বিক্রমপুরের কুইজিন ছিল মৎস্যকেন্দ্রিক। ঢাকার মোগলাই রান্না স্পস্টতই মাংসকেন্দ্রিক। কিন্তু তাই বলে বিক্রমপুরকে ঠেকানো যায়নি। বস্তুত, এই ঢাকাতেই আপনি পাবেন মৎস্য-মাংস কুইজিনের বিরলতম সমন্বয় গঙ্গা-যমুনার সম্মেলন। এ তীর্থে যে বঙ্গজন আসে না তার পিতা নির্বংশ হোক (এটা বিদ্যেসাগর থেকে চুরি)। যে এ তীর্থের প্রসাদ বেক্তেয়ার হয়ে উদরে ধারণ এবং পঞ্চত্বপ্রাপ্ত হয় সে আখেরে যাবে বেহেশতে, যেখানে বিস্তর সুদূর নিস্তরঙ্গ নহর-তরঙ্গিণী মৌজুদ এবং বলা বাহুল্য সেগুলোতে ইলিশ আবজাব করছে, কোনওপ্রকারে সিজন, অফ সিজনের তোয়াক্কা না করে। সৃষ্টিকর্তা ভক্তের মনোবাঞ্ছ কদাচ অপূর্ণ রাখেন না। আর সে যদি হিন্দু হয় তবে অতি অবশ্যই সে তদ্দশ্যেই যাবে শিবলোকে, অর্থাৎ তার বাসস্থান হবে শিবশঙ্কুর জটালোকে যেখান থেকে বেরিয়েছেন,
দেবী সুরেশ্বরী / ভগবতী গঙ্গে
ত্রিভুবন-তারিণী, / তরল তরঙ্গে।
আর একথা কি আমার মতো যবনকে তৈলবট গ্রহণ করে বিধান দিতে হবে যে সে গঙ্গায় বিরাজ করেন ইলিশ শুধু ইলিশ, দূরদিগন্তব্যাপী ইলিশ।
***
কিন্তু হায়, পদ্মার ইলিশ পরিপাটিরূপে রাঁধবার জন্য সুনিপুণা বিক্রমপুরাগতা লক্ষণা সমাজ– বিশেষ করে বৈদ্য বর্ণোদ্ভবা। এ বর্ণের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব পাঠক ক্ষণতরে বিস্মৃতির বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দিন। এদের একেকটি যেন সাক্ষাৎ ভানুমতী। এঁদের হাতে কই-ইলিশ থেকে আরম্ভ করে এস্তেক কেঁচকি চুনোপুঁটি পর্যন্ত না জানি কোন ইন্দ্রজালের মহিমায় এমনই এক অপরূপ সত্তায় পরিণত হন যে তখন তাঁরই রসে সিক্ত রসনা গেয়ে ওঠে :
ইহাকে জানেন যারা
জগতে অমর তারা
য এতদৃবিদুরমৃতাস্তে ভবন্তি ॥
***
কোথায় আজ সে নবাববাড়ি যাকে কেন্দ্র করে একদা পূর্বাচলের মোগলাই কুইজিন গড়ে উঠেছিল? কলকাতার গোড়াপত্তন থেকেই সে ভুইফোড় আপস্টার্ট। কাজেই সেখানে অল্পকালের মধ্যেই দেখা দিল হোটেল, রেস্তরাঁ, চায়ের দোকান, মায় পাইস হোটেল এবং এদানির কফি হৌসগুলো। যদ্যপি একশো বছর পূর্বেও কলকাতায় প্রবাদ ছিল, বাঙাল দেশের জাত মারলে তিন সেন। উইলসেন, কেশব সেন আর ইস্টিশন। ইউলসনের হোটেল, কেশব সেনের ব্রাহ্মধর্ম আর স্টেশনে তো জাত মানার উপায়ই নেই। ঢাকাতে সেরকম হুশ হুশ করে রেস্তরা গজাল না। বিরিয়ানি, পোলাও, চতুর্ককার– কোরমা, কালিয়া, কাবাব, কোফতা– দোপেঁয়াজা, এবং ঢাকার অত্যুৎকৃষ্ট রেজালা, বুরহানি, সাদামাটা নেহারি (এটা বরঞ্চ সহজলভ্য), ঢাকাই পরোটা (ভিতরে অষ্টগ্রামের পনিরের পূর দেওয়া পরোটা), নানাবিধ সমোসা গয়রহ গয়রহ তাই রেস্তরার মাধ্যমে ভালো করে প্রচার প্রসার লাভ করার পূর্বেই ঢাকার স্কন্ধে ভর করল ঢাউস ঢাউস বিলিতি মার্কা হোটেল– তাদের অপেয় সুপ, অখাদ্য ইস্ট, অকাট্য রোস্ট ইত্যাদি ট্যাশ যত সব গব্বযন্তনা। আর দিশি পোলাওয়ের নামে এক প্রকারের অগা খিচুড়ি (জগা নয়), কোরমার নামে আইরিশ ইন্টুর সঙ্গে ইন্ডিয়ান মশলার সমন্বয় সরি, খুনোখুনি। যা কিছু গলা দিয়ে নামে সঙ্গে নিয়ে যায় রিটার্ন টিকিট। তিন দিনের নয়, তিন মিনিটের রিটার্ন। কপাল ভালো থাকলে এবং পেটে সুইডিশ স্টিলের লাইনিং থাকলে ঘণ্টা তিনেকের ম্যাদ।
