কী অপূর্ব দৃশ্য!
শ্যামাঙ্গী সুন্দরী গঙ্গাতটে নতজানু হয়ে গঙ্গাজলে প্রস্ফুটিত শ্বেতপদ্মের উপাসনা করছে।
পদ্মপূজা! সে পদ্মও ফুটেছেন গঙ্গাস্রোতে! একেই বলে কল্পনা।
ওদিকে ভারতবর্ষও জর্মনিকে প্রচুর সম্মান দেখিয়েছে। আমরা জৰ্মনিকে যে সম্মান জানিয়েছি তার বেশি দেখানো আমাদের পক্ষে সম্ভবপর ছিল না। ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠতম মহাপুরুষ মহাত্মা গান্ধী যখন রৌন্ড-টেবিল কনফারেন্সে যোগদান করতে বিলেত যান তখন বহু সাংবাদিক মহাত্মাজিকে এদেশ-ওদেশ বহুদেশ দেখে যাবার জন্য অনুরোধ জানান। মহাত্মাজি বলেন যে, একমাত্র গ্যোটের বাইমার দেখবার তার বহুদিনের ঐকান্তিক ইচ্ছা।
শুনে জর্মনি যে আনন্দধ্বনি করেছিল তার প্রতিধ্বনি জর্মন বেতারে বেতারে বহুদিন ধরে শোনা গিয়েছিল। জর্মনির বড়কর্তারা তৎক্ষণাৎ দূত পাঠিয়ে মহাত্মাজিকে ষোড়শোপচারে আমন্ত্রণ করেন; হামবুর্গ বেতারকেন্দ্র মহাত্মাজিকে বেতারে যৎকিঞ্চিৎ বলার জন্য তার কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পেয়ে যায় এবং আর সব বেতারকেন্দ্রের ঈর্ষা তখন যেমন যেমন বিকট হতে বিকটতর রূপ নিতে লাগল, হামবুর্গ বেতারকেন্দ্রের ঢক্কানিনাদ সেই অনুপাতে জর্মনির কর্ণপটহ ছিঁড়ে ফেলবার উপক্রম করল। আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছে, যেদিন হামবুর্গ বেতারকেন্দ্র প্রথম খবর দিল যে মহাত্মাজি বেতারযন্ত্রের সামনে উপস্থিত হতে স্বীকৃত হয়েছেন তখন প্রচারকের (এনাউন্সরের) কণ্ঠে কী গদগদ ভাব, চোখের সামনে যেন স্পষ্ট দেখতে পেলুম লোকটা আনন্দে গলে পড়ছে আর সখী, আমায় ধরো ধরো বলে ঢলে পড়ছে, রেডিয়োর আর পাঁচজন তাকে চতুর্দিক থেকে ঠেকো দিয়ে কোনওগতিকে খাড়া করে রেখেছে।
তার পর যেদিন দুঃসংবাদ দেবার কাললগ্ন এল যে মহাত্মাজি কনফারেন্সে বিফলমনোরথ হয়েছেন বলে বাইমার আসবেন না তখন সে প্রচারকের আর সন্ধান নেই। যে দেবদূত মা-মেরিকে যিশুর শুভাগমনের সুসমাচার দিয়েছিলেন তিনি এবং সঞ্জয় কী করে এক ব্যক্তি হতে পারেন?
