একাডেমীতে থাকবে (অ) গবেষণা বিভাগ : তার দুটি শাখা– (১) বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস, (২) পাণ্ডুলিপি তথা লোকগাথা লোকসঙ্গীত ইত্যাদির সংগ্রহ ও প্রকাশ। (আ) অনুবাদ বিভাগ (ই) সংকলন ও প্রকাশনা-বিভাগ, (ঈ) সাংস্কৃতিক বিভাগ পাঠাগার, সাহিত্য-সভা, পুরস্কার বিতরণ ইত্যাদি।
বক্ষ্যমাণ সংখ্যা বাঙলা-একাডেমী* পত্রিকার প্রথম সংখ্যা।
[*একাডেমীর ইংরেজি উচ্চারণই যখন নেওয়া হয়েছে তখন একাডেমি লিখলেই বোধহয় ভালো হত; কারণ ইংরেজিতে মি হ্রস্ব।]
পত্রিকায় ন টি তথ্য ও তত্ত্ব সম্বলিত মূল্যবান প্রবন্ধ রয়েছে মাত্র একটি ছাড়া আর সবকটি প্রবন্ধই একাডেমির সাহিত্যসভায় পড়া হয়েছিল।
প্রথম প্রবন্ধটি উভয় বাঙলায় সুবিখ্যাত পণ্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সায়েবের রচনা– এ প্রবন্ধে তিনি পণ্ডিত রেয়াজ অল্ দিন আহমদ মাশহাদি নামক একজন বাঙালি লেখকের সমাজ ও সংস্কারক নামক পুস্তকখানির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। তার প্রয়োজনও বিলক্ষণ ছিল, কারণ ১২৯৬ সালে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ সরকার পুস্তকখানি বাজেয়াপ্ত করেন। কেন করেছিলেন সেটা পুস্তকের উদ্ধৃতি থেকেই পরিষ্কার বোঝা যায়। রেয়াজ অল্-দিন রাজনৈতিক নেতা জমাউদ্দীন আফগানির ন্যায় ইংরেজের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন সৃষ্টি করে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার প্রয়াসী ছিলেন। এই প্রচেষ্টা করতে গিয়ে রেয়াজ অল্-দিন হৃদয়ঙ্গম করেন যে একদল হিন্দু যেরকম অন্ধভাবে বিশ্বাস করেন সবকিছু আমাদের শাস্ত্রেই আছে, ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানে এমন কিছু নেই যা আমাদের মুনি-ঋষিরা জানতেন না ঠিক সেইরকম বেশিরভাগ মুসলমানই বিশ্বাস করেন যে, আরবির মাধ্যমে তাঁরা যে আরবি-ইরানি আভিচেন্না আভেরস এবং গ্রিক প্রাতো-আরিস্টটলের দর্শন-বিজ্ঞান ৮০০/১০০০ বৎসর পূর্বে আয়ত্ত করেছিলেন উনবিংশ শতাব্দীতেও সে-ই যথেষ্ট, নতুন কিছু শেখবার নেই। এ বিতর্কের সঙ্গে বাঙলা সাহিত্যের তেমন কোনও আন্তরিক সম্পর্ক নেই, কিন্তু রেয়াজ অল-দিন সেদিন তার পর্যবেক্ষণ, মনোবেদনা ও পথনিদর্শন যে-ভাষায় প্রকাশ করেছেন সেটি তার গভীর পাণ্ডিত্য ও একাধিক ভাষার সঙ্গে তাঁর দৃঢ় যোগসূত্রের পরিচয় দেয়।
