তার পর আরেকটা নৌকা এল রাঘব-জাল নিয়ে। সেটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজে লাগানো হল না। তবে কি রাঘব-জাল অতখানি গভীরে তলাতে পারে না।
প্রায় একটার সময় ওপার থেকে তরতর করে দক্ষিণ বাতাসে পাটল-রক্ত রঙের পাল তুলে একটা জুড়িন্দা নৌকা আসছে দেখা গেল– আমার মনে একটু আশা হল। এরা এসে সাবধানে খাড়ির ওদিকে প্রথম দাঁড়াল। তার পর একটা একটা করে আসলে জুড়িন্দা নয়– দুটোই খাড়ির মুখে এসে আর পাঁচজনেরই মতো লগির খোঁচা দিয়ে দিয়ে সন্ধান করল।
প্রায় দেড়টার সময় আস্তে আস্তে সব চেষ্টাই বর্জিত হল। যে জেলে জাল ফেলছিল সে খাড়ির ওপারে চলে গেল। জোড়া নৌকা এবারে লগি পুঁতে নৌকা বাঁধল। শুধু দু তিনটি ছেলে তখনও মাঝে মাঝে ডুব দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিল।
ইতোমধ্যে বাচ্চু এসে বলল, ছেলেটি নাটোরের। বাপের এক ছেলে (আপিসের চাপরাসি বলল বাপের নাম ডা. রেবতীভূষণ চক্রবর্তী), এখানে মামাবাড়িতে এসেছিল, সাঁতার জানত অল্পই; পাড়ার দুই ছেলে তাকে নিয়ে সাঁতরাতে যায়। ছেলেটা সাঁতারে অপটু। ডুবে যাচ্ছে দেখে ওরা সাহায্য করেও ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঠেকাতে পারেনি।
আমি শুধু একটা জিনিস বুঝতে পারলুম না। ও যদি খড়ির মুখেই ডুবে থাকে তবে ওখানে সন্ধান বেশি না করে করা তো উচিত ছিল আরও ভাটিতে। যত কমই হোক, স্রোত তো এখানে কিছুটাও আছে।
সন্ধ্যার পর ফের লু। এখন ২৩.৪৫ কিছুটা কমেছে। তবু squalls.
পদ্মা পূর্ণিমায় তাঁর নরবলি নিলেন!
[এই সর্বনাশা রূপ ছাড়াও পদ্মার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে লেখক দিনলিপির এক স্থানে একটি বর্ণনা লিখে রাখেন। প্রসঙ্গক্রমে সেটি এখানে লিপিবদ্ধ করা হল]
.
পদ্মা– রাজশাহী
একে উজান, তার ওপর পবন যেন বান ডেকেছে ভাটার দিকে। এতে কখনও নৌকো বাওয়া যায়? তা-ও যায়। স্পষ্ট দেখলুম দু জনাতে কী রকম তরতর করে নৌকা উজানে ঠেলে নিয়ে গেল— লগি মেরে মেরে।
পদ্মর সঙ্গে যাদের কারবার তারা সব পারে।
সপ্তমীর রাতে পদ্মা পেরিয়ে আসছে ধূ ধূ করে দক্ষিণা বাতাস–কখনও-বা দমকা দমকায়।
আমার সামনে বিরাট পদ্ম। তার চর, চরের পর ফের নদী, তার পর দূর সুদূরের ঝাপসা ঝাপসা গাছপালা– সে-ও চরের উপর। কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে মনে হয় আমি যেন অন্তহীন সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। বাতাসে-জলে ধাক্কাধাক্কিতে যে ধ্বনি উঠছে সেটা ক্ষীণতর হলেও সমুদ্রগর্জনেরই মতো। একই গাম্ভীর্য। সমুদ্রে যেরকম পাল পাল ঢেউ বেলাভূমির দিকে এগিয়ে আসে, এখানেও ঠিক তেমনি নদীর স্রোতের গতিকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে পুব-পশ্চিম জোড়া পালের পর পাল ঢেউ আসছে উত্তর থেকে দক্ষিণের দিকে, আমার দিকে। দমকা বাতাসে মাঝে মাঝে নদীর এখানে-ওখানে ফেনা জেগে উঠছে– ঠিক সমুদ্রেরই মতো।
