বছর তিনেক পূর্বে শ্ৰীযুত অমরনাথ ঝা-র একটি ভাষণ আমি শুনি। পূর্ণ অর্ধ ঘন্টা ভদ্রলোক অতি বিশুদ্ধ হিন্দিতে বক্তৃতা দিয়ে শেষ করলেন এই কথা বলে অব জো হমারি রাষ্ট্রভাষা হোগি বহু সংস্কৃতময়ি হিন্দি হোগি অর্থাৎ আমাদের রাষ্ট্রভাষা সংস্কৃতময়ী হবে।
শ্রী ঝা তার অর্ধ ঘণ্টাব্যাপী ভাষণে একটিমাত্র আরবি কিংবা ফারসি শব্দ ব্যবহার করলেন না।
আজ তাই হিন্দি ভাষা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে সে অনায়াসে সীতার বনবাস অনুবাদ করতে পারে, কিন্তু রামের সুমতি কিংবাগডড্ডলিকা করতে পারে না।
এ বড় মারাত্মক অবস্থা সেই কথাটি আমি পাঠককে বলতে চাই। কারণ একথা ভুললে চলবে না, গণ-আন্দোলনের ফলেই আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রনির্মাণের জন্য জনগণের সহযোগিতার প্রয়োজন। চাষাভুষোর সুখ-দুঃখ আশা-নিরাশা নিয়ে আমাদের বই লিখতে হবে, বক্তৃতা দিতে হবে, নাটক সিনেমা বানাতে হবে। এসব জিনিস বিদ্যেসাগরি বাঙলা দিয়ে যেরকম প্রকাশ করা সম্পূর্ণ অসম্ভব ঠিক তেমনি আজকের দিনে হিন্দি দিয়েও প্রকাশ করা যায় না। একেবারে যায় না বলা অনুচিত, কিন্তু সে ভাষা যে সাহিত্যের পর্যায়ে ওঠে না তা-ই নয়, সে ভাষা অবোধ্য।
সুশীল পাঠক হয়তো অতিষ্ঠ হয়ে বলবেন, হিন্দি কী করে না করে, তা নিয়ে তোমার অত শিরঃপীড়া কেন? কথাটা খুবই ঠিক, কারণ হিন্দি আমার মাতৃভাষা নয়, হিন্দি নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেললে আমার কিংবা আপনার ব্যক্তিগত কোনও লাভক্ষতি নেই– অবশ্য যতক্ষণ হিন্দি আপন জমিদারিতেই দাবড়ে বেড়ায়, আমাদের পাকা ধানে মই না দিতে আসে।
সেইখানেই তো বিপদ। মেনে নেওয়া হয়েছে হিন্দি আমাদের রাষ্ট্রভাষা হবে ও ক্রমে ক্রমে বাঙালি, আসামি, মাদ্রাজি সবাইকে যে শুধু হিন্দি পড়তে হবে তাই নয়, সে ভাষায় লিখতে হবে, বলতেও হবে। অর্থাৎ রাষ্ট্র-নির্মাণের কর্ম অনেকখানি হিন্দির মাধ্যমে করতে হবে। আজকের দিনে ঘঁত্বাইগ্রস্ত হিন্দি দিয়ে কি সে-কর্ম সুচারুরূপে সমাধান হবে?
রসিকতা বাদ দিন। পরশুরামের ছি ছি বলিয়া তৃপ্তি হয় না, তওবা, তওবা, বলিতে ইচ্ছা করের অনুবাদ তো হয়ই না, ইংরেজকে যে খেদাতে হবেআৰু দিয়ে, ইজ্জত দিয়ে, ইমান দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে সেই জোরালো বাঙলা পর্যন্ত অনুবাদ করা যাবে না। কারণ আব্রু, ইজ্জত, ইমান শব্দ ফারসি-আরবি–হিন্দি এ শব্দগুলো বরদাস্ত (থুড়ি! সহ্য করবেন না।আব্রুর সংস্কৃত কী জানিনে, ইজ্জৎ না হয় কেঁদে-কুকিয়েমান দিয়ে চালালুম, কিন্তু ইমান শব্দের সংস্কৃত নেই সেকথা নিশ্চয় জানি।বেইমানির জায়গায় বিশ্বাসঘাতকতা চালাতে গেলেভাষার হাটে বেইমানি করা হয়।
যে ভাষা রাষ্ট্রভাষা হতে চায় তার শব্দভাণ্ডার হবে বিরাট। কারণ বহু প্রদেশের নানারকম চিন্তাধারা তাকে প্রকাশ করতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনমতো নানা প্রদেশ থেকে নানারকম নতুন শব্দও তাকে গ্রহণ করতে হবে– ইংরেজি যেমন নানা দেশ থেকে নানারকমের শব্দ নিয়ে আপন ভাষা বিত্তবতী করেছে।
যে ভাষা আপন শব্দভাণ্ডার থেকে অকাতরে খেদিয়ে দিয়ে বিস্তর শব্দ শুদ্ধমাত্রপবিত্র হওয়ার জন্য, সে ভাষা ভিন্ন ভিন্ন প্রদেশ থেকে নানাপ্রকারের শব্দ নিতে রাজি হবে সে আশা দুরাশা।
আমার একমাত্র সান্ত্বনা যে, হিন্দি সাহিত্যিকদের ভিতর এমন লোকও আছেন যারা শ্রীঝার মত সমর্থন করেন না।
.
