ইংরেজ যদি কোনওটাতেই রাজি না হয় তা হলে কী হবে সেকথাটা পাউল লেখেনি। বিবেচনা করি, না খেতে পেলে জর্মনরা হন্যে হয়ে সবাই কম্যুনিস্ট হয়ে যাবে এবং তাই রুশ ভালুককে ঠেকাবার জন্য ইংরেজ জর্মনিকে বাঘের দুধ খাওয়াতেও রাজি আছে।
৩. আমেরিকার সমস্যা, হয় মার্কিন কলকারখানা পুরোদমে চালু রেখে পশ্চিম ইউরোপকে কলকজা, মালপত্র দাও– কিন্তু ভুলো না, বিনি পয়সায় নয় রপ্তানি একদম বন্ধ করে দাও, কিন্তু ভুলো না, তা হলে রপ্তানি বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন কলকারখানাও বন্ধ হয়ে যাবে এবং বেকার সমস্যা বাড়বে।
পাউল লেখেনি, কিন্তু বিবেচনা করি, আমেরিকা বাইরের শত্রু রুশের চেয়েও ভেতরের শত্রু বেকার সমস্যাকে ভয় করে বেশি।
এদিকে আমেরিকা পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপে যাতে ক্যুনিজম না ঢুকতে পারে তার জন্য ধনপ্রাণ সব দিতে প্রস্তুত। এই তো সেদিন মার্কিন যখন দেখল ইতালির লোক ভোট দিয়ে হয়তো ক্যুনিজম ডেকে আনবে, সেদিনই সে বড় বড় জাহাজ ভর্তি খানাদানা ইটালিতে পাঠাতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে মার্কিনরা আমাদের খবর পাঠাল যে আমাদেরও রেশন বাড়িয়ে দেবে।
ওদিকে রুশ রেশন বাড়াচ্ছেন জর্মনির আপন এলাকায়। এদিকে মার্কিন রুশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আপন অধিকৃত জর্মন অঞ্চলেও রেশন বাড়াচ্ছেন। এত দুঃখেও আমার হাসি পায়, এই নিলামের ডাকাডাকির দস্তুর দেখে।
শুধু পাউলের নয়, আমাদেরও হাসি পায়। দু দিন আগে যে জর্মনিকে মার্কিন রুশ দু দিক থেকে পাইকারি কিল মেরে ধরাশায়ী করেছিলেন, আজ তাকে চাঙ্গা করে তোলবার জন্য গলায় ঢালছেন ব্রান্ডি, অন্যজন নাকে ধরেছেন স্মেলিঙ-সন্টের শিশি! শুধু কি তাই, গ্যোবেল সাহেব মরার পূর্বে যে একখানা সাত-পৌন্ডি টাইম-বম্ রেখে গিয়েছিলেন সেখানা কানে তালা লাগিয়ে ফেটেছে। গ্যোবে মার্কিন-ইংরেজের উদ্দেশে বলেছিলেন, আমাদের যে তোমরা বিনাশ করছ, তার জন্য তোমরা একদিন আফসোস করবে। তোমাদের শত্রু জৰ্মনি নয়, শত্রু তোমাদের রুশ। এবং সেই রুশের সঙ্গে লড়বার জন্য আমাদের আবার বাঁচিয়ে তুলতে হবে, তোমাদের টাকায় বিয়ার-সসি খাইয়ে, বাড়ি-ঘরদোর বানিয়ে দিয়ে।
গ্যোবেলসের সে টাইম-ব–আমরা বলি ফলিত-জ্যোতিষ– ফেটেছে। রুশের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা করতে গিয়ে মার্শাল ট্রুম্যান যেসব বক্তৃতা ঝাড়েন সেগুলো শুনে মনে হয়, ট্রমান যেন মাইন কাম্ফ পড়ে শোনাচ্ছেন, মার্শালের গলা আর গ্যোবেলসের গলায় তফাৎ ধরতে পারিনে।
শুধু কি তাই, হিটলার একদিন সদম্ভে চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করেছিলেন– গণতান্ত্রিক চেম্বারলেনের গালে ঠাস্ করে চড় মেরে। ঠিক সেই কায়দায় রুশ যখন সেদিন চেকোশ্লোভাকিয়ার গণতন্ত্র গলা টিপে মেরে ফেলল (মাজারিক নাকি আত্মহত্যা করেছেন, বেনেশ নাকি বাণপ্রস্থ অবলম্বন করেছেন!), তখন আমেরিকা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। জর্মনি চেঁচিয়ে বলল, কিছু কর না কর, অন্তত চোখদুটো রাঙা কর। আমেরিকা চোখ-দুটি বন্ধ করেছে।
ফরাসিতে প্রবাদ আছে, প্ল্যুসা শাঁজ, প্ল্যা সে লা মেম শোজ। অর্থাৎ যতই সে রঙ বদলায় ততই তাকে আগের মতন দেখায়। অনেকটা বাঙলা দেশেরগবিতা লেখকদের মতো। যতই তারা রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ঢাকতে চান, ততই তাদের লেখাতে সে প্রভাব ধরা পড়ে।
মার্কিন, রুশ, ইংরেজ যতই তাদের রাজনীতি বদলাতে চায় ততই তাদের চেহারা আগের মতন হতে চলে।
জর্মনি আবার শক্তিশালী হবে।
***
ভুলে গিয়েছিলুম পাউলের চিঠি শেষ হয়েছে প্রশ্ন দিয়ে, Was fangen die Inder mit der wiedergewonnenen Freitheit an? Sich gegenseitig zu erschlagen kann doch unmoeglich das einzige Ergebnis gewesen sein.
