কাজেই পদ্মাতে নৌকা চালানো যে কী হুঁশিয়ারির কাজ সেটা এ সময়ে এদেশে এলে একটা অভিজ্ঞতা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায়।
রাত এগারোটা অবধি এই সূক্ষ্ম ধুলোর মাঝখানে খেতে বসতে ইচ্ছে করে না।
মাইল বারো দূরে, শারদার কাছে ছেলেটির মৃতদেহ আজ পাওয়া গেছে। তাই বলছিলুম, দু ঘণ্টা পরেও যেখানে সে ডুবেছিল সেখানে ওরা জাল ফেলেছিল কোন আক্কেলে।
বাপের নাম রেবতী সান্ন্যাল। বিশী যা বলল সেটা বাচ্চুর কাহিনীর সঙ্গে মেলে। তবে প্রথমটায় তারগেলুম, গেলুম কেউ বিশ্বাস করেনি, পরে দুটি ছোকরা তাকে ধরেও ছিল বটে তবে বয়সে কাঁচা বলে ঝাঁপটাঝাঁপটিতে দমবন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়াতে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
গরম অল্প কমেছে পূর্ববঙ্গের সর্বত্রই, কিন্তু এখানে প্রতি রাত্রে এই ধুলোর অত্যাচার অসহ্য হয়ে উঠেছে।
মেঘ রোজই সকালের দিকে আকাশের এখানে-ওখানে দেখা যায়। বোধহয় শেষরাত্রে বা ভোরে যখন হাওয়া বন্ধ হয় তখন জমবার সুযোগ পায়। তার পর হাওয়া উঠে দুপুর হতে-না-হতে মেঘ হাওয়া।
মেঘের চেহারা অনেকটা আকাশের ডাবরে নীল দুধে বদখদ দম্বল দিলে যেরকম হেথায় জমাট হোথায় জোলো দই জমে সেইরকম!
.
১২ তারিখ প্রিন্স আলী খান মোটর দুর্ঘটনায় গত হয়েছেন।
জিনিসটা অত সরল নয়।
প্রথমত তিনি মারা গেলে করিম– প্রতিপক্ষ দলের আর কোনও ইমাম প্রার্থী রইলেন না। দ্বিতীয়ত করিমের প্রতিপক্ষ দল নিজেদের অসন্তোষ হালে প্রকাশ করছিল। তাই করিম পক্ষীয় দলের পক্ষে এই দুর্ঘটনার ব্যবস্থা করা অসম্ভব ছিল না।
দুর্ঘটনায় দেখা যাচ্ছে,
(ক) আলী পূর্বে জানা ঠিকঠাক করা রাঁদেভুতে যাচ্ছিলেন– এলোপাতাড়ি bunmelu করতে বেরোননি। আততায়ীর পক্ষে আগেভাগেই জানা কঠিন ছিল না।
(খ) আলী অতি বিচক্ষণ, অভিজ্ঞ ড্রাইভার। যে বয়সে মানুষ par excellence গাড়ি চালায় তার বয়েস সেই। চালাচ্ছিলেন ৩৮ মাইল বেগে প্যারিসে সে কিছুই নয়, তা-ও রাত্রিবেলা।
(গ) তিনি ধাক্কা মারেননি। মোড় নিতেই অন্য গাড়ি এসে তাকে ধাক্কা দেয়।
***
প্রথম বর্ষণ
৩০ বৈশাখ, ১৩৬৭
ঘুম থেকে উঠলুম প্রায় উনিশটায়। দেখি মেঘ জমেছে, কিন্তু সেরকম কালো-ঘনঘটা নয় যা দিয়ে বোলপুরে বৃষ্টি নামে। সকালে মেঘ করেছিল কিন্তু অন্য দিনের মতো দুপুরবেলা হাওয়ার জোরে অন্তর্ধান করেনি। আপিসের বড়বাবু বৃষ্টির ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন।
তার পর বিদ্যুৎ চমকাতে আরম্ভ করল। ক্রমে ক্রমে আকাশের সর্বত্রই। মেঘও ডাকল জোর। তবু বৃষ্টি নামে না।
৮-১০-এ অতি সূক্ষ্ম বারিকণা দিয়ে বৃষ্টি আরম্ভ হল। মনে হল পুব-দক্ষিণে কোথাও বৃষ্টি হতে হতে এখানে এসে পৌঁছচ্ছে। অন্যদিনের তুলনায় হাওয়াও ছিল জোলো ও ঠাণ্ডা। অনেকক্ষণ পাঁয়তারা কষার পর বৃষ্টি এল উত্তর দিক থেকে। (ঢাকায় একাধিকবার এই ব্যাপার দেখেছি। তার পর আরম্ভ হল দক্ষিণ থেকে।
বিদ্যুৎ এমনই ঘন ঘন চমকাচ্ছিল যে পূর্ণ অর্ধ সেকেন্ডের তরে আকাশ একবারও অন্ধকার যায়নি। আর শিরা-উপশিরা ছড়ানো এতখানি আকাশ জুড়ে বিদ্যুৎ-জাল আমি ইতোপূর্বে কমই দেখেছি। আর মাঝে মাঝে রীতিমতো অশনি-পাত। বলতে গেলে মনসুন ভাঙার মতো তোড়জোড় এবং তা। তবে বৃষ্টিটা সেরকম জোর নয়।
ঘন্টা দুই পরে থামল। ধরণী শীতল হলেন।
বিজলি আলো বন্ধ হল ২১.০০। উৎপাত। খুলল ভোরে। মিলিটারি এদের ফাঁসি দিতে পারে না?
