মোল্লারা ক্রমে ক্রমে নরম হলেন। তখন প্রশ্ন উঠল বন্দুক-কামান ডাইনামো ট্রাক্টর কেনবার মতো কড়ি ইন্ সউদের কোথায়–আরবের মরুভূমি এমন কী ফলায়, যার বদলে এসব কেনা যায়? তখন দেখা গেল সউদি আরবের মাটির তলায় প্রচুর পেট্রল ৷ ইবন্ সউদ সেটা মার্কিনদের কাছে বিক্রি করে পেলেন কোটি কোটি ডলার। তাই দিয়ে অনেক কিছু হল– এখন ইবন সউদের প্রাসাদে লিফট হয়েছে, সে প্রাসাদ অ্যার-কন্ডিশনড়। আবার সেই টাকার জোরেই মিশর এবং ভারতবর্ষ থেকে লক্ষ লক্ষ কুরান কেনা হচ্ছে এবং আরবদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে (সউদি আরবে ছাপাখানার ব্যবস্থা ভালো নয় বলে বোম্বাই-লক্ষ্ণৌয়ে নওলকিশোর প্রেসে ছাপা কুরান সেখানে যায়, কলকাতা থেকে এখনও ঢাকায় লক্ষ লক্ষ কুরান যায়)। ওদিকে সউদি আরবের কোনও কোনও শহরে গোপনে গোপনে স্কচু পানও আরম্ভ হয়ে গিয়েছে।
আরবেরধর্মে ও ইউরোপের অধর্মে খানিকটা সমঝাওতা হয়ে গিয়ে থাকা সত্ত্বেও একথা মানতে হবে যে ইউরোপীয় চিন্তাধারা এখনও মক্কা-মদিনাতে প্রবেশ করতে পারেনি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আরও চারটি দেশ স্বাধীন হয়ে গণতন্ত্র নির্মাণ করেছে ভারতবর্ষ, পাকিস্তান, বর্মা এবং ইন্দোনেশিয়া, মিশরও যুগধর্ম রক্ষা করে গণতন্ত্র হতে চলল এবং চীন কম্যুনিস্ট হয়ে গিয়েছে।
স্বাধীনতা-লাভের প্রথম কট্টর প্রতিক্রিয়া দেখা গেল ইন্দোনেশিয়ানদের মধ্যে। তারা রাতারাতি তাবৎ ডাছ রাস্তার নাম, প্রতিমূর্তি, স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে চুরমার করে দিল (আমাকে এদেশে আগত ইন্দোনেশিয়ানরা প্রায়ই জিগ্যেস করে আমরা এখনও ময়দানে ব্রিটিশ প্রতিমূর্তিগুলো বরদাস্ত করি কেন। উত্তরে আমি বলি, কলা হিসেবে এগুলো এতই নিম্নশ্রেণির যে এগুলো রেখে দিলেই ইংরেজ মাথা হেঁট করবে, অন্যান্য বিদেশি মৃদু হাস্য করবে)।
কিন্তু তাই বলে ইন্দোনেশিয়া ইউরোপীয় সভ্যতাকে বর্জন করল না। ওলন্দাজদের পরিবর্তে তারা এখন ইংরেজি সভ্যতার কিছুটা গ্রহণ করার চেষ্টায় আছে। সুলতান শহরিরের মতো আরও অনেক বিচক্ষণ ব্যক্তি ইন্দোনেশিয়ায় আছেন– এঁরা পণ্ডিত নেহরু গোত্রীয়, এঁরা ইউরোপীয় সভ্যতার আওতায় বড় হয়েছেন এবং দেশের ঐতিহ্যকে জাতীয়তাবাদী হিসেবে শ্রদ্ধা করলেও সে ঐতিহ্যের সঙ্গে এঁদের যোগসূত্র সূক্ষ্ম এবং ক্ষীণ।
