শুধু ইসলাম শাস্ত্র চর্চার জন্য যে আফগান এদেশে আসে তা নয়, বিস্তর ভারতীয় অধ্যাপক, শিক্ষক কাবুল-জালালাবাদের স্কুল-কলেজে শিক্ষাদান করেছেন। আজ যদি এরা সব চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন তবে আফগানিস্তানেরওজারত-ই-ম আরিফ (শিক্ষা দফতর) চোখে নরগিস ফুল দেখবেন। পক্ষান্তরে আজ যদি সব কাবুলিওলা এদেশ থেকে চলে যায় তবে বহু কলের মজুর মৌলা আলিতে শিরনি চড়াবে।
এসব তো হল প্রাচীন অর্বাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি-বৈদগ্ধ্যের কথা। তার সব দলিল যে সবাই মেনে নেবেন সে আশা দুরাশা। কারণ শিক্ষা-দীক্ষার জগতে আজকের দিনে সবচেয়ে বড় কালোবাজার চলছে ইতিহাস-পট্টিতে। হিটলার থেকে আরম্ভ করে ট্রম্যান পর্যন্ত সে বাজারে এক্স-দিল্ দামের সাত ডবল দাম চায়! সাদা বাজারের সসেজ-খেকো, ভুড়িওলা জর্মন সেখানে নর্ডিক-হিরো, ট্রম্যান-পট্টিতে সুদখোর ইহুদি প্রিয়দর্শী অশোকের ন্যায় (প্যালেস্টাইনে) ধর্মপ্রচারাকাক্ষী শ্ৰমণ!
কাজেই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা হোক। আফগানদের যুক্তি যদি ভাষা ও জাতীয়তার (racial) ঐক্যের ওপর খাড়া হয় তবে আফগানিস্তানের প্রথম কর্তব্য হবে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল রুশিয়াকে (অর্থাৎ উজবেগিস্তান তুর্কিস্থান) ছেড়ে দেওয়া; কারণ এ অঞ্চলের লোক জাতে এবং ভাষায় তুর্কোমান মোঙ্গল, উজবেগ।
দ্বিতীয় কর্তব্য হবে আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চল ইরানকে ছেড়ে দেওয়া; কারণ এ অঞ্চলের লোক জাতে এবং ভাষায় ইরানি।
অথবা উচিত রুশকে দাবি জানানো; রুশরা যেন তাদের উজবেগিস্তান ও তুর্কিস্থান আফগানিস্তানের হাতে সঁপে দেয় এবং ইরানকে বলা যেন তাবত ইরানভূমি আফগানিস্তানের অংশীভূত হয়ে যায়।
এ দাবিটা যে কতদূর বেহেড তার একটা তুলনা দিই। সুইস জাতি গড়ে উঠেছে তার পশ্চিম অঞ্চলের ফরাসি, উত্তর অঞ্চলের জর্মন ও পূর্ব অঞ্চলের ইতালীয়কে নিয়ে। এই তিন অঞ্চল আবার শব্দার্থে অঞ্চল, কারণ এরা সবাই মূল শাড়ি ফ্রান্স, জর্মনি এবং ইতালির প্রান্ত থেকে খসে পড়ে সুইজারল্যান্ডে লুটোচ্ছে। আজ যদি সুইজারল্যান্ড খেপে গিয়ে ফ্রান্স, জর্মনি এবং ইতালিকে সুইস রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য দাবি জানায় তবেই তার তুলনা হবে আফগান দাবির সঙ্গে।
কিন্তু যদিও এ দাবি শুধু পাগলা-গারদেই নির্ভয়ে করা চলে তবু এ ধরনের দাবি আমাদের সম্পূর্ণ অজানা নয়। কাবুলিওলাদের সুদের দাবি যে অনেক সময় আসলের বিশগুণ হয়ে দাঁড়ায় সে অনেক মজুরই জানে।
পশতুভাষী উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত তো কস্মিনকালেও আফগানিস্তানের অংশরূপে পরিচিত হয়নি, বরঞ্চ কান্দাহার– গজনি কাবুল জালালাবাদ অঞ্চল (এবং এই অঞ্চলই খাস আফগানিস্তান– এই অঞ্চলের লোকই পশতু বলে এবংপাঠান নামে পরিচিত– পূর্বেই বলেছি বাদবাকি অঞ্চল ইরান ও সোভিয়েট তুকমানিস্তানও উজবেগিস্তানের অংশরূপে পরিচিত) ভারতবর্ষের অংশ, অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চল থেকে কেটে নিয়ে আফগানিস্তানে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন এই, খেয়ালি দাবির হাওয়া বইয়ে কাবুলি পাগলকে জাগাল কে?
