কিন্তু তাই বলে একথা বলা চলে না যে, দেশের দারিদ্র্য না ঘোচা পর্যন্ত সংস্কৃতির বৈদগ্ধ্যের ক্ষেত্রে আমাদের বীজ পেতার প্রয়োজন নেই, ফসল ফলাবার তৃরা নেই। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক এই তিন প্রচেষ্টাই একই সঙ্গে চালাতে হয়– অবস্থার তারতম্যে বিশেষ জোর দেওয়া বিশেষ কোনও অঙ্গে, এইমাত্র।
ভারত এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যে বিকট রুদ্র রূপ নেবে না, সে সম্বন্ধে আশ্বস্ত হওয়ার পরও প্রশ্ন থেকে যায় সংস্কৃতির দিক দিয়ে এই দুই রাষ্ট্রের যোগাযোগ থাকবে কি থাকবে না, এবং যদি থাকে তবে সেটি কী প্রকারের হবে।
একটা দৃষ্টান্ত পেশ করি। সকলেই জানেন, প্যালেস্টাইনের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ট্রান্সজর্ডান এবং তার প্রতিবেশী সউদি আরব যে প্যালেস্টাইনের আরবকে ইহুদি অত্যাচারের বিরুদ্ধে কোনও সাহায্য করতে পারল না, তার প্রধান কারণ আমির আবদুল্লা ও ইবনে সউদের শত্রুতা। আমির আবদুল্লার ভয় ছিল যে তিনি যদি সর্বশক্তি নিয়ে প্যালেস্টাইন আক্রমণ করতে পারেন, আবদুল্লার পক্ষে উভয় রণাঙ্গনে যুদ্ধ করা অসম্ভব হবে– হিটলারও পারেননি এবং ফলে তার দুই কূলই যাবে।
কিন্তু তাই বলে ট্রান্সজর্ডান ও সউদি আরবের কৃষ্টিগত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। কাবাশরিফের চতুর্দিকে ধর্ম সম্বন্ধে আরব তথা অন্য দেশবাসী শেখরা প্রতিদিন যে বক্তৃতা দেন, সেগুলোতে ট্রান্সজর্ডানের অধিবাসীরা আগেরই মতো হাজিরা দিয়েছে এবং আম্মানে লেখা কেতাব মক্কাতে পূর্বেরই ন্যায় সম্মান পেয়েছে। শুধু তাই নয়, মক্কা এবং আম্মান উভয় শহরের বিদ্যার্থীরাই কাইরোর আজহরে গিয়ে আগেরই মতো পড়াশোনা করেছে। ইবনে সউদ মক্কা দখল করার পর বহু বৎসর পর্যন্ত মিশর-মক্কায় মনোমালিন্য ছিল– এমনকি মিশর থেকে কাবাশরিফের বাৎসরিক গালিচা আসা পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাই বলে আজহর বিশ্ববিদ্যালয়ের মক্কা-মদনওয়ি ছাত্রাবাস বন্ধ হয়ে যায়নি কিংবা ছাত্রেরও অপ্রাচুর্য হয়নি– মিশরে ছাপা ইমাম আবু হনিফার ফিকার কিতাব আগেরই মতো মক্কার বাজারে বিক্রয় হয়েছে।
আরব-ভূমি আজ কত ভিন্ন ভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত, তবু যখন আজহরে পড়তুম, সব রাষ্ট্রের ছেলেদের সঙ্গেই আলাপ-পরিচয় হয়েছে, তাদের আপন আপন হস্টেলে গিয়েছি, সকলে মিলে বাজার থেকে মুরগি কিনে এনে হৈ-হুল্লোড় করে রান্না করে খেয়েছি। বিশ্বাস করবেন না, রান্নার সর্দার ছিল মালদ্বীপের একটি ছেলে মালদ্বীপ কোথায়, সেকথাই বহু ছাত্র জানত না।
