অথচ ইহুদিরা এই অলৌকিক কর্মটি প্রায় সমাধান করে এসেছে। টেলিফোন, ওয়ান উয়ে ট্র্যাফিক, মোটরের যন্ত্রপাতি যতরকম সম্ভব-অসম্ভব শব্দ তৈরি তো করা হলই এবং কত না অসংখ্য ভাষায়, প্রাচীন-অর্বাচীন, বর্ণশঙ্কর হিব্রু শব্দসহ এসব নতুন শব্দের অভিধান রচিত হল। নতুন নতুন শব্দের ফিরিস্তি, বয়ান, নিত্যি নিত্যি সাপ্তাহিক-মাসিকে বেরোয়, সাপ্লিমেন্টরূপে অভিধান যারা ক্রয় করে ফেলেছেন তাদের নামে পাঠানো হয়।
এ বিষয়ে ইজরায়েল যে কতখানি কৃতকার্য হয়েছে, এবং এখনও তারা কতখানি যোগ্যতাসহ কর্মতৎপর তার একটি উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট। আপনি ট্যুরিস্ট। রাত দুটোর সময় আপনার দরকার হয়েছে একখানা ট্যাক্সির। অনুবাদ বিভাগকে–নামটা আমি সঠিক জানিনে প্রাগুক্ত সাড়ে বত্রিশভাষার যে কোনও একটিতে ফোন করে শুধোতে পারেন, আপনারা হিব্রুতে ট্যাক্সি শব্দের কী অনুবাদ করেছেন? পাঁচ সেকেন্ডের ভিতর হয় হিব্রু শব্দটি পাবেন, নয় অন্য প্রান্ত বলবে, শব্দটি এতই আন্তর্জাতিক যে আমরা এটার অনুবাদ করিনি। আপনি স্বচ্ছন্দে ট্যাসি, টাসি টাসে যা খুশি বলতে পারেন। মোদ্দা কথা, যে কোনও লোক ইজরায়েলে আগত ইহুদিদের যে কোনও ভাষায় যে কোনও সময় যে কোনও শব্দের হিব্রু প্রতিশব্দ শুধোতে পারেন ও সদুত্তর পাবেন। অবশ্য এ হিব্রু যদিও বাইবেলের হিব্রুর ওপর প্রতিষ্ঠিত তবু এটাকে অভিনব হিব্রু বলাই উচিত। এ ভাষার প্রধান সম্পদ, বিদেশি ভাষা থেকে অকাতরে অসংখ্য শব্দ গ্রহণ করে নির্মিত হয়েছে।
এহেন অলৌকিক কাণ্ড অবশ্য সম্ভবপর হত না যদি ইজরায়েলে বিশেষ কোনও ভাষা-ভাষীর জোরদার সংখ্যাগুরুত্ব থাকত। ৩৮ বৎসর পূর্বে আমি যখন তেলআভিভ যাই তখন রাস্তাঘাটে এত জর্মন শুনতে পাই, ফোন ডিরেক্টরিতে এত বেশি জর্মন নাম দেখি যে, আমার মনে ধারণা হয়েছিল শেষটায় ইজরায়েলের প্রধান ভাষা বুঝি জর্মনই হয়ে যাবে। কিন্তু ইহুদিরা এমনই মরণকামড় দিয়ে আপন ঐতিহ্য, ধর্মমূলক কিংবদন্তি আঁকড়ে ধরতে জানে, উৎপীড়ন অত্যাচার বৃদ্ধি পাবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সে অনুরাগ এমনই দিগ্বিদিকজ্ঞানহীন ধর্মান্ধতায় পরিণত হয়, এবং যে উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে ইজরায়েলবাসী সার্থক রাষ্ট্রনির্মাণে প্রবৃত্ত হয়েছে, তার সম্মুখে প্রাচীনতম পূতপবিত্র হিব্রু ভাষার দুর্বার গতি রোধে কে?
কিন্তু হায়, তবু স্বীকার করতে হয় তাদের সমস্ত আদর্শ, লক্ষ্য, কর্মপন্থা, যে ভূমির ওপর তারা সর্বজনগ্রাহ্য রাষ্ট্রভাষার বিরাট সৌধ নির্মাণ করতে চাইছে তার সবই কৃত্রিম, সবই এক স্বপ্নলোকের রূপকথা, মূর্তিমান করার ন দেবায় ন ধর্মায় প্রয়াস।
বার বার অসংখ্যবার নিপীড়িত এই জাতিকে যেন ইয়াহূভে নিষ্ঠুরতম হিটলারের হাত থেকে রক্ষা করেন। এক আমেরিকা ছাড়া তারা এত অসংখ্য শক্র সৃষ্টি করেছে বিশেষত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে, যেখানে বিস্তর খ্রিস্টানও ইহুদিদের প্রাচ্যভূমি থেকে বিতাড়িত হতে দেখলে প্রকাশ্যে জয়ধ্বনি করবে যে, তাদের মনে সম্প্রতি প্রশ্ন জেগেছে মার্কিন সাহায্য বিপদকালে পুনর্বার কতখানি কার্যকরী হবে? ইয়েহিয়ার দিল জানু-এর প্যারা দোস্ত নিন কী না করেছেন, নিরস্ত্র রাইফেল মাত্র সম্বল বাঙালকে ঘায়েল করতে, তদুপরি চীনও তো কম যাননি। উভয়ে মিলে ভারতকে জুজুর ভয় দেখিয়েছেন এবং পারলে অবশ্যই ভারত মায় বাংলাদেশ শ্মশানে পরিণত করতেন। তাই ইহুদিরা দুশ্চিন্তায় পড়েছে, মার্কিন মদতের ওপর কতখানি ভরসা করা যায়? তাদের দুসরা ভরসা ছিল, আরব রাষ্ট্রগুলো একদম ঐক্যবদ্ধ হতে জানে না। কিন্তু কে কসম খাবে, এরা কস্মিনকালেও একজোট হবে না?
