আহা, কী সুন্দর ইংরেজি উচ্চারণ! এতদিন যা দু-চারবার ইংরেজের মুখে ইংরেজি শুনেছি তার চোদ্দ আনা বুঝতে পারিনি। তারা ছিল চা-বাগানের মালিক। খুব সম্ভব কনি। আর ইনি যা বলছেন তার প্রত্যেকটি শব্দ বুঝতে পারছি। যদিও তাঁর কথাগুলো বিরাট দাড়িগোঁফের মাঝখান দিয়ে হেঁকে হেঁকে বেরুচ্ছিল।
পরদিন নোটিশ বেরুল সায়েব আমাদের ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ক্লাস নেবেন। অধ্যক্ষ বিধুশেখরের বারান্দায়। হায়, আজকের তোক বুঝতে পারবে না, আমাদের কী স্থানাভাব ছিল! ব্ল্যাকবোর্ড ছিল না বলে সায়েব বারান্দার মেঝের সঙ্গে আনা চক দিয়ে বিশেষ বিশেষ বিষয়বস্তুর শিরোনামা লিখতেন। বিরাট দেহ। সমস্ত রক্ত চলে আসত দাড়ি আর চোখের মাঝখানে।…
ঘণ্টা বাজল। সায়েব ছুটলেন তার থালা আনতে। সে আমলে সব্বাইকে যেতে হত আপন আপন থালা নিয়ে রান্নাঘরের পাশে ডাইনিংরুমে। কিন্তু বিদেশিদের অন্য ব্যবস্থা ছিল। সায়েব সেখানে মাঝে-মধ্যে যেতেন। কিন্তু বেশিরভাগ খেতেন আমাদের সঙ্গেই।… তার পর সায়েব পড়ালেন শেক্সপিয়র এবং আমাদের অনুরোধে নিউ টেসটামেন্ট। কিন্তু কোনও বই-ই তিনি শেষ করার সুযোগ পেতেন না। আজ ওই হোথায় পাঞ্জাবে না কোথায় পুলিশ মজুরদের কোথাও ব্যস্ হয়ে গেল। তার ক্লাস বন্ধ।
কিন্তু কে শুনতে চায় আজকের দিনে এসব কাহিনী!
.
যুগ-যুগ-ধাবিত যাত্রী
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভ ও নব রাষ্ট্র নির্মাণপ্রচেষ্টা বহু মহাপুরুষের দেশপ্রীতি এবং আত্মত্যাগ দ্বারাই সম্ভবপর হয়েছে এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু সঙ্গে আরও দুটি কথা স্বীকার করতে হয় যে ঐতিহাসিক বিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও এর জন্য অংশত দায়ী। তাই ভারতীয় রাষ্ট্র ভবিষ্যতে কী রূপ নেবে সে আলোচনা করতে গেলে ওই তিনটি জিনিসেরই প্রতি লক্ষ রাখা প্রয়োজন।
কোনও ভূখণ্ড পরাধীন হয়ে গিয়েছিল, ফের স্বাধীন হল এ পরিস্থিতি পৃথিবীতে বহুবার হয়ে গিয়েছে এবং তার নকশা প্রতিবারেই কিছু না কিছু আলাদা হয়েছে। তাই যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের কিছুটা মিল আছে তাদের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলে ভবিষ্যতের ভারত সম্বন্ধে কিছুটা আবছা-আবছা ধারণা হওয়া সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আরব ভূখণ্ডের এক বৃহৎ অংশ, তুর্কি, ইরান ও আফগানিস্তান স্বাধীন হয়ে যায়। এর কারণ অনুসন্ধান করলে আমরা এ প্রবন্ধ যে মূল সূত্র নিয়ে আরম্ভ করেছি তার-ই পুনরাবৃত্তি করতে হয়। কিন্তু উপস্থিত দ্রষ্টব্য এইসব দেশ তাদের নবলব্ধ স্বাধীনতা নিয়ে করল কী?