এই ঝোড়ো বাতাসেও কিছুটা শীতলতা আছে বলে তার অস্থিরতা সত্ত্বেও সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে নদীপারে জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই।
মনে হল, আজ আরেকটা ছোট চর ভেসে উঠেছে।
বাতাসের উল্টোদিকে পাল তুলে দিয়ে নৌকা যেতে পারে, শুনেছিলুম, বিশ্বাস করিনি। এখন এখানে সেটা স্পষ্ট দেখলুম।
স্রোত বইছে পশ্চিম থেকে পূবে, হাওয়া বইছে পুব-দক্ষিণ থেকে উত্তর-পশ্চিম পানে। দু খানা নৌকো পাল তুলেছে নৌকোর সঙ্গে গা মিলিয়ে প্যারালেল– বোধহয় উল্টো বাতাস নৌকোর ভারের সঙ্গে আড়াআড়ি আটকা পড়ে হাওয়াটার বিপরীত ধাক্কা neutralize করে দেয়। এবং তার পর স্রোতের ভাটার বেগে গন্তব্যদিকে অগ্রসর হয়। কারণ খাড়ির ভিতরে ঢুকেই এরা পাল গুটিয়ে নিল– কারণ সেখানে হাওয়া কম।
পদ্মার এ অদ্ভুত সৌন্দর্য থেকে মুখ ফিরিয়ে খাতায় পোকার দাগ কাটতে হবে! বিরাট অথচ ছেঁড়া ছেঁড়া একটা কালো ছায়া নদীর ওপার থেকে এপারে ভেসে আসছে দ্রুতগতিতে– তার পিছনে যেন তার বাছুর, সে-ও আসছে সঙ্গে সঙ্গে। এদের আকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে এই দুটি মেঘ আকাশে খুঁজে নিতে কণামাত্র কষ্ট হয় না। পারে উঠেই যেন এরা অদৃশ্য হয়– ওদের যেন পাসপোর্ট-ভিজা নেই। একেবারে মিলিয়ে যায় তা নয়। কারণ পাড়ের বালি বড় সাদা। একটুখানি আমেজ যেন থেকে যায়। V. I, P-দের বডিগার্ডের মতো ভিড়ের মাঝখানে মিলেও মেশেনি।
ওই দূরে দূরে দু একখানি ডিঙি নৌকা। তারও দূরে চরের পশ্চিমতম কোণে লম্বা সারির খড়ের ঘর। শুনেছি পদ্মার জল গত বৎসর থেকে এপারের দিকে আসছে– আমাদের বাড়ির সামনেকার জলধারা আর খাড়ি নাকি গত বছরেও ছিল না, মাঝগাঙ্গের চর অবধি হেঁটে যাওয়া যেত– এদের ম্যাদ তা হলে আর ক-বছরের।
ওপারের হিন্দুস্থান ভোরের বৃষ্টি বর্ষণের ফলে বেশ পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
ওই উপর দিয়ে গেল বাঘডোগরা থেকে কলকাতার প্লেন।
এপারে মহাজনি নৌকো যাচ্ছে নির্ভয়ে পুরো পাল চেতিয়ে। আরেকখানা বিনা পালেই যাচ্ছে উজান। হালের কাছের মাঝিটা পর্যন্ত নেই। কাৎ হয়ে হয়ে পশ্চিম-দক্ষিণের দিকের বাতাসে চলেছে সূর্যাস্তের দিকে।
কাল রাত্রে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। কিছুক্ষণ ধরে গুমোট থাকার পর বইল উত্তর থেকে বাতাস। হঠাৎ দেখি আমার ঘরের ভিতর তুমুল কাণ্ড। উত্তর-দক্ষিণ বাতাসে লাগিয়েছে হাতাহাতি। যেন ফিরোজ আর ভজু।
***
২৯ বৈশাখ, ১৩৬৭
বাড়ির গেট বন্ধ করে যখন বেরোলুম তখনও অতি অল্প হাওয়া। বিশ কিংবা পঁচিশ কদম যেতে-না-যেতেই হুড়মুড় করে যে লু ধেয়ে এল তখন রীতিমতো সমস্যা হয়ে দাঁড়াল, এগুবো না বাড়ি যাব। নিতান্ত গোঁয়ার বলেই এগুলুম। অবশ্য গলির ভিতর ঢুকতেই অন্তত চোখ মেলে তাকাতে পারলুম।