তবে হ্যাঁ, এখনও আছে বাকির (বাখর) খানি রুটি, এবং সুখা রুটি। কথিত আছে জনৈক পশ্চিমা খানদানি মনিষ্যি এন্তের জাগির পেয়েছিলেন বরিশালে। ঢাকা থেকে বেরুবার সময় সঙ্গে নিয়ে যেতেন এক ভঁই সুখা রুটি (খাস উর্দুতে অবশ্য সুখি রুটি)। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি আবিষ্কার করেন এই অপূর্ব চিজ। কোথায় লাগে এর কাছে উৎকৃষ্টতম ক্রিম ক্রেকার? ঝাড়া একটি মাস থাকে মুরমুর ক্রিপ। জনশ্রুতি, এই বাকির খানের নামেই হয় বরিশালের অন্য নাম বাকরগঞ্জ।
নেই নেই করে অনেক কিছুই আছে।
কিন্তু কিন্তু ঠিক এই সময়টায় তীর্থযাত্রাটা স্থগিত রাখুন। ভাদ্ৰাশ্বিনে পূর্বাচলযাত্রা নাস্তি। একাধিক মৌলিক দ্রব্যের অনটন। তবে কি না শিগগিরই ট্যুরিস্ট ব্যুরো খুলবে। আসা-যাওয়ার সুখ-সুবিধে হবে। আসছে শীত নাগাদ পাসপোর্ট-ভিজার কড়াকড়িও কমবে।
বন্ধুবান্ধবদের যে সদুপদেশ দিয়েছি, সুশীল পাঠক, তোমাকে তো তার উল্টোটা বলতে পারি!
.
ঈদ-আনন্দোৎসব
ধর্মের একটা দিক চিরন্তন এবং যার পরিবর্তন হয় না। এই যে আমি পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়ে বিশ্বভুবনের সঙ্গে সংযুক্ত হচ্ছি তার বাইরে যে সত্তার কল্পনা আমি অনুভব করতে চাই, তিনি আদিঅন্তহীন, অপরিবর্তনীয়। যে মানুষ সাধনার ক্ষেত্রে যতখানি অগ্রসর হয় সে সেই অনুপাতে তাঁর নিকটবর্তী হয়, তার অনুভূতি নিবিড়তর হয়। আমাদের হজরত বলতেন তিনি সেই চরম সত্তাকে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেন তাঁর স্কন্ধের শিরার (স্পন্দনের) মতো। বলা বাহুল্য আমরা মনন দ্বারা যে পরমসত্তাকে অনুভব করি তিনি চিন্ময়। শিরার স্পদন-জনিত অনুভূতি সম্পূর্ণ মৃন্ময়। চিন্তার মারফত আমরা কল্পলোকে যে অনুভূতি পাই, স্পর্শলব্ধ দৃঢ় মৃত্তিকাজাত শিরার অনুভূতি তার তুলনায় অনেক বেশি নিবিড়, অনেক বেশি দৃঢ়। তাই হজরত সেই পরম সত্তাকে শারীরিক অভিজ্ঞতার ভ্রান্তিহীন সত্যের মতো প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতেন। পক্ষান্তরে ধর্মানুভূতির জগৎ থেকে বেরিয়ে ধর্মাচরণের কর্মভূমিতে আমরা যখন নামি, তখন সে আচরণের অনেকখানি দেশকালপাত্রের ওপর নির্ভর করে। অবশ্য অন্বেষণ বিশ্লেষণ করলে অবশেষে দেখা যাবে আমাদের প্রত্যেকটি ধর্ম-আচরণও সেই অপরিবর্তনীয় চিরন্তন সত্তাশ্রিত। কর্মজগতে তাই প্রথমতো পাত্রের ওপর নির্ভ করে ধর্মাচরণ– আমল। আমি পক্ষাঘাতে চলৎশক্তিহীন, অথর্ব। মক্কা শরিফ দর্শনের তরে আমার চিত্ত যতই ব্যাকুল হোক না কেন, আমার যত অর্থ সম্পদই থাকুক না কেন, কোনও ধর্মজ্ঞজন কোনও ফকিহ আমার হজযাত্রার অপারগতাকে নিন্দনীয় বলে মনে করবেন না। আমি এ অবস্থায় যে কোনও হাজিকে, আমার হয়ে, পুনরায় হজ করার জন্য মক্কা শরিফে পাঠাতে পারি; অবশ্য তার সমস্ত খর্চা-পত্র আমাকেই দিতে হবে। এর থেকে কিন্তু এহেন মীমাংসা করা সম্পূর্ণ ভুল হবে যে, আমার ওপর যেসব ধর্মাচরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে তার সবকটাই আমি অন্যলোককে দিয়ে করাতে পারি।
