে এক প্রলয় কাণ্ড
.
বৃহস্পতিবার সকালের বসুমতী লেখে :
…অন্তত আবহাওয়া অফিস বুধবার রাত্রে যে পূর্বাভাস দিয়াছেন তাহাতে অদ্য বৃহস্পতিবার ঝড়বৃষ্টি হইবার কোনও সম্ভাবনার কথা উল্লেখ তো নাই, বরঞ্চ বলা হইয়াছে যে, অদ্য আবহাওয়া শুষ্ক থাকিবে ও দিবাভাগের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাইবে!
***
৬ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
কলকাতায় কালবৈশাখী, সামান্য বৃষ্টি। সেই যে গেল শুক্রবার বৃষ্টি হয়েছিল, তার পর আর কষ্টদ গরম পড়েনি। ফৈজু ভাই ঠিকই বলেছিল, একবার বৃষ্টি হলে সব ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আমি ভেবেছিলুম, শান্তিনিকেতনের মতো উটকো বৃষ্টি হয়ে ফের গরম পড়বে। তা হল না, Thank God, touch wood! So far.
আজ বেশ ঠাণ্ডা। দিনে একবার ঝড় উঠেছিল। রাত্রে ২২টা নাগাদ অল্পক্ষণ সামান্য বৃষ্টি হল। এখন ০০.৩০-এ সারা আকাশ জুড়ে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে আর গুরুগুরু মেঘ ডাকছে যেন খাঁটি বর্ষাঋতু। অতীব রমণীয়।
তার পর নামল তুমুল বেগে বৃষ্টি। সে কী বৃষ্টি। আর ঝঞ্ঝার বাতাস। এক্কেবারে খাঁটির খাঁটি বর্ষা।
***
৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
প্রবল ঘূর্ণির্বাত্যা in Bonga from 6.45 to 7.30 in the moming.
সকাল থেকে রীতিমতো ঠাণ্ডা বাতাস।
সমস্ত দিন মেঘলা আর ঠাণ্ডা। দুপুরবেলাও শুধু গেঞ্জি গায়ে দিয়ে থাকা যায় না। সকালে তো ড্রেসিংগাউন পরেই কাটাতে হল।
সমস্ত দিনটা গেল আঁটি বর্ষাঋতুর মতো।
রাত প্রায় দশটা থেকে কী বিদ্যুতের খেলা। বিদ্যুত্বহ্নির সর্প হানে ফণা যুগান্তের মেঘে।
গেল রাত্রির বৃষ্টিতে আকাশ থেকে শেষ ধূলিকণা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গিয়েছে বলে আজ সকালে দূরের চরের মনে হয় ওপারের গাছপালা পরিষ্কার ঘনশ্যাম দেখাচ্ছিল। দেশে ধানক্ষেতের ওপারের গ্রাম যেরকম দেখায়। দূর-দূরান্ত অবধি অবাধ দৃষ্টি ধেয়ে গিয়ে যা-কিছু দেখবার সব দেখা যায়। নদীর বড়ধারা যেখানে শূন্যে লীন হয়েছে– বালুচরের উপর যে কটি সবুজ ঘাস রাতারাতি গজিয়েছে। স্বচ্ছ– একেবারে স্বচ্ছ। মনে হল আমার চোখের উপর যে চামড়ার পরদাটা রয়েছে সেটাকেও যেন কাল রাত্রের বৃষ্টি ধুয়ে পুঁছে ঝকঝকে স্বচ্ছ সাফ করে দিয়ে গিয়েছে।
রাবেয়া সকালে পাবনা গিয়েছিল, সন্ধ্যায় ফিরে এল।
মাইজম ভাইসাহেব কাল ও আজ রাত্রে এখানে খেলেন।
***
৮ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৬৭
কী শীত, কী ঠাণ্ডা! সমস্ত রাত বৃষ্টি হয়েছে নাকি? এখন তো ধমকে ধমকে বাতাসের ঝাঁপটার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি আসছে উত্তর দিক থেকে (৭.৩০)। যেন ভরা বর্ষার ভোরের বৃষ্টি।
এই আজ প্রথম নদীতে স্নানার্থিনী নেই। একটিও না।
তবু তো স্নান এ দেশে fetish necessity না হলেও। বৃষ্টি থামতেই সেই কনকনে ঠাণ্ডাতেই দু তিনটি রমণীর আবির্ভাব। ওদিকে যে পোলটা তৈরি হচ্ছে তারও মজুররা কাজে লেগে গিয়েছে।
তিনজন জেলে উড়োন জাল ফেলে মাছ ধরছে। অন্যদিন এ সময়ে ধরে না। বোধহয় গরম বলে এতক্ষণে মাছ জলের গভীরে ডুবে যায় যেখানে জাল পৌঁছয় না।
দূরদূরান্ত অবধি কী সুন্দর পেলব ধরণী। বাতাসে মাঝে মাঝে যখন গতিবেগ কমায় তখন বিশাল পদ্মার উপর যেন ছোট ঘোট নাগ-নাগিনী ক্ষুদে ক্ষুদে ফণা তোলে। দূরে চরের সদ্যজাগা কচি সবুজের প্রলেপ দিয়েছে সবে-গজা ঘাস। তার পিছনে প্রাচীন গাছপালার ঘন সবুজ। তার পিছনে কাজল-নীল আকাশ।
