আমাদের ভয় হয়েছিল পূর্ববঙ্গ পাছে বাঙলা ভাষা বর্জন করে উর্দু গ্রহণ করে বসে। সে ভয় কেটে গিয়েছে এবং ঢাকার বাঙলা যে উর্দু হরফে লেখা হবে না, সে খবরটা পেয়েও আমরা আশ্বস্ত হয়েছি।
এইবার ঢাকার পালা নতুন সাহিত্য সৃষ্টি করবার। কলকাতা যে অদ্যকার নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা লাভের ফলে নবীন উৎসাহ, নবীন উদ্দীপনায় নতুন সাহিত্য গড়তে মন দেবে, সে বিষয়ে আমার মনে কোনও সন্দেহ নেই এবং কলকাতার অধিকাংশ সাহিত্যিকই যে পূর্ববঙ্গে আপন পুস্তকের বহুলপ্রচার কামনা করেন, সে বিষয়েও কোনও সন্দেহ নেই।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মনে একটু দ্বিধা রয়ে গিয়েছে পূর্ব বাঙলার ভবিষ্যৎ সাহিত্যের স্বরূপ সম্বন্ধে। কেউ কেউ ভাবছেন পুব-বাঙলা হয়তো এমন সব শব্দ বাক্যবিন্যাস আরবি-ফারসি থেকে গ্রহণ করতে আরম্ভ করবে যে, কালে কলকাতার লোক ঢাকায় প্রকাশিত বাংলা বই পড়ে বুঝতে পারবে না। তাদের এ ভয় দূর করে দেবার জন্যই আজ আমার এ প্রবন্ধ লেখা– যাতে করে পশ্চিমবঙ্গবাসীর স্বাধীনতা লাভের আনন্দ আজ সর্বপ্রকার দ্বিধাবর্জিত নিরঙ্কুশ হয়।
ইচ্ছে করলেই যে কোনও ভাষা থেকে জাহাজ-বোঝাই শব্দ গ্রহণ করা যায় না। দৃষ্টান্তস্থলে আজকের দিনের বাঙলা ভাষাই নিন। এ ভাষা যে শব্দ সম্পদে কত দীন, সেকথা যারা অর্থনীতি, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য নতুন চিন্তা নিয়ে বাঙলায় কারবার করেন তারাই জানেন এবং তাদের অধিকাংশই ইংরেজি থেকে ঝুড়ি ঝুড়ি শব্দ গ্রহণ করতে পারলে বহু মুশকিল, বহু গর্দিশ থেকে বেঁচে যেতেন। কিন্তু উপায় নেই তারা বিলক্ষণ জানেন, ইংরেজি-অনভিজ্ঞ যে পাঠকের জন্য তাঁরা বই লিখতে যাচ্ছেন, তারাই সে বই বুঝতে পারবে না। তা হলে আর লাভটা কী হল?
