তার পর যখন ইসলামের ক্ষমতা বিস্তৃত হল– দেশজয়ে যখন সম্পদে ইসলাম সাম্রাজ্য-সমৃদ্ধ হতে লাগল, তখন থেকে তারা হ্যাভ-নটদের কথা বিস্মৃত হতে লাগল এবং ইসলামের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে পতন আরম্ভ হল। ভারতে যখন মুসলমান এল তখন ইসলামের সেই Message আর নেই। কাজেই দেখি নবাব ওমরাহদের বংশধর ব্যতীত মধ্যভারতের কয়েকটি শহর অঞ্চল ছাড়া ইসলাম আর কোথাও প্রতিষ্ঠিত হল না। বাঙলায়ও মুসলমান ধর্মের প্রসার হত না যদি আরব থেকে প্রচারকরা ইসলামের মূল নীতির বাহক ও ধারক হয়ে এখানে প্রচারে অবতীর্ণ না হতেন।
এদিকে ভারতে ঢুকেও ইসলাম নিজের ধর্মমত সম্বন্ধে একপেশে হয়ে রইল। কারণ হিন্দুধর্মের ভগবান-সম্পর্কিত দিকটা বড় উদার– তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর মধ্যে যাকে যখন খুশি মেনে নিলেই হল– তা নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু খাওয়া-ছোওয়া বিবাহাদি ব্যাপারে সামাজিক অনুশাসন বেশ কড়া বিশেষ বিশেষ পন্থি এবং নিয়মকানুনের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছে সেসব অমান্য করলেই জাত গেল। মুসলমানদের এ বিষয়ে ঠিক হিন্দুদের বিপরীত– ভগবানএকমেবাদ্বিতীয়ম এটা মানতেই হবে এবং এ সম্বন্ধে কোনও ভিন্নমত পোষণ করা একেবারেই চলবে না। আর সামাজিক ব্যাপারে অর্থাৎ আহারবিহারে একেবারে উদার। কাজেই হিন্দুধর্মের সঙ্গে কোনও Common Platform বা আপসক্ষেত্র পাওয়া গেল না, কাজেই মুসলমান হিন্দুর সঙ্গে সাত-আটশো বছর বাস করলেও হিন্দুর বিরাট দর্শনশাস্ত্র ইসলামে কোনও ছায়াপাত করতে পারল না।
এইভাবে হিন্দু এবং মুসলমান টোল এবং মাদ্রাসাতে মশগুল হয়ে রইল। ধর্মমতের মিল আর হয়ে উঠল না। কেউ কাউকে জানার জন্য বিশেষ চেষ্টাও করল না। ইংরেজ এসে কিন্তু মিরাকেল ঘটাল টোল-মাদ্রাসা ছেড়ে হিন্দু-মুসলমান এক বিদ্যায়তনে পড়াশুনা করতে লাগল– ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি ফারসির জায়গায় রাষ্ট্রভাষা হওয়াতে মুসলমান কিছুকাল মুখ ফিরিয়ে অভিমান করে বসেছিল হিন্দুরা আগেই এসেছে বলে শিক্ষায় মুসলমানরা একটু পেছিয়ে গেল। কিন্তু আজকের দিনে রাষ্ট্র দুটো হলেও দু রাষ্ট্রের মধ্যে সকল ধর্মের লোক আছে, কিন্তু তাতে শিক্ষার বা কালচারের অসুবিধা কেন হবে। হিন্দু-মুসলমানে কোনও কোনও বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও দৃষ্টিভঙ্গির একটা ঐক্য থাকতে পারে– সেখানে ধর্মের কোনও স্থান নেই। পারস্যের কালচার যেমন পারস্যভাষার সাহায্যে নতুন করে গড়ে উঠেছে– যদিও পারসি ভাষা আরবি অর্থাৎ পবিত্র কোরানের ভাষা নয়– একেবারে কাফেরের ভাষা। পারসি ভাষায় রুমি, জালালুদ্দিন, সাদি, হাফিজ সার্থক সাহিত্যের সৃষ্টি করলেন। ভারতের উর্দুভাষা কিন্তু আরবি-পারসি-হিন্দি মন্থন করে গড়ে ওঠেনি উর্দুর