পাত্রের মতো কালও ধর্মাচরণের সময় হিসাবে নিতে হয়। পূর্বাকাশ ঈষৎ আলোকিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে সলাৎজির ধ্যানধারণার পক্ষে সর্বোত্তম সময় ইহলোকে সব ধর্মই একথা স্বীকার করেছেন।
এস্থলে বলা প্রয়োজন মনে করি যে, একশো বছর আগেও সাধারণ ধার্মিকজন আপন ধর্মবিশ্বাস (ইমান) ও ধর্ম-আচরণ ক্রিয়াকর্ম (আমল) নিয়ে সন্তুষ্ট থাকত, প্রতিবেশীর ধর্ম সম্বন্ধে তার কোনও কৌতূহল ছিল না। থাকলেও সে কৌতূহল নিবৃত্তি করা আদৌ সহজ ছিল না। কারণ অধিকাংশ স্বধর্মে বিশ্বাসীজনই পরধর্মাবলম্বীর সংস্রব এড়িয়ে চলত, তথা তাকে আপন ধর্মকাহিনী শোনাতে কোনও উৎসাহ বোধ করত না। উপরন্তু হিন্দু, জৈন এবং পারসিরা বহু শত বৎসর পরধর্মাবলম্বীকে আপন ধর্মে দীক্ষিত করার দ্বার রুদ্ধ করে দিয়েছেন। এবং আশ্চর্য বোধ হয়, আমাদের আলিম-ফাজিলগণ প্রতিবেশী হিন্দুকে শুদ্ধমাত্র কাফিরা, হানুদ, মলাউন ইত্যাদি কটুবাক্য দ্বারা বিভূষিত করেই পরম তৃপ্তি অনুভব করেন; অথচ তারা সকলেই আমার মতো না-দানের চেয়ে ঢের ঢের বেশি দানিশমন্দ– তাঁরা বিলক্ষণ অবগত আছেন, তাঁদের পক্ষে আপন ধর্ম প্রচার করা অবশ্য কর্তব্য। এবং তাঁরা কেন, অতিশয় আহাম্মুখও জানে, বিধর্মীর ধর্ম তুলে কটুবাক্য বললে, তাকে ইসলামের প্রতি তো আকৃষ্ট করা যায়ই না, উপরন্তু আরেকটি প্রতিবেশীকে রুষ্ট করা হয় মাত্র।…
কাল ও পাত্রের কথা হল। দেশের ওপর ধর্মাচরণ নির্ভর করে আরও বেশি। যে-দেশে ছ মাস ধরে সূর্যাস্ত হয় না, সেখানকার মুসলিমের এবং বাংলাদেশের রোজা রাখার কায়দা-কানুন যে হুবহু একই রকমের হতে পারে না সেটা সহজেই অনুমান করা যায়।
ঈদের পরব, এবং অন্যান্য তাবৎ পরবই এই দেশ অর্থাৎ স্থানের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে। এবং এই সুবাদে আবার পাঠকের স্মরণে এনে দিই, বহুবিধ কারণে আমরা প্রতিবেশীর ধর্ম সম্বন্ধে এখন আর সম্পূর্ণ উদাসীন থাকতে পারিনে। মহরমের আর জগদ্ধাত্রী পুজোর মিছিল যদি একই দিনে পড়ে তবে তার হিসাব যে নগরপাল আগের থেকেই নেয় না, তাকে আমরা বিচক্ষণ আইজি বলে মনে করব না। তদুপরি খ্রিস্টান মিশনারিরা দু-শো বছর ধরে পাক নবীর বিরুদ্ধে এত কুৎসা রটিয়েছে যে তেনাদের ধর্ম বিংশ শতাব্দীর প্রচলিত খ্রিস্টধর্ম, যে ধর্ম একদিকে শেখায়কেউ ডান গালে চড় মারলে বা গাল এগিয়ে দেবে, অন্যদিকে বিশ-পঁচিশ বৎসর পরপর আপসে কেরেস্তানে কেরেস্তানে লাগায় প্রলয়ঙ্কর যুদ্ধ, টাকার লোভ দেখিয়ে দুই দলই টেনে আনে বিধর্মীদের, সরল নিগ্রোদের, এবং সর্বশেষে শুশানযজ্ঞ চালায় হিরোশিমার নিরীহ নারীশিশুদের ওপর। এবং সঙ্গে সঙ্গে নতমস্তকে স্বীকার না করে উপায় নেই, ইয়েহিয়া এদেশে যে তাণ্ডবনৃত্য জুড়েছিলেন সেটাও ধর্মের নামে ইসলামের দোহাই দিয়ে সেটাও জিহাদ! কিন্তু এই আনন্দের, ঈদের মৌসুমে হানাহানির কাহিনী সর্বৈব বর্জনীয়। আমি শুধু তুলনার জন্য কথাটা পেড়েছি, মুসলমানদের আনন্দোৎসব তার সত্য পরিপ্রেক্ষিতে দেখবার জন্য।
