এ হল প্রায় চার হাজার বৎসরের কথা। কিন্তু আফগানিস্তান পাহাড়ি মুলুক, আইনকানুন জানে না, দলিল-দস্তাবেজের ধার ধারে না। সেদেশে কোনও দাবিদাওয়ার মেয়াদ ফুরোয় না, কোনও পাওয়া তামাদি হয় না-টাইমবার নামক বাঁধাবাঁধি আফগান ঐতিহ্যে কখনও ঠাই পায়নি। তাই আজ চার হাজার বৎসর পর আফগানিস্তান তার কান্দাহারি মেয়ের বিয়ের যৌতুক হিসেবে পাকিস্তানের সীমান্ত প্রদেশ চেয়ে বসেছে।
এ খবর শুনতে পেয়ে পাকিস্তানিরা ঈষৎ উদ্বিগ্ন হয়েছে। ডমিনিয়নবাসীরা বক্রহাসি হেসে বলছেন, কয়রা পাকিস্তান, হও আলাদা। এইবারে ঠ্যালাটা সামলাও। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান বলে হুঙ্কার দিতে না এককালে?– এইবার তাগড়া পাঠানদের সঙ্গে লড়ে বাঁচাও আপন জান আপন পাকিস্তান।
পাকিস্তানিদের মনে আবছা-আবছা ধারণা, আফগানিস্তানের ভাষা পশতু, আফগানরা জাতে পাঠান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের বাসিন্দারাও পশতু বলে, তারাও জাতে পাঠান। অতএব আফগানিস্তানের দাবিটা হয়তো সম্পূর্ণ কাবুলি পাওনাদারের লাঠির জবরদস্তির ভয় দেখানো নয়।
এ ধারণা ভুল ইতিহাস পড়ার ফল।
আর্য অভিযান থেকে আরম্ভ করি। আর্যরা এদেশে এসেছিলেন আফগানিস্তান হয়ে। আজ যারা আফগান-পাঠান নামে পরিচিত তারা আমাদেরই এক অংশ। পশতু ভাষা আর্য ভাষা।
আফগানিস্তানের প্রাচীন ইতিহাস পাওয়া যায় আমাদের মহাভারত পুরাণে– আফগানিস্তানের নিজস্ব কোনও দলিল-দস্তাবেজ নেই। বহিক দেশ (ফারসি বখ), কাম্বোজ, বক্ষু নদী (Oxus = গ্রিক অক্ষুস) বিধৌত পার্বত্যভূমি আজ আফগানিস্তান নামে পরিচিত। আমাদের ইতিহাসে এসব অঞ্চলকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আজও কাবুলিওয়ালারা যে জাফরান ও হিও বলখ অঞ্চল থেকে এ দেশে নিয়ে আসে তার নাম সংস্কৃতেবাহিক।
পাকাপাকি ইতিহাস আরম্ভ হয় সিকন্দার সাহেব বিজয়-অভিযানের পর থেকে। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য বঙ্খ বাদে সমস্ত আফগানিস্তান গ্রিকদের কাছে কিনে নেন।
রাজা অশোক বৌদ্ধশ্রমণ মাধ্যন্তিককে পাঠান আফগানিস্তানে। আফগানরা অগ্নি-উপাসনা (সে উপাসনাও বৈদিক ধর্মের অংশবিশেষ ও জরথুস্ত্রি ধর্ম নামে পরিচিত) ছেড়ে দিয়ে খাস ভারতবর্ষীয় বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে। আফগানিস্থানের পর্বতগাত্রে খোদিত বামিয়ানের বিরাট বৌদ্ধমূর্তিযুগল ভারতীয় শিল্পের নিদর্শন। গান্ধার শিল্পের যে ভাণ্ডার আফগানিস্তানে পাওয়া গিয়াছে তাও ভারতীয় ও গ্রিক শিল্পকলার সম্মেলনে তৈরি। এসব শিল্পকলাতে আফগানরা কোনও অংশ নেয়নি।
মৌর্য পতনের পর গ্রিকরা আফগানিস্তানে রাজত্ব করে। তারাও যে কতদূর ভারতীয় প্রভাবে পড়েছিল সেটা প্রমাণ হয় তাদের মুদ্রালাঞ্ছন থেকে। তাতে রয়েছে গ্রিক ও ভারতীয় ব্রাহ্মী লিপি– পশতুর কোনও সন্ধান নেই।
কনিষ্ক ভারত-আফগানিস্তানের রাজা ছিলেন। তাঁর রাজধানী ছিল পেশোয়ারে–কাবুলে নয়।
গুপ্তরা আফগানিস্তান দখল করেননি। কিন্তু গুপ্তযুগের পুনরুজ্জীবিত হিন্দুধর্ম আফগানিস্তানে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ধর্ষ পাঠানের পক্ষে তথাগতের অহিংসানীতি পালন করা যে সুকঠিন হয়ে উঠেছিল সে তত্ত্বটা সহজেই অনুমান করতে পারি।
সপ্তম শতাব্দীর চীনা পর্যটক হিউ এন সাঙ কাবুলে এসে দেখেন আফগানিস্তানবাসীদের অর্ধেক হিন্দু, অর্ধেক বৌদ্ধ। তিনি কান্দাহার, গজনি, কাবুল অঞ্চলকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন।
পাঠক যেন মনে না করেন যে ভারতবর্ষ যেসব যুগে আফগানিস্তানে রাজত্ব করেনি সেসব যুগে আফগানরা ভারতবর্ষে রাজত্ব করেছেন। আফগানরা লড়াই করতে জানে, কিন্তু শান্তি-স্থাপনার কর্ম অনেক কঠিন– আফগানের পেটে সে বিদ্যে নেই। আর শান্তি স্থাপন না করে রাজত্ব করা যায় কী প্রকারে?