ভেবেছিলুম অন্যান্য বেতারকেন্দ্র হামবুর্গের কান কাটাতে বগল বাজাবে কিন্তু তার পরিবর্তে শোনা গেল কেন্দ্রে কেন্দ্রে দরদী গলা এবং সবাই মিলে একজোটে কনফারেন্সের বড়কর্তা ইংরেজের পিঠে মারল কিল।
মহাত্মাজি যে বাইমার যেতে পারেননি সেকথাটা বড় নয়। আসল কথা হচ্ছে, ভারতবর্ষের মহত্তম আদর্শবাদের প্রতীক মহাত্মাজি লন্ডন বসে ব্যঞ্জনায় বলেছিলেন, ইউরোপে যদি দেখবার মতো কিছু থাকে তবে সে হচ্ছে গ্যোটের বাইমার।
***
পরশুদিন চিঠি পেলুম জর্মন সতীর্থ পাউল হারের (Paul Harster) কাছ থেকে। জর্মনির এখন যা দুরবস্থা এবং ভারতবর্ষের মাথায় এখন যা কাজের চাপ তার মাঝখানে জর্মনির সঙ্গে ভারতের যোগসূত্র ক্ষীণ হয়ে গিয়ে ঠেকেছে জর্মনির পাউল এবং ভারতের অখ্যাতনামা লেখকের সঙ্গে।
পাউল চিঠি আরম্ভ করেছে, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা লাভে আনন্দ প্রকাশ করে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত আমরা দুজনে রাইনের পারে, ভিনাস পাহাড়ের (ভেনুস-বের্গ) উপরে, বন্ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়, কাফের ধুয়োর মাঝখানে কখনও উচ্চস্বরে, কখনও নীরবে, কখনও পত্রবিনিময়ে ভারতবর্ষের ভাবী স্বাধীনতা লাভের সুখস্বপ্ন গড়েছি। আমি বলতাম, ভারতের স্বাধীনতা পাওয়ার পূর্বেই আমি মরব। পাউল বাঁকা হাসি হেসে বলত, আগাছা সহজে মরে না, কাটাতে পোকা ধরে না; স্বরাজ না দেখার পূর্বে তোমার মতো কাটা শুকিয়ে ঝরে পড়বে না।
আজ ভারতবর্ষ স্বাধীন, কিন্তু জর্মনি পরাধীন। সে পরাধীনতার চরমে পৌঁছেছিল গেল শীতে। অনাহারে পাউলের দুই শিশুকন্যার যক্ষ্মা হয়, তার স্ত্রী মৃত সন্তান প্রসব করেন। ছাত-চোয়ানো হিমজলে ভিজে পাউলের নিউমনিয়া হয়; ভুগুন্তি কপালে এখনও অনেক বাকি আছে বলে পাউল এখনও পটল বা কপি কিছুই তুলতে পারেনি।
পাউল লিখেছে;
সুসংবাদ দিয়ে চিঠি আরম্ভ করি। আহারাদির বন্দোবস্ত আগের চেয়ে অল্প ভালো হয়েছে। তার কারণ কিন্তু এই নয় যে, মিত্রশক্তি আমাদের দুর্দশা দেখে বিগলিত করুণায় আমাদের ভিক্ষা দিতে রাজি হয়েছেন। খুব সম্ভব তুমি জানো যে মিত্রশক্তিরা লড়াই জেতার পর স্থির করেছিলেন যে, ১৯৫১ পর্যন্ত অর্থাৎ লড়াইয়ের যে ছ বছর আমরা তাদের ভুগিয়েছি, ঠিক সেই পরিমাণ –আমাদের না খাইয়ে মারবেন। কিন্তু কর্তাদের মত বদলে গিয়েছে, এবং তার কারণ–
১. আমাদের কলকারখানা যদি আগুন নিবিয়ে বসে থাকে তবে হলান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, গ্রিস আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারবে না এবং তা হলে তাদেরও আমাদেরি মতো দুরবস্থা হবে। হলান্ড তো গেল বৎসরও তার শাকসজি বিনে পয়সায় দিতে রাজি ছিল, কিন্তু ইংরেজ এতদিন অনুমতি দেয়নি (এক বত্সর পরে আজ এই পয়লা তরকারি খেলুম)।
হলান্ড-ডেনমার্ক ইত্যাদি দেশের দুরবস্থা যেন জনির মতো না হয় সে দুশ্চিন্তা ইংরেজের মাথায় কেন ঢুকল সেকথা পাউল লেখেনি। অনুমান করি, মার্শাল প্ল্যান চালু করে রুশকে ঠেকাবার জন্য এসব দেশের ধনদৌলত বাড়ানো ইংরেজ ও আমেরিকার পক্ষে অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২.বেভিন সায়েব বিপদগ্রস্ত হয়েছেন : আমরা যদি মাল-সরঞ্জাম তৈরি এবং রপ্তানি না করি, তবে আমাদের অন্য কোনও উপার্জন নেই। ইংরেজ জনসাধারণকে তা হলে গাঁটের পয়সা খরচ করে আমাদের খাওয়াতে পরাতে হবে। আর যদি ইংরেজ আমাদের কলকারখানা চালু করতে দেয় তা হলেও বিপদ– আমাদের দুরবস্থা চরমে পৌঁছে যাওয়ার দরুন আমাদের খাইখর্চা এত তলায় এসে ঠেকেছে যে, আমাদের মাল তৈরি হবে অত্যন্ত সস্তাদরে–জাপান যেরকম একদা অত্যন্ত সস্তা মাল তৈরি করতে পারত– এবং সে সস্তা মাল ইংরেজের রপ্তানি-মালের দাম কমিয়ে দেবে। শেষটায় ইংরেজ ইউরোপে আর কিছুই বিক্রি করতে পারবে না।
