এই বিত্ত এই সম্পদের বিরুদ্ধে ভারতেও একদল ওয়হহাবি (আরবের কট্টর) কশানি সম্প্রদায় দেখা দিয়েছেন। এঁরা সকলে মিলে যে বিশেষ কোনও রাজনৈতিক সম্প্রদায় করেছেন তা নয়, যে কোনও রাজনৈতিক দলের ভিতর এই মতবাদের বিস্তর লোক পাওয়া যায়। এঁদের ধারণা যে খুব স্পষ্ট তা-ও নয়, কিন্তু মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে, এঁরা চান অতীতের কোনও সত্যযুগে ফিরে যেতে, এদের বিশ্বাস ভারতের ইতিহাসে এরকম পাপতাপহীন যুগ ছিল এবং সে যুগে ফিরে যাওয়া অসম্ভব নয়।
আমি ধর্মে বিশ্বাস করি, ঐতিহ্যে বিশ্বাস করি। কিন্তু সত্যধর্মের জন্য আমাকে পশ্চাতের কোনও বিশেষ যুগে ফিরে যেতে হবে একথা বিশ্বাস করি না। ধর্মে বিশ্বাস করি বলেই কায়মনোবাক্যে মানি,
নানা শ্রান্তায় শ্রীরস্তি ইতি রোহিত শুশ্রুম।
পাপো নষদ বরো জনঃ ইন্দ্ৰ ইচ্চরতঃ সখ্য ॥
চরৈবেতি, চরৈবেতি
চলিতে চলিতে যে শ্রান্ত তাহার আর শ্রীর অন্ত নাই, হে রোহিত, এই কথাই চিরদিন শুনিয়াছি। যে চলে দেবতা ইন্দ্রও সখা হইয়া তাহার সঙ্গে চলেন। যে চলিতে চাহে না, সে শ্রেষ্ঠ জন। হইলেও সে ক্রমে নীচ (পাপী) হইতে থাকে, অতএব, অগ্রসর হও, অগ্রসর হও।
এবং ধর্মের চেয়েও বেশি মানি ভারতীয় বৈদগ্ধ্যকে– যে বৈদগ্ধ্যকে আমরা এতদিন অবহেলা করেছি।
যদি জানতুম যে ইউরোপীয়, আরব কিংবা চীনা বৈদগ্ধ্যের তুলনায় ভারতীয় বৈদগ্ধ্য বিত্তহীন তা হলে হয়তো আমি সনাতন পন্থায় সে বৈদগ্ধ্য নিয়ে আলোচনা করতুম, কোনও বিশেষ যুগের বিশেষ বৈদগ্ধ্য আঁকড়ে ধরে বসে থাকতুম, কিন্তু দেখছি দেশে দেশের মাঝখানের সর্বপ্রকার ভৌগোলিক বাধা প্রায় লোপ পেতে বসেছে, আজ যেমন ইংরেজি-ফরাসি-জর্মন বৈদগ্ধ্য একে অন্যের গোপনতম সম্পদের খবর রাখে ঠিক তেমনি সেদিন শীঘ্রই এসে উপস্থিত হবে যখন ভারতীয় বৈদগ্ধ্যকে আর সব বৈদগ্ধ্যের সামনে এসে দাঁড়াতে হবে। আমার সম্পদকে তখন তাদের সামনে এমনভাবে সাজিয়ে দিতে হবে, তাকে এমনি ধরনে যুগধর্মোপযোগী করতে হবে যে বিশ্বজন যেন তাকে বুঝতে পারে, এবং তার পর এগিয়ে চলতে হবে তাদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে, ইউরোপ, চীন, আরবের সর্ব জ্ঞান-বিজ্ঞান-কলার সর্বোত্তম নিদর্শন গ্রহণ করে, ভারতীয় সম্পদ দান করে।
তাই ভারতের ভাগ্যবিধাতা নিয়ে চলেছেন,
‘পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থা যুগ যুগ ধাবিত যাত্রী’কে
তারা দাঁড়িয়ে নেই তারা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না
.
