কাজেই এরকম উত্তর শুনে ভূ-ভারত ভাবত, ভারতীয় সৈন্য অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত সম্প্রদায়ের আদর্শবাদী বীরপুরুষ। তাঁরা যে উচ্চশিক্ষিত সে বিষয়ে আর কী সন্দেহ? তারা নিশ্চয়ই হিটলারের মাইন কাম, রজেনবের্গেরমিথ পড়েছেন, কন্সাট্রেশন ক্যাম্প সম্বন্ধে তারা ওকিব-হাল, নাৎসি দলের বর্বরতা সম্বন্ধে তারা বিলক্ষণ সচেতন এবং তাই তারা পৃথিবীতে সত্যসুন্দরমঙ্গল সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য জর্মনির বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন।
তাই যদি হত তা হলে আমাদিগকে মেহন্নত করে এই বৈদেশিক পর্যায় আরম্ভ করতে হত না। আমরা জানি, ভারতবাসী আপন বিরাট দেশ নিয়েই ব্যতিব্যস্ত, এমনকি তার জাতীয় সঙ্গীতে যে পাঞ্জাব-সিন্ধু-গুজরাট-মারাঠা-দ্রাবিড়ের উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সম্বন্ধেও তার জ্ঞান অত্যন্ত সীমাবদ্ধ।
কাউকে দোষ দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। পরাধীনতার সবচেয়ে মারাত্মক অভিসম্পাত সপ্রকাশ হয় তার শিক্ষা-পদ্ধতিতে। আমরা এতদিন ধরে যে শিক্ষালাভ করেছি তার প্রধান উদ্দেশ্য এই ছিল না যে, আমরা দেশ-বিদেশ সম্বন্ধে জ্ঞানসঞ্চয় করে পৃথিবীতে আপন আসন বেছে নিই। আমরা যে শিক্ষা পেয়েছি তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আমাদিগকে আত্মবিস্মৃত জড়ভরত করে রাখার; তাতে ইংরেজের লাভ ছিল।
তাই আশ্চর্য বোধ হয় যখন বাঙালির ছেলে দেশ-বিদেশ সম্বন্ধে কৌতূহল প্রকাশ করে। আনন্দ বোধহয় যে অশিক্ষা-কুশিক্ষা, দুঃখ-দৈন্যের ভিতরও তারা তাদের মনের জানালা ক খানা বন্ধ করে দেয়নি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা এখানে তুলব না– দেশ-বিদেশ ভ্রমণকারী বান্ধবদের মুখে শুনেছি যে, তারা বিদেশে কী শিক্ষা পেয়েছেন, সে সম্বন্ধে বাঙালি তরুণের যত না অনুসন্ধিৎসা তার চেয়ে অনেক বেশি তাদের কৌতূহল যে-দেশ তারা ভ্রমণ করে এসেছেন সে-দেশের নানা খবরাখবর শুনতে। বই পড়াতেও তাদের উৎসাহ কম নয়, আর খবরের কাগজ তো তারা পড়েই।
কিন্তু খবরের কাগজে তারা বিদেশি খবরের সন্ধান পায় কতটুকু?
আমি বাঙালি দৈনিক কাগজগুলোর কথা ভাবছি। সেগুলোতে বিদেশি খবর যেটুকু পরিবেশন করা হয় সে এতই নগণ্য যে তার ওপর নির্ভর করে যদি কোনও বাঙালি সাধারণ জ্ঞানের পরীক্ষায় বসে, তবে তার অনার্স বা সসম্মান ফেল অনিবার্য। বাঙলা দৈনিক পড়ে মনে হয়, বিদেশি খবর দেবার বরাত যেন ইংরেজি কাগজের, আবারদেশি ইংরেজি কাগজ পড়লে মনে হয় তারা যেন বরাত চাপিয়ে দিচ্ছেনস্টেটসম্যানের ঘাড়ে। বিদেশি খবর? ওগুলো দেবে বিদেশি কাগজ ওসব হচ্ছেস্টেটসম্যানের কর্ম। যেন বাঙালি কাগজ বাঙালি বিধবার শামিল। বিলিতি বেগুনের মতো বিলিতি খবর তার পক্ষে নিষিদ্ধ!
