পক্ষান্তরে গরিব আরবদেশে নিত্য নিত্য নানামুখী দান কষ্টসাধ্য বা অসম্ভব ছিল; ধর্ম কখনও মানুষকে এ ধরনের কর্ম করতে বাধ্য করে না। তদুপরি আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ইসলামের গোড়াপত্তনের সময় থেকেই সে ধর্ম যে একদিন আরবভূমির বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে তার সম্ভাবনাও ছিল। সেসব দেশ আরবভূমির চেয়ে বেশি ধনী বেশি গরিবও হতে পারে। অতএব যতদূর সম্ভব অল্প সংখ্যকঈদ বা আনন্দের দিন বিধিবদ্ধ করে দেওয়া হয়। দান কিন্তু ইসলামের বিধিবদ্ধ আইন, তার অতি শৈশব অবস্থা থেকেই। ঈদ-উল-ফিতরে দান অলঙ্ ধর্মাঙ্গ। বস্তুত ইসলামই ইনকাম ট্যাক্স- জাকাত– ধর্মের অঙ্গরূপে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম বাধ্যতামূলক করে।
সমাজতত্ত্বের দৃষ্টিবিন্দু থেকে দেখি, আনন্দোৎসব (ঈদ) বা বাধ্যতামূলক ধর্মাচার (নামাজ রোজা ইত্যাদি) একসঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
পাঁচ ওকৎ নামাজ বাড়িতে পড়তে পার কিংবা মসজিদে। জুম্মার নামাজ কিন্তু অবশ্যই মসজিদে পড়তে হবে। কারণ ধর্মসাধনা ভিন্ন এর অন্য উদ্দেশ্য ছিল; প্রত্যেক মুসলিম যেন সপ্তাহে অন্তত একদিন মসজিদে প্রতিবেশী সহধর্মীর সঙ্গে মিলিত হয়ে একাত্ম-বোধ-জাত শক্তি অনুভব করতে পারে।
এর পরই আসে বৎসরে দু বার করে ঈদের নামাজ। ইমানদার মুসলিম মাত্রই চেষ্টা করে, বৃহত্তম মুসলিম জনসংঘের সঙ্গে বৃহত্তম জমাত-এ সে যেন নামাজ পড়তে পারে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য যত দূর-দূরান্ত থেকে যত সব নামাজার্থী ঈদগাহতে জমায়েত হয় তাদের সংখ্যা, তাদের ধর্মানুরাগ দেখে তাদের প্রত্যেকেই যেন আত্মবল, সংহতি-শক্তি অনুভব করতে পারে। ওইদিন পরিচিত জনের মাধ্যমে বিস্তর অপরিচিতের সঙ্গে তার পরিচয় হয় ভ্ৰাতৃভাবে আলিঙ্গন দ্বারা। এই দূর-দূরান্ত থেকে, বৃহত্তম জমাত যে ঈদগাহে হবে, সেখানে নামাজ পড়ার পুণ্য ইচ্ছা নিয়ে ধাবমান যাত্রীদলকে আমি একাধিকবার বহুদূর অবধি তাকিয়ে দেখে দেশের জনসাধারণের প্রতি প্রীতি ও শ্রদ্ধা অনুভব করেছি, বিস্ময় বোধ করেছি।
বাড়িটি ছিল একেবারে বিরাট পদ্মার পাড়ে, রাজশাহীতে। ওপারে, বহুদূরে দেখা যেত শ্যামল একটি রেখা- ভারত সীমান্ত। বারান্দায় দাঁড়িয়েছি অতি ভোরে। অন্ধকার মিলিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে দেখি, কত না দূর-দূরান্ত থেকে, হেথা-হোথা ছড়ানো চরভূমি থেকে, শুনলুম পদ্মার ও-পার ভারত থেকে, কত না নামাজার্থী শীতের শুকনো বালুচরের উপর দিয়ে হেঁটে আসছে রাজশাহী শহরের দিকে। শহরের প্রায় পূর্বতম প্রান্তের বাড়িটি থেকে দেখি, যেখানে সূর্য অস্ত যায় সেই দূরে অতি পশ্চিম প্রান্ত অবধি যেন পিপীলিকার সারির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মানবসন্তান শহরের দিকে এগিয়ে আসছে–নিরবচ্ছিন্ন ধারায়। পূর্বপ্রান্তে, যারা প্রাচীন দিনের জাহাজের খেয়াঘাট, পাশের ফুটকি পাড়ার দিকে এগিয়ে আসছে তাদের নতুন পাজামা-কুর্তা, বাচ্চাদের রঙিন বেশভূষা, হাসিমুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সবাই অক্লান্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে সদর রাজশাহীর ঈদগাহের দিকে।