ধৈর্যং কুরু! পুনঃ গচ্ছং ঢাকায়ে
গত পঁচিশ বৎসর ধরে কি ঘটি কি বাঙাল কলকাতায়, মাছের বাজার থেকে বাড়ি ফেরার সময় দিবাস্বপ্ন দেখেছে, আহা ঢাকার লোক কী সুখেই না আছে। বিশেষ করে বাঙাল ছেলেমেয়েরা বাচ্চা বয়েস থেকে মা-মাসির কাছ থেকে ঢাকা, বিক্রমপুর, গোয়ালন্দ ইস্টিমারের বিশ্বভুবনে অতুলনীয় রাইসকারির কথা শুনেছে। ঢাকার কই? সে তো ঘটিদের ইলিশের সাইজ। আর কোথাকার ইলিশ? সে তো তিমি মাছের সাইজ। গোটা পৃথিবীটা নাকি কোন এক প্রাণীর মাথায় বিরাজ করছে কিন্তু খাস ঢাকাইয়া মাত্রই জানে ঢাকার জন্য ভিন্ন। ব্যবস্থা। সৃষ্টির আদিম প্রভাতে ব্রহ্মাণ্ড অলিম্পিকে যে তিনটে ইলিশ হেভিওয়েট প্রাইজ পায় সেই তিনটির উপর ঢাকা শহর নির্মিত। এ তত্ত্ব আপনার অজানা থাকলে চেপে যাবেন– নইলে ইলশায় হাসব।
তদুপরি ঢাকার নবাববাড়ির আওতায়, দীর্ঘ তিনশো বৎসর ধরে নির্মিত মোগলাই খানা! মোগলাই রান্নার উৎপত্তিস্থল দিল্লি-আগ্রা। একটা শাখা গেছে লক্ষৌয়ে, অন্য শাখা যমুনা বেয়ে বেয়ে এলাহাবাদ, কাশি থেকে একটু মোড় নিয়ে মোগলসরাই, ফের গঙ্গা বেয়ে পাটনা তার পর মুর্শিদাবাদ। ওদিকে পদ্ম বেয়ে বেয়ে ছোট নদী ধরে ঢাকা। রান্নার শেষ তীর্থ সিলেট কারণ ওটা পাঠান-মোগল উভয়েরই শেষ সীমান্ত-নগরী।
বিক্রমপুর উল্লেখ করলুম কেন তবে? সে তো গ্রাম– আজ না হয় মেনে নিলুম ওটা মহকুমা সাইজ ধরে। এবং এ তো অতিশয় সুপরিচিত সত্য যে, কোনও একটি বিশেষ রন্ধনপদ্ধতি (ফরাসিতে কুইজিন এবং এই শব্দটিই এখন আন্তর্জাতিক) গ্রামাঞ্চলে পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না।
পাঠান-মোগলের পূর্বে বিক্রমপুর ছিল হিন্দুরাজাদের রাজধানী। এই তো কিংবদন্তি। জঙ্গিলাটরা যেরকম যুদ্ধের পর যুদ্ধের কালানুক্রমিক নির্ঘণ্ট থেকে সে দেশের ইতিহাস নির্মাণ করেন, এ রসনা-পূজারি রন্ধনপদ্ধতির (কুইজিনের) উৎপত্তি, ক্রমবিকাশ ধরে ধরে সে দেশের ইতিহাস নির্মাণ করে। জনশ্রুতি যদি সেখানে আমার কুইজিন-ইতিহাসকে সায় দেয়। তবে সেই জনশ্রুতিই সত্য ইতিহাস বাঁড়ুয্যে-সরকার সেস্থলে অপাঙক্তেয়।