***
বৈশাখ ৩১, ১৩৬৭
কাল রাত্রে দু ঘণ্টা বৃষ্টির ফলেই আজ দেখি ঘাস চিকন-সবুজ রঙ ধরেছে।
দিনটা গেল অবিশ্বাস্য আবহাওয়ায়। মোলায়েম ঠাণ্ডা। ১৫.৩০-এ যখন শুতে গেলুম তখন ঘর অন্ধকার করার জন্য দোর-জানালা বন্ধ করলুম বলে পাখা চালাতে হল। না চালালেও হয়তো চলত।
উনিশটায় সেই সুন্দর ঠাণ্ডা দমকা বাতাস। সমস্ত দিন মেঘলা ছিল– এখনও তাই। অল্প বিদ্যুৎও চমকাল।
ঠাণ্ডার ঠেলায় ফিরোজের আর জ্বর নেই।
আঠারো তারিখ লাটসায়েব আসবেন। তারই প্রস্তুতির জন্য রাবেয়াকে কাল ঢাকা যেতে হবে। বিশ তারিখ (ইংরেজি) মেজ ভাই আসবেন।
ফিরোজের আবার জ্বর (২১.০০)।
আশ্চর্য! রাতদুপুরে হাওয়া বিলকুল বন্ধ হওয়াতে ঘরে মশারির ভিতর আর আরাম বোধ হচ্ছিল না। ওই সময়টাতেই তা হলে Max-heat গেল!
আকাশে চাঁদ, তারা; মেঘ নেই।
***
কৃষ্ণা পঞ্চমী, জ্যৈষ্ঠ ১, ১৩৬৭
ভোর থেকে মেঘলা ঠাণ্ডা আরামের বাতাস।
বিকেলের দিকে সামান্য একটু গরম।
সন্ধ্যায় অল্পক্ষণের জন্য পুব থেকে জোর বাতাস।
তার পর অনেকক্ষণ ধরে পুবের বাতাসে বিদ্যুৎ চমকাল।
তার ওপর বিদ্যুতের খেল উত্তর বাগে চলে গেল। বাতাসও কালকের মতো আজও রাত্রে বন্ধ হয়ে গেল। এখন (২৩.৪৫) কষ্টদায়ক না হলেও মশারির ভিতর অনারাম হবে।
রাবেয়া দুপুরের গাড়িতে ঢাকা গেল।
সাঁওতালরা পুব বাঙলার কতখানি গভীরে ঢুকেছে জানিনে। উত্তর বাঙলায় বগুড়া ও বারেন্দ্রভূমিতে তারা আছে। এখানে বাড়ির সামনে মাটি কাটার কাজ করছে।
এরা বোলপুরের সাঁওতালদের মতো বুনো-বুনো নয়। দু তিন জনে হাত ধরাধরি করে মৃদু গুঞ্জরণে গান গাইতে গাইতে এদের রাস্তা দিয়ে যেতে দেখিনি। বোলপুরীয়দের মতো এদের growth stunted নয়। অনেকটা তন্বঙ্গী শ্যামা বাঙালির মতো। শাড়িও পরে হুবহু বাঙালি ঝি মেছুনির মতো। গামছা আছে, কিন্তু সেটা কোমরে জড়ায়নি। এদের রঙও তৈলচিক্কণ নয়। একটু যেন অপরিষ্কারও। খিল খিল করে হাসতেও এদের দেখিনি।