এদের কেউই হয়তো জানে না, ঈদের নামাজের সামাজিক মেলামেশার তাৎপর্য। গ্রামের জুম্মাঘর বা শহরের জামি মসজিদ ত্যাগ করে করে বৃহত্তম ঈদগাহে এসে বহুগুণে বিস্তৃত অঞ্চলের ঐক্যবদ্ধাবস্থায় বেশুমার নামাজরত মুসলিমের সঙ্গে শব্দার্থে তথা ভাবার্থে কাঁধ মিলিয়ে তখন পদ্মাচরের সরল মুসলিম ঈদের নামাজ পাঠ শেষ করে তখন সে কি সচেতন যে, বর্ষার উত্তাল তরঙ্গসঙ্কুল পদ্মা তার চরকে তার বউবাচ্চাকে বাদ-বাকি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেও ঈদগার মুসল্লিদের কাছ থেকে কখনও বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। দীন ইসলামের চিরন্তন চিন্ময় বন্ধনে প্রলয়ঙ্করী পদ্মার তাণ্ডব নর্তন কস্মিনকালেও ছিন্ন করতে পারবে না– অনুভব করে তার অবচেতন মন।
কার্যত আমরা রোজার ঈদেই আনন্দোল্লাস করি বেশি। কিন্তু সর্ব দৃষ্টিবিন্দু থেকেই ঈদ-উল-আজহা বহুগুণে গুরুত্বব্যঞ্জক।
(১) আপন আবাসে পড়া পাঁচ ওক্ত নামাজের ক্ষুদ্রতম গণ্ডি, (২) সেটা ছাড়িয়ে জুম্মার নামাজের বৃহত্তর পরিবেশ, (৩) সে পরিবেশ ছাড়িয়ে ঈদগার বৃহত্তম পরিবেশ সাধারণ মুসলিমের জন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু আল্লা যাকে তওফিক দিয়েছে, (৪) সে যেন জীবনে অন্তত একবার মক্কা শরিফে গিয়ে বিশ্ব মুসলিমের সঙ্গে একত্র হয়। বিশ্ব মুসলিমের সত্তা-সংহতি-ব্যাপ্তি সে যেন দেখে, হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, তার ক্ষুদ্র সত্তা যেন বৃহত্তম মুসলিম সত্তার সঙ্গে সম্মিলিত হয়।
সে কাহিনী দীর্ঘ, সর্ব বিশ্বে তার গুরুত্ব ছেয়ে আছে। তার জন্য আগামীতে অন্য ঈদ।
.
ভাষা- বাঙলা
বাঙলা ভাষা মারফত সরকারি বেসরকারি সব কাজ নিষ্পন্ন করাটা আপাতদৃষ্টিতে যতই কঠিন মনে হোক না কেন, আমি অন্তত একটা দেশের কথা জানি, যেখানে এ সমস্যাটা সহস্রগুণে কঠিনতম ছিল এবং সে দেশ সেটা প্রায় সমাধান করে ফেলেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে প্যালেস্টাইনে এসে জুটতে লাগল শব্দার্থে কুল্লে দুনিয়া থেকে ইহুদির পাল। কত যে ভিন্ন ভিন্ন। মাতৃভাষা নিয়ে তারা এসেছিল সে খতিয়ান নেবার চেষ্টা করা বৃথা। আমাদের পশ্চিম ভারত থেকে পর্যন্ত একদল খাঁটি ভারতীয় ইহুদি মারাঠি জাত তাদের কোঁকনি উপভাষা নিয়ে ইজরায়েলে উপস্থিত হয়। আপন রাষ্ট্র গড়ে তোলার আগের থেকেই ইজরায়েলের প্রধান শিরঃপীড়া ছিল– তাদের রাষ্ট্রভাষা হবে কী? শেষটায় স্থির করা হল হিব্রু যে ভাষাতে– আমি খুব মোটামুটি আন্দাজ থেকে বলছি– অন্তত হাজার বছর ধরে কেউ কথা বলেনি, সাহিত্য সৃষ্টি করেনি– শুধু পড়েছে মাত্র, তা-ও শুধুমাত্র ইহুদি যাজক পণ্ডিত রাব্বি সম্প্রদায়। যেসব ইহুদি অতি প্রাচীনকাল থেকে প্যালেস্টাইন ত্যাগ করে অন্য কোথাও যায়নি, নির্বাসিত হলেও কয়েক বৎসরের মধ্যে ফিরে এসেছে তাদের সক্কলেরই মাতৃভাষা আরবি– প্রায় বারোশো বৎসর আরবদের সঙ্গে বসবাস করার ফলে। সেটাকে রাষ্ট্রভাষা করার তো প্রশ্নই ওঠে না। যেসব রাব্বি হিব্রুতে ওল্ড টেস্টামেন্ট ও প্রধানত হিব্রুর সমগোত্রীয় আরমেয়িক ভাষায় রচিত তালমূদ, মিদ্রাশ ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ পড়তে পারেন তাদের সংখ্যা শতকরা এক হয় কি না হয়। তদুপরি হিব্রুভাষা প্রধানত শাস্ত্রগ্রন্থের ভাষা। আড়াই হাজার বছর ধরে ইউরোপীয় সভ্যতা সংস্কৃতি যেসব শব্দ গড়ে তুলেছে তার একটিও এ ভাষাতে নেইদূরআলাপনী বাঅনপনেয় কালির তো কথাই ওঠে না। সবচেয়ে বড় বিপদ, বহিরাগত ইহুদিদের মাতৃভাষা– রাশান-পোলিশ, ইডিশ থেকে আরম্ভ করে ফরাসি, জর্মন, ইতালীয়, ফিনিশ– বলতে গেলে ইউরোপের তাবৎ ভাষা, আরবি, তুর্কি, ফারসি, কুর্দি এস্তেক কোঁকনি–সে ফিরিস্তি তো আমি আগেই এড়িয়েছি। এখন সমস্যা হল, মাস্টার যে হিব্রু শেখাবে, সেটা কোন ভাষার মাধ্যমে? তাবৎ ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন মাতৃভাষার লোক এক বিশেষ জেলায় জড়ো করে তাদের বৈদিক ভাষা শেখানো ঢের ঢের সহজ।
