১৬ বৈশাখ, ১৩৬৭
এখানে আজ এই প্রথম দক্ষিণের বাতাস পেলুম। কিন্তু ১০/১১ টার ভিতর সেটা বন্ধ হয়ে গেল। তার পর উত্তর-পশ্চিমের বাতাস। তবে কালকের মতো দুর্দান্ত নয় ও পদ্মাকে সাদা সাদা ফেনার ঢেউয়ে বিক্ষুব্ধ করেনি।
***
১৭ বৈশাখ, ১৩৬৭
উত্তর-পশ্চিমের বাতাস কাল থেকে বন্ধ হওয়াতে গরম অল্প কম।
Message incomplete-এর বদলে একটা কাগজে ছিল massacre incornplete. খবরটা ছিল কোথাকার যেন ম্যাসাকারের। কিন্তু শেষে messacre incomplete সেনসরের ম্যাসাকার না খবরের ম্যাসাকার বোঝা গেল না।
.
এবারের গরম পূব বাঙলায়ও ভীষণ। ডেলি কাগজে প্রথম পৃষ্ঠায় রোজই ফ্ল্যাশ করছে। পাঁচ বসরে এরকম হয়নি। আমার হিসেবে তারও বেশি। সাত মাস ধরে এদেশে বৃষ্টি হয়নি। Simply terrific.
পশ্চিম বাঙলার কোনও খবর পাচ্ছিনে। কিন্তু সেখানে নিশ্চয়ই বৃষ্টি হয়নি, ঠাণ্ডাও পড়েনি। কারণ তা হলে পূর্ব বাঙলাকে যে তাতিয়ে তুলেছে উত্তর-পশ্চিম থেকে আসা গরম হাওয়ায় সেটা এল কী করে?
শীতে বৃষ্টি হয়নি। গরমে দিনের পর দিন শুকনো কেটে যাচ্ছে, আদপেই বৃষ্টি হল না, এরকম অবস্থা পূর্ব বাঙলায় আমি কখনও শুনিনি।
***
১৮ বৈশাখ, ১৩৬৭ আজকের কাগজ বলছে, দু একদিনের ভিতর ঝড়ঝঞ্ঝা হতে পারে। এখানে তার একমাত্র লক্ষণ, আকাশে .০১ হয়, কি না হয়, উটকো শরঙ্কালের হালকা মেঘ! এখন পশ্চিমের বাতাস বন্ধ। সকালে অল্প দক্ষিণা বাতাস পদ্মার উপর দিয়ে এল– সুশীতল না হলেও বেশ ঠাণ্ডা।
কলকাতায় গত ৩৪ বৎসরের মধ্যে এরকম পরপর এত অধিক তাপ দেখা যায়নি। ১৯৫৯-এ মাত্র একদিন ১০৮° থেকে ফের গরমি কমে যায়।
৭/৫/৬০-এর খবরের কাগজ রাজশাহী থেকে ৫/৫-এর খবরে বলছে এখানে নাকি পয়লা মেতে hottest day with 108° গেছে। ব্যস! তার আগে যে একটা খবর বেরুল ২৮/৪-এ এখানে ১১০° গেছে?
ধর্ম জানেন আমি ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু এই যে প্রতি সন্ধ্যায় বিদকুটে সব যন্ত্রপাতি নিয়ে খচখচানি আর তার সঙ্গে সঙ্গে বেসুরা বেতালা গান রাত বারোটা-তেরোটা অবধি এরও একটা সীমা থাকা দরকার।
ক্ষীণ চাঁদের আলো, মাথার উপর সপ্তর্ষি, দূর পদ্মার মৃদু গুঞ্জরণ, নারকেল-গাছের অল্প শিহরণধ্বনি– এছাড়া কোনও শব্দ নেই– শান্ত-গম্ভীর পরিবেশ, কেমন যেন রহস্যময়। এর ওপর এই অসহ্য খচখচানি!
