শ্ৰীযুক্ত শঙ্কর ক্ষোভ করেছেন, বাংলা ভাষা আজ ওপার বাংলাতে তেমন প্রাণোচ্ছাস সৃষ্টি করে না। … একুশে ফেব্রুয়ারি আজ তেমনভাবে আর অনেককে নাড়া দেয় না। শ্রদ্ধেয়া উমা চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, কোনও একটা ঘটনাকে কেউ কোলে নিয়ে তো বসে থাকতে পারে না। দুটো কথাই ঠিক। কিন্তু শ্ৰীযুক্ত শঙ্কর তার সঙ্গে সঙ্গে এ আশাও করছেন, তার সুন্দর সরল ভাষায় সবিস্তর বলে না থাকলেও, একুশের প্রতি শ্রদ্ধা উভয় বঙ্গের বাঙলাপ্রেমীদের চিরন্তন অনুপ্রেরণার অফুরন্ত উৎস হয়ে থাকবে– নিত্যদিনের ব্যবহারিক ভাবচিন্তার আদান-প্রদানের জন্য তো বটেই, সেই শ্রদ্ধাপ্রসাদাৎ রবি কবি যে অক্ষর ভাণ্ডার রেখে গেছেন তার যোগ্য ওয়ারিশানও আমরা হতে পারব। আমি আরও আশা রাখি, যোগ্যজন সে ভাণ্ডারের শ্রীবৃদ্ধিও করতে পারবেন। অবশ্যই শঙ্কর একথা বলতে চাননি, একুশেকে কোলে নিয়ে বসে থাকতে হবে এবং নিশ্চয়ই শ্রদ্ধেয়া উমা একথা বলেননি যে, একুশের প্রতি কোনওপ্রকারের শ্রদ্ধা প্রদর্শন নিষ্প্রয়োজন। অধিকাংশ নীতিই চরমে টেনে নিয়ে গেলে সেটা অনেকখানি রিডাকশিও আড় আবসুড়ুম হয় বটে, কিন্তু বহু ক্ষেত্রে উভয়ের বক্তব্য পরিষ্কার হয়ে যায়, তখন ধরা পড়ে উভয়ের বক্তব্যের মধ্যে তেমন কিছু নীতিগত পার্থক্য নেই, পার্থক্য যেটুকু আছে– যদি আদৌ থাকে তবে সেটুকু শুধু মাত্রা নিয়ে। অবশ্য কট্টরপন্থি লোক সর্বাবস্থায়ই কিছু না কিছু থাকবে। ঢাকা-কলকাতার বিস্তর লোক আছেন যারা ঘোরতর আপত্তি তুলে বলেন, বাঙলা ভিন্ন অন্য কোনও ভাষা যদি কোনও বিদ্যালয়ে শিক্ষার মাধ্যম হয় তবে সে বিদ্যালয়কে সরকার কোনও আর্থিক সাহায্য তো করতে পারবেনই না– ওই বিদ্যালয়কে কোনওপ্রকারের স্বীকৃতিও দিতে পারবেন না।
রবীন্দ্রনাথ নীতিগতভাবে এবং কার্যত পারতপক্ষে বিশ্বভারতীর অধ্যয়ন-অধ্যাপনা বাঙলার মাধ্যমেই করতেন– আর আদ্যবিভাগের (স্কুলের) তো কথাই নেই। অথচ শ্রীযুক্ত সুধীরঞ্জন দাশ স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে, স্কুল-স্থাপনার প্রায় অর্ধশতাব্দী পরে ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষাদানার্থে একটি স্বতন্ত্র শাখা খোলেন, কিংবা প্রচেষ্টা করে কৃতকার্য হননি– আমার ঠিক মনে নেই।
***
আমি মাসের পর মাস ঢাকায় কাটিয়ে এসেছি। বাংলাদেশের অগ্রগতির পথে যে কত কণ্টক, কত অগণন সমস্যা তার একটা অতিশয় অসম্পূর্ণ লিস্টি আমি দিনের পর দিন পূর্ণ একটি মাস ধরে খবরের কাগজ থেকে এবং আত্মজনের বাচনিক মাত্র এই দুটি পন্থায় নির্মাণ করার প্রচেষ্টা দিল– অর্থাৎ গ্রামাঞ্চলে যাইনি, পূর্ববঙ্গীয় সাংবাদিকদের আমি প্রায় চিনি না বললেও অত্যুক্তি হয় না, কোনওপ্রকারের স্ট্যাটিটি সগ্রহ করার জন্য যত্রতত্র টো টো করার মতো সামান্যতম শারীরিক বল আমার নেই– বস্তৃত প্রতি মাস অন্তত একটিবার বাসভবন দেহলি আমার ছায়াটি দেখেছে কি না সে বিষয়ে প্রতিবেশীগণের মনে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।… শেষটায় নিরাশ হয়ে ফিরিস্তি নির্মাণকর্মে ক্ষান্ত দিই।
