এই প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষকে অনায়াসে বাঙালি মুসলমানের রামমোহন বলা যেতে পারে। কিন্তু হায়, বাঙালি মুসলমান এঁকে তখন চিনতে পারেনি। আজ যদি বাঙলার মুসলমান এঁকে চিনতে পারে, তবে পুব বাঙলার একাডেমি আমাদের সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য অন্তহীন প্রশংসা অর্জন করবেন।
দ্বিতীয় প্রবন্ধে পুব বাঙলার জনপ্রিয় মাসিক মাহেনও-এর সম্পাদক জনাব আবদুল কাদির, কবি মালিক মুহম্মদ জয়সীরপদুমাবৎ কাব্যের অনুবাদক পুব বাঙলার কবি সৈয়দ আলাওল ও তাঁর কাব্যের সঙ্গে আমাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।পদ্মাবতীর পুঁথি সংগ্রহ করা অতি কঠিন। লেখক এই প্রবন্ধের উদ্ধৃতি এতই পাণ্ডিত্য ও রসবোধের সঙ্গে করেছেন যে মূল পড়া না থাকলেও কাব্যখানির সঙ্গে যে পরিচয় হয় তা অকৃত্রিম ও বিকৃতিহীন। তবে লেখক যে আলাওলকেনিঃসন্দেহে ভারতচন্দ্র হইতেও শ্রেষ্ঠ কবি বলেছেন, সে সম্বন্ধে আমাদের মনে কিঞ্চিৎ সন্দেহ আছে। আশা করি কাদির সাহেব এ সম্বন্ধে দীর্ঘতর প্রবন্ধ লিখে আমাদের সন্দেহভঞ্জন করবেন।
অধ্যাপক আশরাফ সিদ্দিকী মীর মশাররফ হোসেনের কর্মজীবন ও সাহিত্যচর্চা নিয়ে যে গভীর গবেষণাত্মক প্রবন্ধটি লিখেছেন তাতে বিষাদ সিন্ধুর অনুরাগীদের প্রভূত উপকার হবে সন্দেহ নেই। মশাররফ হোসেনকে বাঙালি এক বিষাদ-সিন্ধুর লেখক হিসেবেই চেনে; তার বহুমুখী প্রতিভার প্রচুর পরিচয় এই নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ থেকেই পাওয়া যায়।
সৈয়দ মোর্তাজা আলী সাহেব বাঙলা গদ্যের আদিযুগ সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে চারটি উদাহরণ দিয়েছেন। (১) ১৫৫৫ খ্রি. অহমরাজ চুকম্পাকে লেখা কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণের চিঠি, (২) ১৬৪৭ খ্রি. শ্রীহট্টাঞ্চলে লেখা একটি হকিকত নামা, (৩) জয়ন্তিয়া বুরুঞ্জী থেকে উদ্ধৃত আসামরাজকে লেখা জয়ন্তিপুরের রাজার একখানা চিঠি ও (৪) মনোলদা-আসসুমের কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ থেকে। যে সমস্ত অঞ্চলের ভাষা থেকে তিনি উদাহরণ নিয়েছেন সেসব অঞ্চলের ঐতিহ্য ও বর্তমান প্রচলিত উপভাষাগুলোর সঙ্গে তিনি সুপরিচিত এবং তার হিসটরি অব জয়ন্তিয়া ওই ভূখণ্ড সম্বন্ধে ইংরেজিতে লিখিত একমাত্র গ্রন্থ (পাঠান-মোগল কেউই খাসিয়া পাহাড়ের সানুদেশে অবস্থিত জয়ন্তিয়া রাজত্ব অধিকার করতে পারেনি বলে এদেশে প্রাচীন হিন্দু পলিটির প্রচুর আবিষ্কৃত নিদর্শন পাওয়া যায়) ও কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের চর্চাকারীর পক্ষে অপরিত্যজ্য। অগ্রজের সাহিত্যচর্চার নিরপেক্ষ আলোচনা নন্দনশাস্ত্রসম্মত, কিন্তু সংস্কার বাধা দেয়।