***
২০ বৈশাখ, ১৩৬৭
মানিকগঞ্জ এলাকায় পদ্মার ভীষণ ঝড় ও নৌকাডুবি।
কয়েকদিন ধরে উত্তর-পশ্চিমের গরম হাওয়া বন্ধ।
আজ দুপুর আর বিকেল গেল গুমোট গরমে। ১০৮০-এর কম নিশ্চয় নয়।
উনিশটার সময় এল দক্ষিণ থেকে ঝড় লু। অতিশয় সূক্ষ্ম সাদা ধুলোতে সমস্ত আকাশ ছেয়ে গেল। দুরাশা গল্পে রবীন্দ্রনাথ দার্জিলিঙে কুয়াশায়-ঢাকা পৃথিবী দেখে বলেছিলেন, ভগবান যেন রবার দিয়ে সৃষ্টি ঘষে তুলে ফেলতে চান। এখানে সাদা ধুলো দিয়ে। এ ধুলো পদ্মচরের।
পদ্মা নদী পর্যন্ত আর দেখা গেল না।
কিছুক্ষণের জন্য সপ্তর্ষি পর্যন্ত লোপ পেল।
ন টার সময় সামান্য একটু ক্ষান্ত দিয়ে ফের সমস্ত রাত জোর দক্ষিণের বাতাস বইল। ঠিক ঝড় নয়– ঝোড়ো বাতাস। এখনও চলছে।
আকাশের অতি উচ্চ যে আড়াইখানা ছেঁড়া মেঘ তারা পশ্চিমদিকে চলে গেল।
বিদ্যুৎ চমকালো না, মেঘ ডাকল না।
বাতাস এসময় যতটা ঠাণ্ডা হয় ততটাই– কোনওদিকে বৃষ্টি হয়ে থাকলে যতখানি শীতল হয় তার কিছুমাত্র না। নিতান্ত পদ্মার বারো মাইল জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে এসেছে বলে যা ঠাণ্ডা হওয়ার কথা।
একেবারে মেঘটেঘ না জমেই হঠাৎ ঝড়।
সেই ঝড় যখন তার চরম রুদ্রে তখন দেখি একটা দাঁড়কাক প্রাণপণ তার সঙ্গে লড়ছে। ইচ্ছে করলেই যেখানে খুশি সে আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু সে যেন আশ্রয় না খুঁজে অন্য কিছু খুঁজছে। তার হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীকে।
***
২১ বৈশাখ, ১৩৬৭
কোথায় কালকের লুর পর আজ দিনটা ঠাণ্ডায় যাবে, আজ গেল সবচেয়ে গরম দিন।
ভোরে পদ্মাতে প্রথম স্নান। আমাদের বাড়ির সামনে পদ্মা একটা মাছের বঁড়শির মতো হুক করেছে। সেই হুকে রাজ্যের মেয়েমানুষ ভোর থেকে নাইতে আসে। তাদের ঘন ঘন অঙ্গ বিতাড়ন এবং যত্রতত্র মর্দন থেকে বোঝা যায় তারা এই নিদাঘ যামিনী নিষ্কর্মা কাটায়নিঃ তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু সেই হুকে তো আর নাইতে পারিনে। তাই হুক পেরিয়ে খানিকটে এগোতে হয়। তখন দেখি পায়ের তলায় লিকলিকে ভলভলে প্যাঁচপেঁচে পলিমাটি। বালুর সুখস্পর্শের বদলে এই স্লাইমি কাদার উপর হেঁটে যাওয়া, এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই কাদার ক্লেদময় স্পর্শে সর্বাঙ্গে কেমন যেন কিরকির করে। শত শত কিলবিলে বা মাছের উপর দাঁড়ালে যে অনুভূতি হয় এ তাই।
জল ভারি সুন্দর। দক্ষিণের বাতাসে সঞ্চালিত হয়ে সর্বাঙ্গ সহস্র চুম্বনে শীতল করে দেয়।
রাত দশটায় ফের লু। কিন্তু কালকের মতো জোরালো নয়। এবং ঠাণ্ডাও নয়। এ অঞ্চলে অন্তত কোথাও বৃষ্টি হয়নি।
লু কালকেরই মতো এল হঠাৎ আচমকা। আকাশে একরত্তি মেঘও ছিল না। এখন বুঝলুম পদ্মার ঝড় কেন ভয়ঙ্কর। আকাশে বাতাসে কোনওপ্রকারের ইশারা না দিয়ে হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে নেমে আসে। আস্তে আস্তে যে গতিবেগ বাড়বে তা-ও নয়। অসাবধান কেন, সাবধানী দাড়িও এর হঠাৎ ধাক্কা সামলাতে পারে কি?
সমস্ত রাত এবং এখনও হিল্লোলের পর হিল্লোলে দক্ষিণ বাতাস।