আমার মনে হয়, পূর্ব বাঙলায় বাঙলাকে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রভাষা করার যে উদ্যোগ, বিশেষ করে সরকারের ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রীদের দপ্তরগুলোতে যে সহযোগিতার আত্যন্তিক প্রয়োজন, জনসাধারণের যে সদাজাগ্রত চেতনাবোধ, বাঙলা খবরের কাগজের সহযোগিতা, দিনের পর দিন নিজেদের প্রচেষ্টায় অন্তত একটি কলম জুড়ে নতুন নতুন যেসব পারিভাষিক শব্দ সরকার তথা জনগণ দ্বারা দৈনন্দিন কর্ম সমাধানের জন্য নিত্য নিত্য নির্মিত হচ্ছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা, ভাষাবিদ, চিকিৎসক, এঞ্জিনিয়ার, আইনবিদ ইত্যাদিদের সেসব আলোচনায় যোগ দেবার জন্য আমন্ত্রণ জানানো, এসব যথেষ্ট পরিমাণে হচ্ছে না। একদা বিশেষ করে ১ বৈশাখে, কখনও-বা ২১ ফেব্রুয়ারির রাত্রে স্কুল-কলেজের ছাত্ররা তাবৎ ঢাকা শহরের উর্দু, ইংরেজিতে লেখা নেমেপ্লেট, দেয়াল থেকে উপড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে বাঙলার প্রভুত্ব বুঝিয়ে দিত। এখন তারা স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক। তারা নির্ভয়ে প্রত্যেক গৃহস্থকে অনুরোধ, প্রয়োজন হলে বাধ্য করতে পারে, বাড়ির নাম স্থির করুন, কিন্তু বাঙলাতে। (হোটেলপূর্বাণীর কর্তৃপক্ষ ৪/৫ বৎসর পূর্বেই জানতেন, হাওয়া কোনদিকে বইছে তাই মগরিবি সরাই বা গুলস্তান বোস্তান– হটেল দ্য লাহোর বা রেস্তরাঁ আইয়ুবিয়েন স্বপ্নেও মনে স্থান দেননি)। ইনডাসট্রিয়াল ব্যাংকের পক্ষ থেকে যে মহাজন একটা মোটা টাকা পূর্বাণীতে খাটান তিনি সোল্লাসে সায় দিয়েছিলেন, কারণ এর বহু পূর্বেই তিনি তাঁর আপন ভবনটির নাম করেছিলেনশেফালি এবং তার মামি শিক্ষা বিভাগের এক প্রধান কর্মচারী তার গৃহভালে তিলক অঙ্কন করেন সনাতনপ্রান্তিক নাম দ্বারা। আমি জানি, এসব এমনকিছু ইনকিলাবি দুঃসাহসী শহিদজনোচিত কঠিন কর্ম নয়, কিন্তু সে কর্ম প্রতিটি গৃহস্থকে বহুদিন ধরে সচেতন রাখবে, কয়েক মাস পরপর লেটার-হেড ছাপবার সময় আত্মজনকে ঠিকানা দেবার সময় তার একটি বিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্র গড়ে উঠবে এবং দৈনন্দিন উত্তেজনাহীন কিন্তু অতিশয় বাস্তব সেই আধ-ভোলা ভাষা আন্দোলনকে প্রগতির পথে সদাজাগ্রত করে রাখবে। ওদিকে চলুক সরকারি প্রচেষ্টা। সেটা বাঙলা একাডেমি, বাংলা উন্নয়ন বোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ–প্রয়োজন হলে নতুন বিভাগ স্থাপন ইত্যাদি যে কোনও প্রতিষ্ঠান, এ কাজের ভার নিতে পারেন, ইজরায়েলের উদাহরণ তো এইমাত্র দিলুম। প্রায় ৫০ বত্সর পূর্বে সর্ব রাজকার্য গুজরাতিতে সমাধান করার জন্য বরোদার মহারাজা যে কমিটি নির্মাণ করেন তার সদস্যসংখ্যা সীমাবদ্ধ ছিল। তবু অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে তারা কর্মসমাপণ তথা মুদ্রণান্তে যে বিরাট কোষ দফতরে দফতরে পাঠালেন সে কলেবরের পুস্তক দূর থেকে দেখেই আমি সেই বিভীষিকাকে মারণাস্ত্ৰক অস্ত্রসমূহের নির্ঘণ্টে স্থান দেবার জন্য পুলিশকে অনুরোধ জানাই। অথচ বছর তিনেকের ভিতরই ইংরেজির স্থান গুজরাতি দখল করে নিল, অক্লেশে!