কিন্তু তাঁর সঙ্গে সঙ্গে সউদি আরবের মতো ইন্দোনেশিয়ায়ও ধর্ম মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। নব রাষ্ট্র-নির্মাণে এঁদের বিশেষ একটা হক্কও ছিল–শহরির-সুকানোর বহু বহু পূর্বে এঁরা হজে যাওয়ার ফলে মক্কা-মদিনার প্ররোচনায় দেশে ফিরে স্বাধীনতা আন্দোলন আরম্ভ করে দিয়েছিলেন। এঁরা যে ভূমি নির্মাণ করেছিলেন তারই উপর শহরির সম্প্রদায় তাঁদের ফুলের বাগান সাজাতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কিন্তু পূর্বেই নিবেদন করেছি, স্বদেশ-জাত ধর্মের বেলায় মানুষ যেরকম উত্তেজনা ও নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মের পুনরুত্থানের জন্য চেষ্টা করে বিদেশাগত ধর্মের জন্য বিশেষত এই জাতীয়তাবাদের যুগে মানুষ অতখানি করে না। তাই ইন্দোনেশিয়ার মোল্লা সম্প্রদায় ইরানের কশানি সম্প্রদায়ের মতো বহু বল ধারণ করলেও এখনওআধুনিক সম্প্রদায়ীদের আসনচ্যুত করতে পারেননি।
বর্মাতে ধর্মান্দোলন আরও কম, আর পাকিস্তানের খবর সকলেই অল্পবিস্তর রাখেন। চীন কম্যুনিস্ট, তবু চীন সম্বন্ধে একটি কথা জোর দিয়ে বলা যেতে পারে– চীনে ধর্ম এবং সমাজ আলাদা আলাদা থাকে বলে ধর্ম সেখানে অনেকটা আমাদের দার্শনিক মতবাদের মতো। এদেশে পিতা যদি বেদান্ত মানেন, পুত্র যদি সাংখ্যবাদী হন এবং নাতি যদি যোগশাস্ত্রের চর্চা করেন তবে তিনজনকে পৃথক পৃথক বাড়ি বানিয়ে আলাদা আলাদা বসবাস করতে হয় না। তাই চীনের একই বাড়িতে এক ভাই বৌদ্ধ, দ্বিতীয় মুসলমান, তৃতীয় খ্রিস্টান এবং এঁরা একই বাড়িতে নির্বিবাদে গুষ্টিসুখ অনুভব করেন। তিন ভ্রাতাই কিন্তু চীনা ঐতিহ্যের সম্মান করেন এবং তাই আজ চীন ১৯১৭ সালের রুশ বলশেভিকদের মতো আপন বৈদগ্ধ্যবুর্জুয়া নামে গালাগাল দিয়ে চীন-দরিয়ায় ভাসিয়ে দেয়নি। বরঞ্চ শুণীদের মুখে শুনতে পাই মাওসেতু যখন ক্যুনিজম সম্বন্ধে প্রবন্ধ লেখেন তখন বিশেষ করে চোখে পড়ে তার নিজস্ব চীনা রূপ ভাব, ব্যঞ্জনা, অলঙ্কার প্রয়োগে মাও নাকি খাঁটি চীনা ঐতিহ্য মেনে চলেন।
এস্থলে একটি কথায় বিশেষ জোর দেওয়া দরকার। প্রাচ্যের কোনও দেশই ভারতীয়দের মতো অতখানি ইংরেজি পড়ে ইউরোপীয় সভ্যতার আওতায় পড়েনি– এমনকি তুর্কিও অতখানি ফরাসি শেখেনি। ইউরোপীয় সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস-লেখন-পদ্ধতি, অর্থশাস্ত্র, রাজনীতি আমাদের যতখানি প্রভাবান্বিত করেছে তার শতাংশের একাংশ অন্য কোনও প্রাচ্য দেশে হয়নি। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলতে পারি, আমরা সংস্কৃত, বাঙলা সবকিছু ভুলে গিয়ে প্রায় একশো বৎসর ধরে ইংরেজির মাধ্যমে সর্বপ্রকারের জানচর্চা করেছি– চীন কিংবা আরব একদিনের তরেও তা করেনি। তাই আজ আমরা বাঙলায় ফিরে গিয়ে ইংরেজি ভাবের বাঙলা অনুবাদ করার সময় শব্দের সন্ধানে মাথা কুটে মরি। চীন-আরবে এ সমস্যা অনেক সরল, নেই বললেও চলে এবং ঠিক তেমনি তাদের সাহিত্য বর্তমান যুগের আন্তর্জাতিক সাহিত্য-কলার সম্পদ আহরণ করে অতখানি বিত্তবান-আধুনিক ভারতীয় সাহিত্য, কলা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার মতো হতে পারেনি।