আর বিদেশি খবর যে-হোমিওপ্যাথিক মাত্রায় দেন সে-ও আবার সর্বপ্রকার টীকা-টিপ্পনী বিবর্জিত। ইংল্যান্ডে, ফ্রান্সের মতো সুশিক্ষিত দেশের কাগজওলারা পর্যন্ত খবর রাখে যে সাধারণ পাঠক কতটুকু জানে না-জানে এবং সেই হিসেবে বিদেশি খবর পরিবেশন করার সময় প্রয়োজনীয় টীকা-টিপ্পনী দিতে কসুর করে না। শুধু তাই নয়, সম্পাদকীয় স্তম্ভে সে সম্বন্ধে দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখা হয়, রবিবারের কাগজে তার বিস্তৃত সচিত্র বিবরণ বেরোয় এবং যদি সমস্ত ব্যাপারটা দেশের সাধারণ লোকের মনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে তবে রাজনৈতিক কর্তাদের আসরে নেমে আপন আপন বক্তব্য খোলসা করে বলতে হয়। শেষ পর্যন্ত হয়তো প্রধানমন্ত্রীকেই বিবৃতি দিতে হয়। দেশের লোকেরা তখন অন্তত এইটুকু প্রত্যয় রাখে যে তাঁর বিবৃতি বিশেষজ্ঞের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপর তৈরি করা হয়েছে। সে বিশেষজ্ঞ রাজদূত; যে-দেশ নিয়ে আন্দোলন আলোড়ন চলছে তিনি সে দেশে বসবাস করেন ও প্রতিদিন না হোক, প্রতি সপ্তাহের সে দেশ সম্বন্ধে একখানা গোপনীয় রিপোর্ট বা প্রতিবেদন পাঠান।
আমাদের পত্রিকাওলারা কোনওরকম মেহন্নত করতে নারাজ। পাঠক কী খবর চায় না-চায়, তাকে কী করে পৃথিবীর খবর সম্বন্ধে উৎসুক করে তোলা যায়, সে সম্বন্ধে তাঁরা সম্পূর্ণ উদাসীন। বায়স্কোপওলারা যদি যথেষ্ট বিজ্ঞাপন দেয়, বড় বড় কোম্পানির নেকনজর থেকে যদি তারা বঞ্চিত না হন তবে কাগজ চলবেই– কেউ ঠেকাতে পারবে না। ভালো খবর পরিবেশন করার চেষ্টা দেখতে পাওয়া যায় একমাত্র নবজাত কাগজের মধ্যে। বাচ্চা হরিণের মতো তাঁরা ছুটোছুটি করেন ভালো খবরের সন্ধানে কিন্তু কাগজ চালু হয়ে যাওয়ার পর তারাও মেদস্ফীত হরিণের ন্যায় পাঁচতলা-গাছের ছায়ায় শুয়ে থাকাটাই জীবনের চরম মোক্ষ বলে ধরে নেন।
বক্ষ্যমাণ মাসিক এ সমস্ত অভাব ঘুচিয়ে দেবার স্পর্ধা বা দম্ভ করে না। তার যদি কোনও দম্ভ থাকে তবে সেটুকু মাত্র এই যে সে চেষ্টায় কসুর করবে না। এবং তার ভরসা যে একদিন যোগ্য পাত্র এসে আমাদের আরব্ধ কর্ম সুসম্পন্ন করে দেবেন।
দেশের অত্যন্ত কাছে, যে দেশকে বিদেশ বলা প্রায় ভুল, সেই দেশ নিয়ে আমাদের এ পর্যায় আরম্ভ হল।
.
আফগানি দাবি
একদা এক কান্দাহারি রাজকুমারী বহুশত যোজন অতিক্রম করে বরের সন্ধানে দিল্লিতে এসে উপস্থিত হন। ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় কবি তখন ভূ-ভারত দাবড়ে বেড়াচ্ছিলেন– রাজকন্যার দিকে ভালো করে এক নজর তাকিয়ে বললেন, এ কন্যার নিদেনপক্ষে একশো বাচ্চা হবেই হবে। একশো বাচ্চা শুনে যেন আমরা আশ্চর্য না হই; কান্দাহারি পাঠান কুমারীর দৈর্ঘ্যপ্রস্থ দেখলে এরকম ভবিষ্যদ্বাণী সবাই করে থাকে– গান্ধারীকে দেখে হস্তিনাপুরের ব্যাস যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন সেটা ফলেছিল তো বটেই, এমনকি ছেলেগুলো ঠ্যাঙাবার জন্য একটা বোনও পেয়ে গিয়েছিল।
