পিতামহের মাতৃভাষা নিশ্চয়ই হয় ফারসি, নয় উর্দু ছিল। রহীমুন্নিসা কিন্তু খাঁটি বাঙালি। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন,
স্বামী আজ্ঞা শিরে পালি লিখি এ-ভারতী।
রহিমন্নিচা নাম জান, আদৌ ছিরীমতী।
অর্থাৎ তার নাম শ্রীমতী রহিমুন্নিসা।
শোকের কবিতায় এ মহিলার অসাধারণ সরল কবিত্ব প্রকাশ পেয়েছে। সামান্য উদাহরণ দিলেও ভবিষ্যতে এর ভারতী আরও প্রকাশিত হবে এই আশা নিয়ে এ আলোচনা শেষ করি;
নয়া সন নয়া মাস ফিরে বারে বার।
মোর জাদু কাল ফিরি না আসিল আর ॥
আশ্বিনেতে খোয়াময় কান্দে তরুলতায়,
ভাই বলি কান্দি উভরায়।
আমার কান্দন শুনি বনে কান্দে করঙ্গিনী
জলে মাছ কান্দিয়া লুকায় ॥
একাডেমির ভার যোগ্য স্কন্ধে পড়েছে, এ বিষয়ে কণামাত্র সন্দেহ নেই।
একাডেমির ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আমরা প্রশ্ন জিগ্যেস করব না। বিদ্যুৎ আবিষ্কৃত হলে তার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ফ্যারাডেকে নাকি এক মহিলা এই প্রশ্ন করেছিলেন। তিনি নাকি গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন, ম্যাডাম, নবজাত শিশুর ভবিষ্যৎ কী কে বলতে পারে!
উপস্থিত দেখতে পারছি শিশুটি বলিষ্ঠ, প্রাণবন্ত ও তার কৌতূহল অসীম। আমরা মুক্তকণ্ঠে বলি, শতং জীব, সহস্রং জীব।
.
রাষ্ট্র, ধর্ম ও সমাজ
(বগুড়া কলেজের সাহিত্য-অধিবেশনের সভাপতিরূপে অভিভাষণ)
পৃথিবীর সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা এবং সমস্ত ধর্মমত ভৌগোলিক কারণে অল্পপরিসর নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ থেকে পরস্পর বিচ্ছিন্নভাবে নিজেদের সভ্যতা এবং ধর্মমত গড়ে তুলেছে। কিন্তু যখনই সেই সভ্যতা এবং ধর্মমত নিজের গতি মুক্ত হয়ে বাইরে অন্যের সঙ্গে যোগস্থাপন করেছে তখনি তাদের মধ্যে দেশকাল, পাত্রভেদে একটু পরিবর্তন হয়েছে। আমার আজকের বক্তব্য ইসলাম সম্বন্ধে এবং ইসলাম ধর্ম প্রসঙ্গে আপনাদের আমার আগের কথাটা একটু চিন্তা করতে বলি। আমি নিজে মুসলমান, কাজেই এ বিষয়ে আমার স্বাভাবিক আগ্রহ থাকা ছাড়া আমি নানা দেশ ঘুরে এবং এ সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞানসঞ্চয় করে আমার নিজস্ব চিন্তাধারা আপনাদের সামনে উপস্থাপিত করছি।
আজ বিজ্ঞানের কৃপায় দেশে-দেশের ভৌগোলিক ব্যবধান ঘুচেছে, কাজেই এক দেশ আর এক দেশকে, এক সভ্যতা আর এক সভ্যতাকে নিবিড় করে জানবার সুযোগ পাচ্ছে। এই আধুনিক যুগে সত্যিকারের ইসলামের সেবককে মানসিক জড়ত্ব ত্যাগ করে ইসলামের সঙ্গে অন্য প্রচলিত সব ধর্মের তুলনামূলক আলোচনা করে তার আপেক্ষিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে– শুধু মৌলভি-মোল্লার অনুশাসন এবং ধর্মব্যাখ্যানের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।
