.
নবমী
২২ বৈশাখ, ১৩৬৭
ঠিক কালকেরই মতো। অসহ্য, দুঃসহ না কালকের চেয়ে কম না বেশি এসব আর চিন্তা করার শক্তি নেই।
ঠিক কালকেরই মতো রাত দশটায় লু। তবে গোড়াতে কমজোর ছিল। এখন ২২.৪৫, বাড়ছে। ধুলোতে লেখা যাচ্ছে না।
তার পর কিন্তু বাতাস কমে গিয়ে মশার উৎপাত শুরু হল। মশারি খাটাতে হল। সকালে দেখি, হিম পড়েছে। এই প্রথম।
আকাশে কণামাত্র মেঘের চিহ্ন নেই।
সিলেটে জোর বৃষ্টি।
***
২৩ বৈশাখ, ১৩৬৭
আজ কোনওদিক থেকে কোনওপ্রকারের বাতাস ছিল না। গরম অন্যদিনের তুলনায় কম বলেই মনে হচ্ছে। ঢাকা বলেছে, আমাদের এলাকা শুকনো শুকনিতেই যাবে। এটা বলার দরকার ছিল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে কল্পনামাত্র করতে পারিনে, কোনদিক হতে, কী কারণে মেঘ জমতে পারে আর বৃষ্টিই হতে পারে। এই যে দক্ষিণের বাতাস আসে সেই-বা কোত্থেকে? বঙ্গোপসাগর থেকে কলকাতা ছাড়িয়ে? তা হলে এত জোর পায় কোথায়? কলকাতার উপর দিয়ে তো এত জোরে বয়ে যায় না। তবে পদ্মাতেই এর জন্ম? তাই-বা কী করে হয়।
একটা জিনিস বিলক্ষণ বুঝেছি। হঠাৎ এমনই আচমকা এই দক্ষিণের বাতাস আসে কোনওপ্রকার মেঘ না জমে– যে, যে কোনও নৌকার পক্ষে এটা কাল। প্রথম ধাক্কা সামলাতে পারলেও সে বাতাস সামলে হাল ধরে নৌকো বাঁচানো শক্তিশালী পুরুষের দরকার। মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথ তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এই আচমকা ঝড় সম্বন্ধে একাধিকবার সাবধান করেছেন।
আজ এগার দিন হল এখানে এসেছি। গরমের ঠেলায় চৈতন্য যেন সময়ের হিসাব রাখতে পারেনি। মনে হয় মাত্র তিন-চার দিন হল।
রাত এগারটায় দক্ষিণের বাতাস উঠল। ধুলোয় ঝড় না তুলে সমস্ত রাত ব্যজন করে গেল।
***
২৪ বৈশাখ, ১৩৬৭
আজ দিনটা যেমন তেমন কাটল কিন্তু রাতটা গেল খারাপ। বাতাস ছিল না বললেই হয়। মশারির ভিতর-বাইরে শুয়ে আরামহীন রাত।
***
২৫ বৈশাখ, ১৩৬৭
দিনটা জ্যোঁও ত্যোঁও কাটে কিন্তু সন্ধ্যার পর থেকেই আরম্ভ হয় গরমের সত্য উৎপাত। ঘরটা তেতে ওঠে চরমে– ওদিকে বিজলির জোর কমে গিয়ে পাখা আর ঘুরতেই চায় না। বাইরেও গরম। হাওয়া বন্ধ। কখন বইতে শুরু করবে তার ঠিক নেই। সে-ও বইবে গরমই। কারণ চতুর্দিকে বৃষ্টি হয়েছে বা হবার আশা আছে বলে কোনও কাগজ আশা দেয়নি।
রাতটা কাটল দুঃসহ গরমে। অন্যদিনের মতো রাত বারোটায়ও ঠাণ্ডা হল না।
গেল দু দিন ঢাকা ভরসা দিয়েছিল, রাজশাহী অঞ্চলেও বৃষ্টি হতে পারে। আজ তা-ও প্রত্যাহার করল।
***
২৬ বৈশাখ, ১৩৬৭
আজ আরও গরম। সন্ধ্যার পর দক্ষিণ থেকে বাতাস কিন্তু ঠাণ্ডা নয়।