পুব-বাঙলায় তার চেয়েও বড় বাধা এই যে, গাদা গাদা আরবি-ফারসি শব্দ ঢোকাবার মতো উমদা আরবি-ফারসি এবং বাঙলা জানেন কয়টি গুণী? ড. শহীদুল্লাহ তো একজন।
এবং বঙ্গবিভাগের পরও তিনি বেধড়ক, বেদরদ আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগ করেননি। যদি করেনও, বুঝবে কটা লোক? এন্তার আরবি-ফারসি মেশানো বাঙলা বোঝার মতো এলেম পূর্ব-বাঙালির এবং আপনার-আমার পেটে তো নেই। আর যদি বলেন ভবিষ্যতে একদিন পূর্ব বাঙলার জনসাধারণ, চাষাভূষো সব্বাই উত্তম আরবি-ফারসি শিখে যাবে আর হুশ হুশ করে আরবি-ফারসির বগহারে রান্না বাঙলা ভাষা বুঝে ফেলতে পারবে, তা হলে তো সে আনন্দের কথা। প্রত্যেক ব্যক্তি তিনটি ভাষার (তার একটা আরবির মতো কঠিন ভাষা! বিবেচনা করুন) আলিম-ফাজিল, এত বড় ডাঙর সুখস্বপ্ন পূর্ব-বাঙলার নমস্য ব্যক্তিরাও দেখেন না।
আর যদি বলেন, নজরুল ইসলামের মতো কোনও শক্তিশালী লেখক এসে সেই কর্মটি করে দেবেন তবে উত্তরে বলি, একদা পশ্চিম-বাঙলাতেই এবং আরবি-ফারসি অনভিজ্ঞ রসিক সম্প্রদায়ের ভিতরই তাঁর কদর হয়েছিল প্রথম পূর্ব-বাঙলা তাকে আদর করে বহু পরে। আজ যদি ঢাকায় নজরুল ইসলামের মতো কবি জন্মান, তবে কলকাতা তার কেতাব আগেরই মতো উদগ্রীব, স্তম্ভিত-নিঃশ্বাস হয়ে পড়বে। তাতে করে তাবৎ বাঙলা সাহিত্যই শক্তিশালী হবে, শুধু পূর্ব-বাঙলার সাহিত্যই না।
তাই এই আনন্দের দিনে নিবেদন করি, রাজনৈতিকরা উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। ভারতীয় অন্তত বাঙালি সাহিত্যিক যেন সংস্কৃতি-বৈদগ্ধের ভিতর দিয়ে সে শান্তি পরিপূর্ণতায় পৌঁছিয়ে দেয়।
.
‘বাংলা-একাডেমী পত্রিকা’
পূর্ববঙ্গের বাঙলা-একাডেমীর ইতিহাস দিতে গিয়ে একাডেমীর মুখপত্র বলেছেন :
পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলনের সহিত বাংলা-একাডেমীর ইতিহাস অচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। ১৯৪৮ ইংরেজির একেবারেই গোড়ার দিকে বাঙলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতিদানের জন্য যে স্বতঃস্ফূর্ত দাবি দেশের তরুণ ছাত্র-সমাজ হইতে উত্থিত হয়, নানা বাধা-বিঘ্ন উপেক্ষা করিয়া তাহা দৈনন্দিন প্রবলতর ও ব্যাপকতর হইতে থাকে। মাত্র চারি বৎসর পার হইতে না হইতেই, ১৯৫২ ইংরেজিতে আসিয়া এই আন্দোলন চরম বেগ সঞ্চয় করে এবং তাহার ফলে এই সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণে ভাষা-আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণ করা হয়। এই অপ্রত্যাশিত ও অবাঞ্ছিত দুর্ঘটনায় চারিটি ছাত্র নিহত এবং আরও কতিপয় ছাত্র আহত হয়। এই দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই ভাষা-আন্দোলন ছাত্র-সমাজের সীমা উল্লঙ্ঘন করিয়া দেশের সর্বত্র গণআন্দোলনের রূপ গ্রহণ করে।…আন্দোলনটি অচিরেই সরকারের আয়ত্তের বাহিরে চলিয়া যায়। এইভাবে ১৯৫৩ সাল কাটিয়া গেলে পর, ১৯৫৪ সালে দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবার জন্য জনাব মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সাহেবের নেতৃত্বে আওয়ামী-মুসলিম-লীগ যে একুশ দফা কর্মসূচি লইয়া আগাইয়া আসেন, বাঙলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে স্বীকৃতি দিয়া বর্ধমান হাউসে একটি বাঙলা-একাডেমী স্থাপনের পরিকল্পনাও ছিল তাহার মধ্যে অন্যতম।… নূতন যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে ১৯৫৫ ইংরেজির ৩ ডিসেম্বর একুশ দফার রূপায়ণরূপে ইহার অন্যতম দফা বাংলা-একাডেমীর উদ্বোধন কার্য বর্ধমান হাউসে সুসম্পন্ন করা হয়।
