কিন্তু এস্থলে এটা আমার মূল বক্তব্য নয়। মমাগ্রজ আমাকে অনুরোধ করেছেন, যেহেতু আমরা একই পাঠশালে একই স্কুলে পড়েছি, অতএব আমিও যদি আমার বাল্যস্মৃতি স্মরণ করি তবে তাঁর ভুলে যাওয়া কথাগুলোও তাঁর স্মরণে আসবে।
এটিও উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু বিপদ এই যে, আমি প্রায় ষোল বছর বয়েসে, স্কুল পাস করার পূর্বেই দেশ ছেড়ে পশ্চিম বাঙলার শান্তিনিকেতনে চলে আসি এবং পরবর্তী জীবনের অধিকাংশ বাইরে বাইরে কাটে। গোড়ার দিকে বছরের দুই ছুটিতেই দেশে গিয়েছি, পরবর্তী জীবনে সেটাও সম্ভব হয়নি– বছরের পর বছর কেটে গিয়েছে।
মানুষ বিদেশে দীর্ঘকাল থাকলে বাল্যস্মৃতি ম্লান হয়ে যায়। তার কারণ দেশে থাকলে দেশের লোকজন ঘরবাড়ি তাকে পুনঃপুন প্রাচীন দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি ক্রমে ক্রমে দেশের নানা প্রাচীন কীর্তিকাহিনীও সে শোনবার সুযোগ লাভ করে– বাল্যে যেগুলোর প্রতি স্বভাবতই তার কোনও কৌতূহল ছিল না।
আমার ভাগ্যে হয়েছে উল্টোটা। বছরের পর বছর কেটে গিয়েছে, সিলেটি বলা দূরে থাক, বাঙলা বলারও সুযোগ ঘটেনি। দেশের লোকজন, ছেলেবেলার ঘটনাগুলোকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সেগুলোকে সজীব রাখার জন্য জলসিঞ্চন করার নসখা প্রায় পাইইনি বললেও অত্যুক্তি হয় না। স্মৃতির অঙ্গনে চটুল নৃত্য জাগাতে হলে এক হাতের করতালি অসম্ভব।
অথচ স্মরণ করিয়ে দিলে এখনও অনেক কিছু মনে আসে।
পূর্বেই আমার ভাতার বিষয়ের উল্লেখ করেছি। তার স্মৃতিকাহিনীতে তিনি একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন : তিনি গোড়ার দিকে রীতিমতো পয়লারি স্কুল-পালানো ছেলে ছিলেন। আমার তখন হঠাৎ যেন কোন যাদুমন্ত্রের বলে চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ছবিটি। দু তিনখানা তক্তপোশ-জোড়া বিরাট খাটে সুদূরতম প্রান্তে দাদা দেয়ালে হেলান দিয়ে মুখের ভাব করেছেন, পাদমেকং ন গচ্ছামি; বিদ্যামন্দির নৈব নৈব চ। বাবা-মা সাধাসাধি করছেন। কড়ে আঙুলে দোয়াত ঝুলিয়ে বড়দা স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে বিরক্তি প্রকাশ করছেন ও সবচেয়ে বেশি কাকুতিমিনতি করছেন আমাদের সম্পর্কে দাদা আলফী মিয়া। আর আমি এই পাঁচজনের বাইরেপাঁচের বাদ। আমি শুধু ঘুরঘুর করছি চতুর্দিকে। আর ভাবছি, আমাকে যেতে দিলে আমি এখখুনি যাই। তখনও স্কুল নামক ব্যাটির সঙ্গে পরিচয় হয়নি বলে দাদার আতঙ্ক কিছুতেই হৃদয়ঙ্গম হত না।
অথচ দাদা বলতে বেবাক ভুলে গেলেন না চেপে গেলেন– সে যখন যেতে আরম্ভ করলেন তখন এক লতে শুয়াগাছের মগডালে উঠে বসলেন অবহেলে। এবং সেই যে বসলেন, তার পর কখনও তাকে কেউ নামতে দেখেনি। পরে সপ্রমাণ হল তিনি আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে সেরা পড়ুয়া।
সামান্য দুএকটি উদাহরণ দিই।
তখনকার দিনে আর কটি মুসলমান ছেলে স্কুলে যেত? এবং তাদেরও প্রধান আতঙ্ক ছিল অঙ্কশাস্ত্রের প্রতি। অথচ সপ্তম শ্রেণিতে উঠে তিনি গায়ে পড়ে নিলেন মেকানিকস্যার জন্য দরকার তুখোড় ম্যাথ জ্ঞান। এবং তখনকার দিনের দুই অঙ্কবিশারদ ক্ষীরোদবাবু (ইনি অল্পবয়সে গত হন) ও গোপালবাবুর প্রিয় শিষ্য হয়ে উঠলেন। পরবর্তী যুগে কলেজে নিলেন 1.Sc. সে-ও এক বিস্ময়। বি.এস-সিতে সেকেন্ড ক্লাস অনার্স পেয়ে তার ক্ষোভের অন্ত ছিল না। তার জন্য প্র্যাকটিকালের একটি দুর্ঘটনা দায়ী। স্থির করলেন, এম.এস-সিতে সেটা তিনি অধ্যাপক রামনের (তখনও রামনরশ্মি আবিষ্কৃত হয়নি ও তিনি ও তাঁর অন্যতম সহকর্মী শিষ্য কৃষ্ণন বিশ্ববিখ্যাত হননি) কাছে শিক্ষালাভ করে পুষিয়ে নেবেন।
দিনলিপি
(১২ বৈশাখ ১৩৬৭– ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৭)
CALCUTTA– ISHURDI– RAJSHAHI
১২ বৈশাখ ১৩৬৭
A terrible journey from Calcutta to Rajshahi.
Yesterday it was 107° here in Calcutta. Fancy catching the train at 16.00, hottest part of the day. Kendu, Mukuldi, Ghantu, Saumen & Prof Saurin Dasgupta at the station.
I do not recollect the times. From 19 to 21 or more at Darsana (India) From 21.30 to 23.45 of so, at Darsana (Pak).
1.35 Ishurdi. No room in the waiting room. Hot like hell even at that early hour. Wait wait till 6. Train left at 7.45. No fan in the compartment till 7.35. Hell again. I thought it was the last leap. No, another change at Abdullapur at about 8.15. jump up & down the railway line ditch. Hot platform! Wait for the train. Train left at 8.30.9.30. at Rajshahi.
***
রাজশাহী
১৫ বৈশাখ, ১৩৬৭
এ কদিন ধরে পুব বাঙলার সর্বত্রই অসাধারণ গরম যাচ্ছে। কোনও কোনও জায়গায় ১০৫° পর্যন্ত উঠেছে। ঢাকা ১০২°, দিনাজপুর ১০৬°। রাজশাহী তো terrific তবে তার উত্তাপ কাগজে দেয়নি। এখানকার লোকে বলছে ৫/৭ বছরের ভিতর এরকম গরম পড়েনি। কাগজ বলছে, উত্তর-পশ্চিম থেকে আসা গরমের ফলে। এখানে এসেছি অবধি সেই হাওয়াই দেখছি। দক্ষিণে পদ্মা– সেখান থেকে এযাবৎ কোনও হাওয়া আসেনি। কালবৈশাখী বা অন্য কোনওপ্রকারের বৃষ্টি, রাজশাহী অঞ্চলে অন্তত এখনও হয়নি।
অথচ একেবারে খোলা ছাদে শুয়ে ভোরের দিকে গায়ে একখানা চাদর টানতে হয়।
***