মুস্তফা কামাল ধর্মে বিশ্বাস করতেন না– এ বিষয়ে তিনি যে সম্পূর্ণ একা ছিলেন তা নয়, তুর্কি পল্টনের বিস্তর অফিসার ফ্রান্স অথবা জর্মনিতে শিক্ষা লাভ করেছিলেন বলে ধর্মের প্রতি এঁদের কোনওপ্রকারের শ্রদ্ধা ছিল না। তিনি যখন স্বাধীনতা লাভের পর দেশ নির্মাণ শুরু করলেন তখন বুনিয়াদি স্বার্থ ধর্মের মুখোশ পরে তাঁকে প্রতিপদে বাধা দিতে লাগল। একে তো মুস্তফা কামাল জাত কালাপাহাড়, তার ওপর তার শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ছিল অসীম। জীবনটাকে তিনি একটা আস্ত জুয়ো খেলা বলে ধরে নিয়েছিলেন বলেই শত্রুর সামান্যতম পণের বিপক্ষে তিনি গোটা জীবনটাকে পণ ধরেখেলায় নামতেন। এরকম লোক হয় তিন দিনেই দেউলে হয়, অর্থাৎ আততায়ীর হাতে প্রাণ দেয়, কিংবা কোটিপতি হয় অর্থাৎ শত জীবন লাভ করে। তাই মুস্তফার কাছে প্রতি বাজিতে মোল্লাদের নির্মম হার মানতে হল। একবার ভেবে দেখলেই হয়, আজ যদি পণ্ডিতজি হুকুম দেন গায়ত্রী সংস্কৃতে উচ্চারণ না করে রাষ্ট্রভাষা হিন্দিতে পড়তে হবে তবে তাবৎ ভারতবর্ষে কীরকম বিরাট আন্দোলন সৃষ্ট হবে। অথচ মুস্তফা কামাল ঠিক ওই হুকুমটিই জারি করেছিলেন– আজান আরবি ভাষায় না দিয়ে দিতে হবে তুর্কিতে, নামাজের মন্ত্রোচ্চারণ করতে হবে তুর্কি ভাষায়!
আফগানিস্তানের বাদশা আমানউল্লাও আপন দেশটাকে গড়ে তুলতে গিয়ে দেখেন মোল্লারা শক্রতা সাধছেন। তিনিও তখন রুদ্ররূপ নেবার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু একে তো তিনি মুস্তফার মতো জুয়াড়ি ছিলেন না, দ্বিতীয়ত তাকে সাহায্য করবার জন্য তাঁর মতো স্বাধীনচেতা জোয়ান আফগানিস্তানে ছিলেন অতি অল্পই। আরও কারণ আছে সন্দেহ নেই, কিন্তু এ দুটো কারণই তাঁর পরাজয়ের পক্ষে যথেষ্ট।
কিন্তু আসল যুদ্ধটা লাগল আরবে। একদিকে ইবন্ সউদ, অন্যদিকে কট্টরতম মোল্লার পাল। তুর্কি-আফগানিস্তান ইসলাম ধর্মের পীঠভূমি নয়, এসব দেশের লোক ধর্মান্তর গ্রহণ করে ইসলাম নিয়েছে। কিন্তু আসল ইসলাম জন্ম নেয় আরব দেশে, আরবের সভ্যতা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য যা কিছু তার সবই ইসলামের চতুর্দিকে গড়ে উঠেছে, ইসলাম ছাড়া অন্য সভ্যতার সঙ্গে তারা বহু যুগ ধরে কোনও সংস্পর্শে আসেনি বলে জগতের অন্য কোনও চিন্তাধারা, অন্য কোনও জীবন-সমস্যা সমাধান যে হতে পারে সে সম্বন্ধে তারা সম্পূর্ণ অজ্ঞ। লোকমুখে তারা শুনেছে, আরবের বাইরে রমণীরা উচ্ছল, পুরুষেরা নাস্তিক, ধর্মের বন্ধন সেখানে একেবারেই নেই, সেখানকার নরনারী নির্লজ্জতায় পশুরও অধম।
গোড়ার দিকে ইবন্ সউদ নিজেও ওই দলেরই ছিলেন কিন্তু নদ ও হিজ্জাজের রাজা হওয়ার পর তিনি যখন রাজ্য গঠনকর্মে নিযুক্ত হলেন তখন দেখেন ইউরোপীয় যন্ত্রপাতি ভিন্ন কৃষি-বাণিজ্য কোনও প্রতিষ্ঠানেরই দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি করা অসম্ভব। এ তত্ত্বটি তিনি তখন ধীরে ধীরে মোল্লা সম্প্রদায়কেও বোঝাতে চেষ্টা করলেন– ওদিকে আবার প্রগতিশীল মিশর থেকে প্রত্যাবর্ত যুবক সম্প্রদায় দু-একখানা মোটরগাড়ি, কিছু কিছু গ্রামোফোনও সঙ্গে আনতে আরম্ভ করেছেন। মোদ্দা কথা, ধর্মের দোহাই দিয়ে আজকের সংসারের আনাগোনা, যোগাযোগ কী করে সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়?