ভাষার হাটে বেইমানি
একদা এদেশে মুসলমানি সভ্যতা-সংস্কৃতি এতদূর ছড়িয়ে পড়েছিল যে বাঙলার সভ্যতা, বেশভূষা, আলাপ-আচরণে অনেকখানি মোগলাই-মোগলাই রঙ ধরেছিল। আমার নমস্য গুরুজন জয়রাম মুন্সি চোগা-চাপকান পরতেন আর বড় বড় মজলিসে তার ফারসি বয়েত আওড়ানো শুনে দেশ-বিদেশের জমায়েত মৌলবি-মওলানারা শাবাশ শাবাশ বলতেন। তার পর আমরা একদিন কোট-পাতলুন পরে কাঁটা-চামচ দিয়ে খেতে আরম্ভ করলুম আর আমাদের ইংরেজি কপচানো শুনে দেশ-বিদেশের লোক ধন্যি ধন্যি বলল। সেদিনও গেছে– হরেদরে আমরা সবকিছু সামলে নিয়ে এখন আবার অনেকখানি সম্বিতে ফিরেছি।
আরবি-ফারসি থেকে শব্দ সঞ্চয় করার ফলে বাঙলা ভাষা গতিবেগ পেল সেকথা পূর্বেই একদিন নিবেদন করেছি। আলাল, হুতোমের জোয়ার কেটে যাওয়ার পর বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ হয়ে বাঙলা ভাষা এমন জায়গায় এসে দাঁড়াল সেখানে সে অনায়াসে গুরু-গুম্ভীর ভাবাবেগ প্রকাশ করতে পারে, আবার চাষিবউয়ের কান্নাহাসিরও ঠিক ঠিক খবর দিতে জানে। এ ভাষা দিয়ে যেরকম প্রাচীন সাহিত্যের মরব শোনানো যায় ঠিক তেমনি রামের সুমতির মতো ভেজা ভেজা ঘরোয়া সুখ-দুঃখের কাহিনীও শোনানো যায়– শুধু শব্দ আর বাচনভঙ্গির বেলায় একটুখানি হিসাব করে নিলেই হল।
ঊনবিংশ শতকের শেষ আর এ শতকের গোড়ার দিকে যে হিন্দি লেখা হত সে হিন্দিও মোটামুটি এই কায়দায়ই রচনা করা হত। শুধু তাই নয়, অধিকাংশ হিন্দি লেখক উত্তম উর্দুও জানতেন বলে তাঁদের হাতের নাগালে রইত বিস্তর আরবি-ফারসি শব্দ- কারণ বাঙলা যেরকম শব্দভাণ্ডারের জন্য প্রধানত নির্ভর করে সংস্কৃতের ওপর, উর্দু নির্ভর করে আরবি-ফারসির ওপর। আরবির শব্দ ভাণ্ডার সংস্কৃতেরই মতো বিরাট (সংস্কৃতের মতো আরবিও আপন ধাতু থেকে অসংখ্য শব্দ বানাতে পারে, যথা জালাসা =বসা, তার থেকে মজলিস, এজলাস ইত্যাদি) এবং বাঙলায় যেরকম যেকোনো– তা সে ক্রন্দসীর মতো অজানা শব্দই হোক না কেন– সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার করার শাস্রাধিকার আছে, উর্দুও ঠিক সেইরকম আরবির লক্ষ লক্ষ শব্দের যে কোনও শব্দ ব্যবহার করতে পারে।
তার পর হিন্দিতে এল ভাষাশুদ্ধীকরণের বাই। তার ফলে সে ভাষা বিদ্যেসাগরি ভাষার রঙ না ধরে ধরল সঙ। কারণ বিদ্যেসাগর মশায়ের মতো ওরকম জবরদস্ত লেখক হিন্দিতে কেউ তখন ছিলেন না। তবু সে ভাষা আরবি-ফারসি বিকটভাবে বর্জন করেনি বলে শরৎচন্দ্রের উপন্যাস তখনও তর্জমা করা হত।
স্বাধীনতা পাওয়ার পর কিন্তু এ বাই চরমে গিয়ে পৌঁছল। আমরা বাঙলায় বলি তার পর, কিংবা তার বাদে (বাদ শব্দটা আরবি সেকথা আমরা বেবাক ভুলে গিয়েছি) হিন্দিতে মাত্র একটি উপায়ে বলা যায় এবং সেটি হচ্ছে উসকে বাদ। হিন্দিওলারা তাই সেই বাদটুকুকে পর্যন্ত বাদ দিয়ে বলতে আরম্ভ করেছেনউকে পশ্চাৎমে!