পাবনার সাধক কবি জহীরউদ্দীনের জীবন ও গীত সম্বন্ধে লিখেছেন মৌলবি গোলাম সাকলায়েন ও শ্রীহট্টের কবি শাহ হুসেন আলম সম্বন্ধে আলোচনা করেছেন মৌলবি নিজামউদ্দীন আহম্মদ।
ইরানের সুফি মতবাদ বাঙলা দেশে এদেশের নিজস্ব শ্রীরাধাকেন্দ্রিক বৈষ্ণব ভক্তিবাদের সঙ্গে মিলে যাওয়াতে এইসব মারিফতি (গুহ্য তত্ত্বাত্মক) গীতের সৃষ্টি জর্মন পণ্ডিত গড়ৎসিহার ও হর্টেনের বিশ্বাস ইরানে থাকাকালীনই সুফি মতবাদ বেদান্ত, যোগ ও নারদ শাণ্ডিল্যের ভক্তিবাদ দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিল; ফরাসি পণ্ডিত মাসিনো অস্বীকার করেন কিন্তু ইরানি এবং আরব কবিদের ন্যায় এঁরা আপন জীবনকাহিনী তাদের সৃষ্টির ভিতর বুনে দিতেন না। আত্মগোপন করার ভারতীয় ঐতিহ্যই বরঞ্চ তারা স্বীকার করে নিয়েছিলেন কোনও কোনও পণ্ডিত মনে করেন, চণ্ডীদাস কয় জাতীয় ভণিতা মুসলমানদের কাছ থেকে নেওয়া)। দুই প্রবন্ধের লেখকই যেটুকু খবর পাওয়া যায় তাই নিঙড়ে নিঙড়ে তাদের কাব্যসৃষ্টি থেকে বের করেছেন। এই ধরনের কাজের প্রতি একাডেমি যে বিশেষ মনোযোগ দেবেন সেকথা পূর্বেই বলেছি। ভালই, কারণ পশ্চিমবঙ্গের লেখকেরা যথেষ্ট আরবি-ফারসি জানেন না বলে মুকুন্দরাম-ভারতচন্দ্রের আরবি-ফারসি-ভর্তি অংশগুলোর টীকাটিপ্পনী কর্মটি পর্যন্ত এড়িয়ে যান– এ কাজ বিশেষ করে পূর্ব বাঙলাতেই ভালো হবে।
চৌধুরী শামসুর রহমান সায়েবেরআমাদের সাংবাদিক প্রচেষ্টা তথ্যবহুল প্রবন্ধ অশেষ পরিশ্রমের পরিপূর্ণ সাফল্য।
মধুরেণ সমাপয়েৎ করেছেন একাডেমির সুযোগ্য সম্পাদক ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক মধ্যযুগীয় বাঙলা সাহিত্যের একমাত্র মুসলিম মহিলা কবিরহীমুননিসা প্রবন্ধ দিয়ে। ১৭৬৩-১৮০০-র মধ্যবর্তী কালের এই মহিলা কবি সরস স্বাভাবিক বাঙলায় যে কাব্যসৃষ্টি করে গিয়েছেন তার বিস্তৃত আলোচনা করেছেন হক সাহেব–ভবিষ্যতে আরও হবে সে আশা রাখি। উপস্থিত দু একটি উদাহরণ পেশ করছি। স্বামীর আদেশে তিনি সৈয়দ আলাওলেরপদ্মাবতী নকল করে দেন; সেই সম্পর্কে বলেন–
শুন গুণিগণ হই এক মন
লেখিকার নিবেদন।
অক্ষর পড়িলে
টুটাপদ হৈলে
শুধরিতা সর্বজন ॥
পদ এই রাষ্ট্র হেন মহাকষ্ট
পুঁথি সতী পদ্মাবতী।
আলাওল মণি বুদ্ধি বলে গুণী
বিরচিল এ ভারতী ॥
পদে উকতি বুঝি কি শকতি
মুই হীন তিরী জাতি।
স্বামীর আদেশ মানিয়া বিশেষ
সাহস করিনু গাঁথি ॥
রহীমুন্নিসার পিতামহ ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে চট্টগ্রামে অজ্ঞাতবাস বরণ করেন :
অগ্রগামী হৈয়া ইংরাজ যুদ্ধ দিল।
দৈবদশা ফিরিঙ্গীর বিজয় হইল ॥
মুখ্য মুখ্য সবের বহুল রত্নধন।
লুটিয়া করিল খয় যত পাপিগণ ॥