অর্থাৎ, নবলব্ধ স্বাধীনতা দিয়ে ভারতবাসীরা কী করছে? একে অন্যকে খুন করাই তো আর সে স্বাধীনতার একমাত্র ফল হতে পারে না।
উত্তরে কী লিখি যদি কেউ বলে দেন!
.
অ্যানডরুজ সাহেব
আমরা ওই নামেই তাঁকে চিনতুম। আমি তাকে গুরুরূপে পাই ১৯২১ থেকে ১৯২৬ অবধি। তার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে শুণী-জ্ঞানীরা তাঁর ব্যক্তিত্ব, তাঁর মহত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন। সে অধিকার আমার নেই।
১৯২১-এর বর্ষায় শান্তিনিকেতনে ভরতি হওয়ার কয়েকদিন পরই জানলুম, আসাম চা-বাগানের শ্রমিকদের জন্য তিনি এদিক-ওদিকে ছুটোছুটি করছেন। গুরুদেব তখন বিদেশে। ফিরে এলেন জুলাই মাসে। বোম্বাইয়ে নেমেই নাকি তিনি মহাত্মা গাঁধীর অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে একমত হতে পারেননি বলে তার বিরুদ্ধে আপন বক্তব্য স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করেছেন। ওদিকে আবার রবীন্দ্রনাথের সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা দ্বিজেন্দ্রনাথ গাঁধীজিকে তার আশীর্বাদ জানিয়েছেন। শুনলাম, অ্যানড়রুজ সায়েব রবীন্দ্রনাথ ও গাঁধীজি দু জনারই সখা এবং দ্বিজেন্দ্রনাথের শিষ্য। এই তিনজনের সখ্য, প্রীতি, স্নেহ তিনি একসঙ্গে পান কী করে? সে যুগে যারা যুবক ছিলেন তাঁরা স্মরণে আনতে পারবেন, একদিক দিয়ে আমাদের সর্বগর্ব ছিল রবীন্দ্রনাথের গান, কাব্যাদি নিয়ে, অন্য দিক দিয়ে আমরা যোগ দিয়েছি গাঁধীজির অসহযোগ আন্দোলনে। এই দ্বন্দেই আমরা দিগভ্রান্ত। আর অ্যানডরুজ সায়েব এই তিনমুখী লড়াই সামলান কী করে?… এমন সময় শান্তিনিকেতনে খবর পৌঁছল, গুরুদেব ও গাঁধীজিতে নাকি মুখোমুখি বসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হবে। অন্যে যা বলুন, বলুন, আমার বিশ্বাস এই মোলাকাতটির ব্যবস্থা করেন অ্যানরুজ সায়েব। তার দু-একদিন পরেই গুরুদেব আর সায়েব আশ্রমে ফিরে এলেন। এবং আমরা আরও দিগ্ভ্রান্ত, এঁদের আলোচনার কোনও রিপোর্ট কোনও কাগজে বেরোয়নি। অ্যানডরুজ সায়েব সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তিনিও কিছু বলেননি। শুনেছি রুদ্ধদ্বারে চার ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা হয়েছিল। বিশ্বজনের প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু আর্টিস্ট ঠেকায় কে? আচার্য অবনীন্দ্রনাথ চাবির ফুটো দিয়ে ভিতরকার অবস্থাটা একপলক দেখে নিয়ে একটি ছবি আঁকেন। সেটি এখন শন্তিনিকেতনের কলাভবনে।… আশ্রমে ফেরার দু-একদিন পরই সায়েব বিশ্বভারতীর ছাত্রছাত্রীদের ডেকে পাঠালেন। সায়েব সর্বপ্রথম বললেন– অর্ধশতাব্দী পরে আমার প্রতিবেদনে যদি ভুলভ্রান্তি থেকে যায় তবে সে সভায় উপস্থিত কোনও মহাশয় সেটি সংশোধন করে দিলে অধম বড়ই কৃতজ্ঞ হবে– গুরুডেব (সায়েব ডদ-য়ে তফাৎ করতে পারতেন না) এবং মহামাজি কলকাতাতে যে আলোচনা করেছেন সেটা জনসাধারণের সামনে প্রকাশ করার কোনও প্রয়োজন নেই। কিন্তু তোমাদের জানানো দরকার। কিন্তু তোমরাও সেটি কাগজে প্রকাশ করো না।