বিশিষ্ট লেখকদের মধ্যে তো ঢের হিন্দু রয়েছে। উত্তরভারত ও দাক্ষিণাত্যের বহু মন্দিরের গঠনশিল্প কি হিন্দু ও ইসলামের মিলিত কালচারের চিহ্ন বহন করছে না? গজনির সুলতান মামুদের সভাকবি আলবেরুনি এদেশে দীর্ঘকাল বাস করেছেন। শুধু এদেশের সভ্যতাকে জানবার জন্য এবং সেটার যেটুকু ভালো সেটুকু আহরণ করে নিজের দেশের সভ্যতার অঙ্গবৃদ্ধি করার জন্য। এই যে Power of assimilation বা পরের ভালোটুকু আত্মস্থ করে নেওয়ার ক্ষমতা সেটা একদিন ইসলামের ছিল– সেক্ষেত্রে সে ধর্মনিরপেক্ষভাবেই চলেছিল।
আজ পূর্ব পাকিস্তানের এই বিরাট জনসংখ্যাকে ইসলামের ঐতিহ্য মনে রাখতে হবে এবং সেই পরমতসহিষ্ণুতাকে সম্বল করে নিজের ধর্মমতকে আর একটু পরের সমালোচনার দ্বারা সহনশীল এবং তুলনামূলক আলোচনার ক্ষেত্র করে অগ্রসর হতে হবে তা হলে জনসংখ্যায় এবং আয়তনে পারস্যাপেক্ষা বড় এই যে পূর্ব-বাঙলা, এ কি উন্নত হতে পারবে না? শুধু ধর্মের ঝুলির ওপর নিজস্ব বিচারবুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে একটা নতুন দেশের পত্তন করা যায় না। নতুন রাষ্ট্রকে নতুনরূপে দেখতে হলে ইসলামধর্ম ভালো করে জানতে হবে পড়তে হবে ইসলামের মূলনীতিগুলো যা সর্বদেশের এবং সর্বকালের জন্য। তা হলেই দেশ-স্বাধীন সত্যিকারের হবে। প্রাক-স্বাধীন যুগে ছিল ভাঙার কাজ– স্বাধীনোত্তর সময়ে হবে গড়ার কাজ। ভারত ডোমিনিয়নের কটা বন্দুক-কামান আছে এবং আমাদেরই-বা কটা আছে এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে দেশের কোনও উপকার হবে না। হিন্দুস্তান-পাকিস্তানে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা নয় নিজের দেশের কিসে ভালো হবে, দেশের লোক কিসে পেটভরে খেতে এবং পরতে পারবে সেইসব শুভঙ্করী বুদ্ধিবৃত্তির দিকে আপনাদের উৎসাহ প্রয়োগ করতে হবে। যদি এই কথা মনে রাখেন, দেশের সেবাই আপনাদের উদ্দেশ্য তা হলে পাতঞ্জলের ভাষায় সেটাই হবে আপনাদের রাষ্ট্রের দৃঢ়ভিত্তি– তার ওপর প্রতিষ্ঠিত হলে এর আর অধঃপতন নেই।
.
বৈদেশিকী
ইংরেজ রাজত্বে আমাদের মস্ত সুবিধা এই ছিল যে দেশ-বিদেশের খবর রাখার আমাদের কোনও দায় ছিল না। জর্মনির সঙ্গে লড়াই করার প্রয়োজন বোধ করলে ইংরেজ যে শুধু আমাদের জিজ্ঞাসা না করেই যুদ্ধ বাধাত তা নয়, আমাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে হতভাগা দেশকেও সে তার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলত। কোনও সরল ইংরেজ যদি তখন শুধাত যে ভারতবাসীর এ যুদ্ধে সায় আছে কি না, তখন লন্ডনের বড়কর্তারা অভিমানভরে বলতেন, এ বড় তাজ্জব প্রশ্ন! এ প্রশ্নে লুকানো রয়েছে আমাদের প্রতি অন্যায় সন্দেহ। খবর নাও, দেখতে পাবে ভারতবর্ষে আমরা কস্মিনকালেও জবরদস্তি-রঙুরুট (কনক্রিপশন) করিনি। ভারতের প্রত্যেকটি সেপাই আপন খুশ এক্তেয়ারে জর্মনির বিরুদ্ধে লড়ছে।