এইবার গোটা দুই ইউরোপীয় উদাহরণ পেশ করি। ভাষা এবং কৃষ্টির দিক দিয়ে দেখতে গেলে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বাংশ পড়েছে সুইটজারল্যান্ডের ভিতর। উত্তরাংশের খানিকটা পড়েছে লুসুমবুর্গের ভিতর এবং আরও খানিকটা বেলজিয়ামের ভিতর। এসব দেশের লোকেরা আপন আপন রাষ্ট্রের প্রতি সর্বান্তকরণে আনুগত্য স্বীকার করে ফ্রান্সও কখনও বলে না, এসব ফরাসি-ভাষী ভূখণ্ডগুলো লড়াই করে দখল করব। অথচ কৃষ্টিগত আদান-প্রদান এই তিন ভূমিতে হামেশাই চলেছে। প্যারিসে আঁদ্রে জিদের বই যেদিন বেরোয় ঠিক সেইদিনই সে বই জিনিভা, লুসুমবুর্গ এবং ব্রাসেলসে কিনতে পাওয়া যায়। জিনিভার বড় প্রকাশকরা প্যারিসে ব্রাঞ্চ রাখে, ব্রাসেলুসে প্রকাশকরা জিনিভায় আপন শাখা খুলতে পারলে খুশি হয়।
কিন্তু ঢাকার সাহিত্যামোদী এবং প্রকাশক হয়তো বলবেন, আমরা কলকাতার ধামাধরা হয়ে থাকতে চাইনে, কাজেই এ উদাহরণটা আমাদের মনঃপূত হল না।
উত্তরে ভিয়েনা-বার্লিনের দৃষ্টান্ত পেশ করব। দুই শহর দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী। কেউ কারও চেয়ে কম নয় এবং এককালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির (মায় যুগোশ্লাভিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া) প্রতাপ জর্মনির চেয়ে কিছুমাত্র কম ছিল না। দু শহরের লোকই জর্মন বলে, জর্মন থিয়েটার দেখে, জর্মন অপেরা শোনে। ভিয়েনাতে কোনও নাট্য-সমঝদারের সাবাসি পেলে সঙ্গে সঙ্গেই নাট্যকার, অভিনেতা এবং নর্তক-নর্তকীদের নিমন্ত্রণ হয় বার্লিনে বার্লিনে কোনও লেখক নাম করতে পারলে ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি তাঁকে অনারারি ডক্টরেট দেয়।
এই দু শহরের দুশমনি-বর্জিত আড়াআড়িতেই বিরাট জর্মন সাহিত্য গড়ে উঠেছে, জর্মন সঙ্গীত বলতে একথা কেউ শুধায় না মৎসার্ট, স্ট্রাউসের জন্ম কোথায় হয়েছিল এবং একথা সকলেই জানে যে সঙ্গীতসম্রাট বেটোফেনের জন্ম হয় বন (উপস্থিত পশ্চিম জর্মনির রাজধানী) শহরে এবং জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাটান ভিয়েনাতে।
বাঙলা ভূমিতে ফিরে আসি।
বাঙলার বিদগ্ধ সাহিত্যের চর্চা আরম্ভ হয় প্রায় দেড়শো বৎসর পূর্বে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতাকে কেন্দ্র করে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ (এমনকি শরৎচন্দ্র পর্যন্ত), প্রমথ চৌধুরী, নজরুল ইসলাম এঁরা সবাই জীবনের অধিকাংশ ভাগ কাটিয়েছেন কলকাতায়। বাঙলা সাহিত্য (গদ্যসাহিত্য তো বটেই) রাজধানীর সাহিত্য কম্যুনিস্টরা এই সাহিত্যকেই গালাগাল দিয়ে বলেন বুর্জোয়া সাহিত্য– যদিও আমাদের কর্ণে এ গালাগাল বংশীধ্বনির ন্যায় শোনায়।
মাত্র সেদিন পুব-বাঙলার লোক সাহিত্যের আসরে নামলেন। বুদ্ধদেব, অচিন্ত্য, মানিককে কিন্তু বাধ্য হয়ে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হয়েছে। ঢাকা যে সাহিত্যের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি, তার প্রধান কারণ ঢাকা কখনও কলকাতার মতো তামাম ভারত এবং বাঙলার রাজধানী হয়ে উঠতে পারেনি।