ইসলাম সম্বন্ধে আপনাদের বোধহয় একটা ধারণা আছে যে ইহাই একমাত্র ভগবান কর্তৃক প্রত্যাদিষ্ট একমাত্র সত্যধর্ম। কিন্তু সেটা সত্যি নয়– কেননা এর আগেও মুশা ও যিশুখ্রিস্টের নিকট ভগবানের প্রত্যাদেশ সত্যধর্মরূপে প্রকাশ হয়েছিল। এক বিষয়ে ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের সঙ্গে ইসলামের সাদৃশ্য আছে– আল্লাহ যুগে যুগে সত্যপুরুষ বা প্রফেটের মাধ্যমে সত্যবাণী প্রকাশ করেন, কাজেই ইসলামকে একেবারে আকস্মিক বলে ধরলে চলবে না– পূর্বোক্ত দুই ধর্মমতের পরিণতি হিসেবেই জানতে হবে এবং কোরানও এ সম্বন্ধে এই এক কথাই বলেন।
নতুন কোনও ধর্মপ্রচারের পশ্চাতে শুধু ধর্মের মহান বাণী ব্যতীত একটা অর্থনৈতিক ভিত্তি না-থাকলে তার প্রতিষ্ঠা হওয়া শক্ত। যিশুখ্রিস্ট সুদখোর ইহুদি বণিক-সম্প্রদায়ের পবিত্র ধর্মস্থানকে টাকার লেনদেনের স্থান দেখে তার প্রতিবাদ করেছিলেন– ধনীশোষিত জনসাধারণ তাঁকে সমর্থন করলেও স্বার্থহানিভীত ধনী ইহুদিরা তাঁকে রাজদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করে তার প্রাণহানি করিয়েছিলেন। হজরত মুহম্মদের নতুন ধর্ম ইসলামের প্রচারের পশ্চাতেও এইপ্রকার একটা আর্থিক প্রোগ্রাম ছিল কি না ধনীদের আয়ের কিয়দংশ জাকাত অর্থাৎ গরিবদের দান করতে হবে। এতে হ্যাভ-নটরা আশ্বস্ত হলেওহ্যাভের দল আশঙ্কিত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে আরম্ভ করল। একেশ্বরবাদ প্রচারে যারা বিশেষ বিচলিত হয়নি সেই কোরেশ-সম্প্রদায় তাঁকে মক্কা-ছাড়া করল! কাজেই ইসলামের এই সাম্যের ভিত্তিতে ধনবণ্টন নীতি যদি পালন না-করা হয়– redistribution of wealth দ্বারা যদি হ্যাভ-নটদের কোনও সুব্যবস্থা না হয়, তা হলে ইসলামের মূলনীতি মানা হবে না। সবাইকে ধনী-দরিদ্রকে সঙ্গে নিয়ে শুধু একসঙ্গে আহার এবং বাসের সুবিধা দিলেই Islamic democracy প্রতিষ্ঠিত হবে না। ইসলামের যে অর্থনৈতিক প্রোগ্রাম আছে তাকেও কার্যকরী করে তোলবার জন্য প্রয়াস করতে হবে।
হজরত মুহম্মদ যখন মদিনা থেকে আবার মক্কায় ফিরে এলেন তখন মক্কাবাসীরা তাঁর ধর্মকে সাদরে গ্রহণ করল– কোনও রক্তপাতের দরকার হয়নি। সেটা শুধু তাঁর মহাপুরুষত্বের জন্য, না তিনি হ্যাভ-নটদের সহানুভূতি পেয়েছিলেন বলে? তার পর খলিফাঁদের আমলে পারস্যসাম্রাজ্য জয়ে ইসলামের এই অর্থবণ্টননীতি কার্যকরী হয়েছিল পারস্যের জনগণ করভারে নিষ্পিষ্ট হচ্ছিল এবং যখনই ইসলামের অর্থনৈতিক প্রোগ্রামের কথা ছড়িয়ে পড়ল তাদের মধ্যে তখনই তারা ইসলামকে সাদরে বরণ করে নিল– নইলে যে বিরাট পারস্যবাহিনী গ্রিকদের পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুলেছিল তারা কেন ইসলামের কাছে পরাস্ত হবে! ইসলামের ধনসাম্যের Message বা বাণী তাদের জনগণের Morale একেবারে নষ্ট করে দিয়েছিল। এই ইসলামেয় বাণীই তুরস্ক, মিশর, উত্তর আফ্রিকা, স্পেন জয়ে সাহায্য করেছে– সুদ্ধ অস্ত্রবল এবং নতুন ধর্মের বাণীতে হয়নি। ইসলামের আদিযুগের কাহিনী হচ্ছে এই।