পূর্বে কিছুক্ষণ খরার বিজলি হানল। সন্ধ্যায় ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ জমেছিল। কিছুক্ষণের ভিতর তা-ও কেটে গেল। মেঘগুলো যেন কোথাকার বর্ষাভোজের পর ইতস্তত ছড়িয়ে ফেলা এঁটো পাতা। দেখলে হিংসে হয়, কোথাও যেন কপালীরা উত্তম বৃষ্টির উৎসব ভোজ করেছেন। আমাদের কপালে ছেঁড়া পাতা। ক্ষেমা-ঘেন্না করে সেগুলো চাটতে রাজি আছি– যদি তারা বৃষ্টি হয়ে নামেন। তা-ও তারা নামলেন না।
এখন (২৩.০০) জোর দক্ষিণের বাতাস কিন্তু আরামহীন। পদ্ম মাঝে মাঝে সমুদ্রেরই মতো অনেকক্ষণ ধরে একটানা গর্জন রব ছাড়ে। বড় গম্ভীর– তবে সমুদ্রের মতো উদ্দাম নয়। পাড়ে এসে ঢেউও মাথা কোটে না। সমুদ্রপারেরই মতো নারকেলপাতার একটানা ঝিরঝির শব্দ। অন্য পাতার সঙ্গে মেশা বলে ঠিক সমুদ্রপারের আওয়াজ নয়।
***
২৭ বৈশাখ, ১৩৬৭
কাল রাত্রে বাতাস ক্রমেই ঠাণ্ডা হয়ে এল বলে নিদ্রা হল ভালো।
ভোরে দেখি আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে মন্থর গতিতে রওনা দিয়েছে। পদ্মার বুকে কিন্তু দুর্দান্ত দক্ষিণের ঝোড়ো বাতাস। সেই বাতাসে পাল তুলে দিয়ে চলেছে খান-চারেক বিশাল মহাজনি নৌকো। দক্ষিণের বাতাস কী কৌশলে পাল দিয়ে কাবু করে নৌকা উজানে পশ্চিম দিকে যেতে পারে সেটা আমার বুদ্ধির অগম্য।
এখন ১৩, ৪৫-এ মৃদুমন্দ কিন্তু গরম বাতাস। মেঘ বেবাক অন্তর্ধান করছে। বুঝেছি এ ধরনের মেঘে বৃষ্টি হবে না। যদি হয় তবে হুড়মুড়িয়ে আসা কালো মেঘে– বিন নোটিসে, সন্ধ্যার দিকে। সে এখন মাথায়।
২০টায় লু উঠে (৩/৫-এর মতো) ধুলোয় ধুলোয় ত্রিভুবন ধূলিতন্ত্রের তাঁবেতে গেল। বারোটা থেকে সকাল অবধি সুন্দর বাতাস। ঘরের ভিতরে শুয়েও ভোরে গায়ের চাদর খুঁজতে হল।
***
পূর্ণিমা
২৮ বৈশাখ, ১৩৬৭
পদ্মার পাড়ে বাসা– আমাদের বাসা ছাড়িয়ে মাত্র দুটি কি তিনটি পরিবারটি সিরাজগঞ্জের। বিরাট নদীর সঙ্গে এদের আশৈশব পরিচয় থাকার কথা।
তিন ভাই স্নান করতে গেছে এগারটায়। যার বয়েস বাইশ সে হঠাৎ নাকি চিৎকার করল, ডুবলুম, গেলুম গেলুম। অন্য ভাইরা মশকরা ভাবল।
আমি যখন তাকালুম, বাড়ি থেকে, তখন ১১.৩০/১১.৩৫ নাগাদ। একটা নৌকা যোগাড় করে উড়ন জাল ফেলে ফেলে চেষ্টা করা হচ্ছিল ছেলেটাকে খুঁজে বের করার। ইতোমধ্যে গোটাতিনেক ছেলেও ডুব দিচ্ছিল– কেউ কেউ লগি পুঁতে তাই ধরে ধরে নামছিল। এদিকে ওদিকে বিস্তর ছেলে-ছোকরারা সাঁতার কাটছিল কিন্তু ডুব দিয়ে সন্ধান করার মতো শক্তি ওদের নেই, কারণ ওখানে ৩/৪ লগি গভীর জল।
ইতোমধ্যে মিলিটারির দু জন লোক একজনের মাথায় লোহার টুপি পাড়ে এসে জুটল। লোকজন তাদের চতুর্দিকে জটলা করল। তারা চুপ করে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখল। কিছু করল না– করবার ছিলই-বা কী?