ঈদ অর্থাৎ আনন্দ, আনন্দ-দিবস, পরবের দিন। ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উদ-দোহাতে কিন্তু ঈদ সীমাবদ্ধ নয়।
ইমানদার ধর্মনিষ্ঠ মুসলিম ঈদ-উল-ফিতরের আনন্দোৎসব করার বিশেষ একটা কারণ আছে। এক মাস ধরে সুখে-দুঃখে, মানসিক অশান্তির ভিতর দিয়েও উপবাস করাটা সহজ কাজ নয়– কঠিন শারীরিক পীড়া ইত্যাদির ব্যত্যয় অবশ্য আছে। তাই যে মুসল্লি পূর্ণ ঊনত্রিশ বা ত্রিশ দিন শরিয়তের আদেশমতো উপবাস করতে সক্ষম হয়েছে, তার আনন্দই সর্বাধিক হয়। তার অর্থ এই নয়, যে-ব্যক্তি পূর্ণ মাস রোজা রাখতে পারেনি, সে ঈদ আনন্দোৎসবে যোগ দেবে না। অবশ্যই দেবে। যে লোক বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামে যোগ দিতে পারেনি যে কোনও কারণেই হোক তাকে স্বাধীনতা-দিবসের ঈদ-আনন্দোৎসব থেকে বঞ্চিত করার হক স্বাধীনতা-সংগ্রামে যারা লিপ্ত হয়েছিলেন তাঁদের পুরুষোত্তমেরও নেই। অতিশয় অভাজন জনও যদি আনন্দোৎসবে যোগ দিতে আসে তাকে বিমুখ করা, তার সঙ্গে তর্কাতর্কি করা ঈদের অঙ্গহানি করে। কারণ আনন্দের দিনে যে কোনওপ্রকারের অপ্রিয় কর্ম করা নিরানন্দের লক্ষণ, অতএব সর্বথা বর্জনীয়।
ঈদ বা আনন্দ সম্বন্ধে সুন্নি ও শিয়া এবং শিয়াদের নানা শাখা-প্রশাখা সকলেই প্রাগুক্ত ধারণা পোষণ করেন। বাংলাদেশে একদা প্রচুর খোঁজা ও বোরা ছিলেন। এদের দু দলই ইসমাইলি শিয়া, পক্ষান্তরে মুর্শিদাবাদ ও সিলেটের পৃথীম-পাশার শিয়ারা ইসনাআশারি শিয়া নামে পরিচিত। ঈদ সম্বন্ধে সকলেরই ধারণা মোটামুটি এক হলেও ঈদ পরব পালনের কর্ম-পদ্ধতি শিয়াদের ভিতর অতি বিভিন্ন।
সুন্নি হানিফিরা বিশুদ্ধ শরিয়তের দৃষ্টিবিন্দু থেকে ঈদ সম্বন্ধে সর্বোৎকৃষ্ট পথনির্দেশ পাবেন ইমাম আবু হানিফা ও তার শিষ্যগণ, ইমাম আবু ইউসুফ ইত্যাদির সাহচর্যে সংকলিত প্রামাণিক ফিকাহ গ্রন্থে। ঈদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক গভীর আলোচনা পাবেন প্রখ্যাত দার্শনিক, ফকিহ ও সুফিহ ইমাম গাজ্জালির অজরামর কিমিয়া সাদৎ গ্রন্থে। মরহুম ইউসুফ খানের অনুবাদ অনিন্দ্যসুন্দর। কলকাতায় পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।
তুলনাত্মক আলোচনা করলে দেখা যায়, ঈদ বা আনন্দ মাত্রেরই অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দেশ বা ভৌগোলিক অবস্থান তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে। ইসলামের উদয়কালে খাস আরবদেশ সমৃদ্ধিশালী ছিল না। পক্ষান্তরে ভারত বহু বহু শতাব্দী ধরে ছিল ধন-ধান্যের বিত্তবান দেশ। জনসাধারণের অবকাশও ছিল যথেষ্ট। তাই এই বঙ্গভূমিতে, বর্তমান দারিদ্রের দুরবস্থাতেও কি হিন্দু কি মুসলমান সকলেই বারো মাসে তের পার্বণের কথা জানে। ওইসব পার্বণে একদা দানই ছিল প্রধান অঙ্গ–অন্নবস্ত্র, ছত্র, পাদুকা, প্রকৃতপক্ষে কুটির শিল্পে হেন বস্তু ছিল না যেটা বিত্তবান কিনে নিয়ে দান করত না। কিন্তু দান বাধ্যতামূলক ছিল না।