রুশ।
ফরাসিতে প্রবাদবাক্য আছে, প্য সা শাজ, প্ল সে লা মেম্ শোজ, অর্থাৎ যতই সে বদলায় ততই তার চেহারা বেশি করে আগের মতো দেখায়। স্তালিনি গুণীরা যতই তাদের বৈদেশিক নীতি বদলাতে চান ততই তাদের চেহারা জারের চেহারার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। রক্ত-শোষক জার ও প্রলেতারিয়ার রক্ষক স্তালিনের বৈদেশিক নীতিতে আজ আর কোনও পার্থক্য নেই। বাংলা সাহিত্য পাটনির বরাতজোরে দুধে-ভাতে বেঁচে ওঠা সন্তান। কিন্তু এই উপযুক্ত সঙিন বৈদেশিক নীতি তার ছাপ এই মোলায়েম সাহিত্যের ওপরও রেখে গিয়েছে;
বেশ মনে আছে, আমাদের ছেলেবেলায় কোনও এক সময়ে ইংরেজ গভর্নমেন্টের চিরন্তন জুজু রাশিয়া কর্তৃক ভারত আক্রমণের আশঙ্কা লোকের মুখে আলোচিত হইতেছিল। কোনও হিতৈষিণী আত্মীয়া আমার মায়ের কাছে সেই আসন্ন বিপ্লবের সম্ভাবনাকে মনের সাধে পল্লবিত করিয়া বলিয়াছিলেন। পিতা তখন (ইং ১৮৬৮ মে- ১৮৭০ ডিসেম্বর) পাহাড়ে ছিলেন। তিব্বত ভেদ করিয়া হিমালয়ের কোন একটা ছিদ্রপথ দিয়া (আসলে আফগানিস্তান দিয়ে –লেখক) যে রুশীয়েরা সহসা ধূমকেতুর মতো প্রকাশ পাইবে তাহা তো বলা যায় না। এইজন্য মার মনে অত্যন্ত উদ্বেগ উপস্থিত হইয়াছিল। বাড়ির লোকেরা নিশ্চয়ই কেহ তাহার এই উল্কণ্ঠার সমর্থন করেন নাই। মা সেই কারণে পরিণত-বয়স্ক দলের সহায়তা লাভের চেষ্টায় হতাশ হইয়া শেষকালে এই বালককে আশ্রয় করিলেন। আমাকে বলিলেন, রাশিয়ানদের খবর দিয়া কর্তাকে একখানা চিঠি লেখ তো৷ মাতার-উদ্বেগ বহন করিয়া পিতার কাছে সেই আমার প্রথম চিঠি। কেমন করিয়া পাঠ লিখিতে হয়, কী করিতে হয় কিছুই জানি না। দফতরখানায় মহানন্দ মুনশির শরণাপন্ন হইলাম। পাঠ যথাবিহিত হইয়াছিল সন্দেহ নাই। কিন্তু ভাষাটাতে জমিদারি সেরেস্তার সরস্বতী যে জীর্ণ কাগজের শুষ্ক পদ্মদলে বিহার করেন তাহারই গন্ধ মাখানো ছিল। এই চিঠির উত্তর পাইয়াছিলাম। তাতে পিতা লিখিয়াছিলেন– ভয় করিবার কোনও কারণ নাই, রাশিয়ানকে তিনি স্বয়ং তাড়াইয়া দিবেন। এই প্রবল আশ্বাসবাণীতেও মাতার রাশিয়ান-ভীতি দূর হইল বলিয়া বোধ হইল না কিন্তু পিতার সম্বন্ধে আমার সাহস খুব বাড়িয়া উঠিল। (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ১৭ খণ্ড, ৩০৫ পূ.)।