তার পর আফগানিস্তান ও পশ্চিম ভারতবর্ষ মুসলমান হয়ে গেল। পাঠান রাজারা আফগানিস্তানে রাজত্ব করেননি সত্য কিন্তু দিল্লি ফরাসি সভ্যতার কেন্দ্রভূমি হয়ে উঠল। কাবুলিরা শিক্ষাদীক্ষা অর্থাগমের জন্য ভারতবর্ষে আসতে লাগল। আলাউদ্দিন খিলজির সভাকবি আমির খুসরৌ ফারসিতে যেইশকিয়া নামক কাব্য লিখেছেন তাতেদেব-দেবীর প্রেমের কাহিনী বর্ণিত আছে। কত শত বৎসর হতে চলল আজও কাবুল শহরে জনপ্রিয় কবি ভারতীয় আমির খুসরৌ। কোনও আফগান কবির নাম তো কেউ কখনও এদেশে শোনেনি।
বাবুর আফগান নন। তার আত্মজীবনীতে তিনি কান্দাহার, গজনি, কাবুলকে ভারতবর্ষের অংশ হিসেবে ধরেছেন ও এসব জায়গার প্রতি তার যতই দরদ থাকুক না কেন, তিনি রাজধানী বসিয়েছিলেন দিল্লিতে। তাঁর পৌত্র জালালউদ্দিন আকবর জালালাবাদ শহরের নতুন ভিত্তি নির্মাণ করে শহরকে আপন নাম দিলেন। তাঁর পৌত্র শাহজাহান কাবুলে বাবুরের কবরের কাছে যে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন তামাম কাবুল শহরে সেই একমাত্র দ্রষ্টব্য স্থপতি। (বাবুর কান্দাহার, গজনি, কাবুল অঞ্চলকে তাঁর আত্মজীবনীতে ভারতের অংশ হিসেবে গণ্য করেছেন)।
কিন্তু এসব তথ্যের চেয়ে বড় তত্ত্বকথা এই যে, আফগানরা এককালে ভারতীয় বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে ভারতীয় শিল্পকলা গ্রহণ করেছিল; পাঠান-মুঘল যুগে দিল্লিতে এসে আরবি-ফারসি শিখত। ১৭৪৭ সালে আহম্মদ শাহ দুররানি কর্তৃক আফগানিস্তানে স্বাধীন রাজত্ব (আফগানিস্তানের ইতিহাসে এই প্রথম স্বাধীন রাজ্য) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও, এবং আজ পর্যন্ত আফগানরা আরবি-ফারসি এবং ধর্ম শিক্ষার জন্য আসে ভারতবর্ষের দেওবন্দ-রামপুরে। তারা পারস্যে যায় না, কারণ পারস্যবাসীরা শিয়া। শিক্ষাদীক্ষায় আফগানিস্তান যে ভারতবর্ষের কাছে কী পরিমাণ ঋণী তার সামান্যতম উদাহরণ এই যে, ভারতবর্ষের কোথাও ফারসি মাতৃভাষারূপে প্রচলিত নয়, কাবুলবাসীদের মাতৃভাষা ফারসি এবং কাবুলিরা আসে ফারসি শিখতে ভারতবর্ষে। দেওবন্দ-রামপুরে ফারসি শেখাবার জন্য যেরকম বিদ্যালয় আছে, আফগানিস্তানের কোথাও সেরকম নেই।