হিজরি দ্বিতীয়াদি শতাব্দীতে মোসলমান পণ্ডিতেরা যে সমস্ত দর্শন-বিজ্ঞান-গণিতবিষয়ক গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছেন, ইদানীন্তন শাস্ত্রকোবিদগণও সম্পূর্ণরূপে তাহারই অনুবর্তন করেন। বিশেষ যাঁহাদিগের রচনাশক্তি ও কল্পনাশক্তি সমধিক তেজস্বিনী, তাহারা সেই কীট নিষ্কষিত প্রাচীনতম শাস্ত্রের ব্যাখ্যা বিবৃতি প্রকৃতি লিখিয়া আপনাদের গৌরব বৃদ্ধি করিয়া থাকেন। তাঁহাদের বিবেচনা অনুসারে বর্তমান চিন্তা ও নবাবিষ্কৃত সমস্তই ভ্রমপ্রদানের আশ্রয় ও অকিঞ্চিৎকর; কেবল প্রাচীন পণ্ডিতগণের মতের ধ্বংসাবশেষ দ্বারা পৃথিবী এখনও চলিতেছে; অনুবীক্ষণ, দূরবীক্ষণ, লৌহবর্ক্স, তড়িতবার্তাবহ, তাপমান, বাতমান প্রভৃতি লোকসমাজের আবশ্যক ও বিজ্ঞানের নবাবিষ্কৃত সত্যাদি সমুদায়ই হিন্দুদিগের বিশ্বকর্মার ন্যায় মুসলমানদের লোমান-হাকিমের চর্বিত-চর্বণ মাত্র। এ সমস্তকে কল্পতরুরূপী বর্তমান বিজ্ঞান-বৃক্ষের অভিনব বিষ-অমৃত-ফল তাহা মুসলমান অর্ধশিক্ষিত লোকেরা কিছুতেই বিশ্বাস করিতে পারে না, তাঁহারা আরস্তু (আরিস্টটল), আফলাতুন্ (প্লেটো) প্রভৃতির প্রাচীন জীর্ণ মতসকল গভীর মনোযোগের সহিত পাঠ করিয়া কৃতার্থ হয়েন বটে, কিন্তু আধুনিক নিউটন, গালিলিয়ো, কেলার, ডারুইন, লাপ্লাস, কটির (কৎ) অতুল প্রতিভার দিকে তাহাদের অণুমাত্রও মনঃসংযোগ নাই। প্রত্যুত একপ্রকার বিদ্বেষ-বুদ্ধি দৃষ্ট হয়। প্রাচীন মোসলমান মহাপণ্ডিতগণ ভারতবর্ষ ও গ্রিসকে আপনাদের শিক্ষাগুরু বলিয়া জগতে অকুণ্ঠিত চিত্তে, মুক্তকণ্ঠে ঘোষণা করিয়া গিয়াছেন, কিন্তু আধুনিক অজ্ঞান মোসলমান শিক্ষিত লোকেরা তাদৃশ্য প্রাধান্যের কথা মুখে আনিতেও লজ্জা বিবেচনা করেন। সুতরাং পৃথিবীর জাতিসাধারণের পরস্পরের মধ্যে বিজ্ঞান ও বুদ্ধির আদান-প্রদানে যে কুশল ও কল্যাণ সম্ভব, মোসলমানেরা তাহা লইতে সম্পূর্ণ বিদূরিত রহিয়াছেন। কিন্তু যাহা সত্য তাহা নিউটনের সত্য, কোপার্নিকস বা আর্যভট্টের সত্য বা আবু আলি সিনার (আভিচেন্না) সত্য নহে, তাহাতে প্রত্যেক বিশ্ববাসীরই তুল্য অধিকার!
মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি মুসলমানদের ঔদাসীন্য দেখে রেয়াজ অল দিন যে কতদূর মর্মাহত হয়েছিলেন এবং কী অকুণ্ঠ ভাষায় তার প্রকাশ দিয়েছিলেন নিম্নে তার উদাহরণ দিই;–
যাহারা এসলাম গ্রহণ পূর্বক মোসলমান নামে বিখ্যাত হয়েন, তাঁহাদের গভীর প্রেম, স্বপ্ন, স্নেহ ও স্বদেশবাৎসল্য সম্পূর্ণরূপে তিরোহিত হইয়া যায়, কেবল তৎসমুদায়ের স্থানে এক সামান্যরূপে সাম্প্রদায়িক সহানুভূতির সঞ্চার দৃষ্ট হয়। সুতরাং তাহাদের হস্ত সকলের বিরুদ্ধে এবং সকলের হস্ত তাঁহাদের বিরুদ্ধে সম্মুখিত হইয়াছে। মাতৃভূমি ও জন্মভূমি ঘটিত ভাষার প্রতি তাঁহাদের মমতাজ্ঞান নাই; প্রত্যুত তৎসমস্ত পরদেশ ও পরভাষা বলিয়া অবিরত উপেক্ষিত হইতেছে। তাহাদের স্বদেশও নিজ ভাষা বলিয়া অপর কোনও পৃথক বস্তু দৃষ্ট হয় না, অথবা তাহারা অখিল মোসলমান সমাজ ও ধর্মকে এক ভাষার অধীনে স্থাপন করিতে উদ্যত।