বাংলাদেশ সরকার অতি উত্তমরূপেই অবগত আছেন তাদের সমস্যা কী– এই একটি বিষয়ে আমার মনে কণামাত্র সন্দেহ নেই।৭১-এর ন মাস যেন বন্যার মতো পুব-বাংলার লোককে হত্যা করে, ইতস্তত নিক্ষিপ্ত করে, গৃহহীন অন্নহীন আত্মীয়-আত্মজনহীন করে দিয়েছিল, কিন্তু, কিন্তু এখন? এখন দিনের পর দিন– কতদিন ধরে চলবে তৃষ্ণার্তের এক আঁজলা পানির তরে আকুতি? যে বন্যা কুল্লো মুলুক ভাসিয়ে ছয়লাপ করে দিয়েছিল সেই বন্যাই যাবার বেলা নিয়ে গেছে তৃষাতুরের শেষ জলকণাটুকু! কিস্মত! কিস্মত!! কিস্মত!!!
বাংলাদেশের আপামর আচণ্ডাল ভদ্রেতর, কি রাষ্ট্রের কর্ণধার, কি নাগরিক, কি জনপদবাসী সক্কলের সম্মুখে যে কী নিদারুণ পরীক্ষা সেটা এ বাংলা থেকে তো কথাই নেই, ও বাংলায় বাস করে হৃদয়ঙ্গম করা অতিশয় সুকঠিন।
যত কঠিনই হোক না কেন, একটা সত্যে আমি বিশ্বাস করি :
আপনি অবশ হলি,
তবে বল দিবি তুই কারে?
উঠে দাঁড়া, উঠে দাঁড়া,
ভেঙে পড়িস না রে ॥
করিস নে লাজ, করিস নে ভয়,
আপনাকে তুই করে নে জয়
সবাই তখন সাড়া দেবে,
ডাক দিবি তুই যারে ॥
বাহির যদি হলি পথে
ফিরিস নে তুই কোনওমতে,
থেকে থেকে পিছন পানে
চাস নে বারে বারে ॥
নেই যে রে ভয় ত্রিভুবনে,
ভয় শুধু তোর নিজের মনে
অভয়চরণ শরণ করে
বাহিরে হয়ে যা রে ॥
দিনলিপি – ১০
আমার অগ্রজ তার বাল্য, কৈশোর ও পরিণত জীবন যে দেশকালপাত্রের ভিতর কাটে তার বর্ণনা লিখেছেন। এতে করে প্রধানত শ্রীহট্টবাসী, গৌণত পূর্ব পাকিস্তান, এমনকি আসামবাসীরাও উপকৃত হবেন। মুখবন্ধে তিনি বিশেষ করে নবীন সেনের দৃষ্টান্ত তুলে নিবেদন করেছেন, তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন যতদূর সম্ভব চেপে গিয়ে সেই সময়ের কথা বলবেন বেশি। এ অতি উত্তম প্রস্তাব ও সাতিশয় বিনয়ের লক্ষণ সন্দেহ নেই, কিন্তু আমার মনে হয় শ্রীহট্ট জেলার কৃতী-সন্তানের কাছে তাঁর দেশবাসী তার জীবন সম্বন্ধেও অনেক কিছু জানতে উৎসুক। আর কিছু না হোক, স্কুল-কলেজের ছেলেছোকরারা অন্তত জানতে চাইবে, তিনি কী করে শিক্ষাজীবনে ম্যাথমেটিক্স-ফিজিক্স অধ্যয়ন করে পরবর্তী জীবনে খ্যাতনামা ঐতিহাসিক, নৃতত্ত্ববিদ, ভৌগোলিক, তথা আর্ট ও স্থাপত্যের পণ্ডিত হলেন। বস্তুত অধুনা প্রকাশিত তাঁর চর্যাপদ সম্বন্ধে অতিশয় গবেষণামূলক প্রবন্ধ না পড়ার পূর্বে আমারও জানা ছিল না, ভাষাতত্ত্বেও তিনি কতখানি ব্যুৎপত্তি লাভ করেছেন।
