বয়তউল-মুকদ্দসের (জেরুজালেমের) মনিসিপ্যালিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। তাহাতে যোগদান করিলে আরবদের অনেক ছোটখাটো সুবিধা হয়, কিন্তু তৎসত্ত্বেও যখনই তাঁহারা দেখিতে পান ক্ষুদ্র সহযোগের দ্বারা তাঁহাদের বৃহত্তর স্বার্থ স্বাধীনতা লাভের প্রচেষ্টা ব্যাহত হইতেছে, তখনই তদ্দণ্ডেই তাঁহারা বড়লাটি দণ্ডকে হাতে লওয়া পণ্ডশ্রম মনে করেন। অসহিষ্ণু মহা-মুফতি তো ফ্যাসিস্ট দলেই যোগদান করিলেন। কিছুদিন হইল খবর আসিয়াছে, আরবরা মুকদ্দসে মনিসিপ্যালিটি বয়কট করাতে সরকার ছয়জন সিভিল কর্মচারী নিযুক্ত করিয়াছেন।
ফলস্তিনদের বাঙাল রাগ। বিশেষ অপবিত্র তরল দ্রব্য দ্বারা বরঞ্চ চিড়া ভিজায় তবু জল ব্যবহার করে না।
লেবানন সিরিয়া ফরাসিকে তাড়াইবার জন্য ইংরাজের সাহায্য লইতে পরাজুখ হয় নাই। ভালো করিতেছে কি মন্দ করিতেছে ফরাসিকে তাড়ানোর কথা হইতেছে, না ইংরেজের সাহায্য লওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করিতেছে– আল্লাই জানেন। কন্টক দিয়া কণ্টক উৎপাটিত করা হইতেছে সন্দেহ নাই, কিন্তু শেষের কন্টক যেন মুষল হইয়া বাহির না হয়। তখন যদুকুল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
তবু যেন কেহ মনে না করেন যে, লেবানন-সিরিয়া আজাদ-জিন্নার ব্যবহারে উষ্ণ হইয়া গোস্সা প্রকাশ করিবে। নিজেরাই তাহারা ফরাসি যষ্টি বারম্বার প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। নীতি একই।
ইরাক ক্ষাত্রভেজে বলীয়ান। সেখানে সামাজ্যবাদীদের ডাল বেশিদিন গলিবে না। গত যুদ্ধের পর তাহারাই সর্বপ্রথম সাম্রাজ্যবাদীদের অর্ধচন্দ্ৰ দিয়াছিল। ইরাকেও অসহিষ্ণু নেতার অভাব ছিল না, এখনও নাই।
হে মাতঃ মুক্তি দাও যাহাতে রোরুদ্যমান হইয়া প্রাণরক্ষা করিতে পারি– হেন ক্রন্দনধ্বনি ইরাকের ক্রন্দসী হইতে উত্থিত হইতেছে।
ইরানের স্নেহজাতীয় পদার্থের প্রতি সকলেরই লোভ। রুশ সপত্নও হুঙ্কারধ্বনি ছাড়িতেছেন। যে রুশ একদিন মহৎ আদর্শে অনুপ্রাণিত হইয়া উত্তর ইরানের স্বাধিকার ত্যাগ করিয়াছিল, সেই রুশই আজ ইরানের তেল চায়– কারণ তৈল একা আসে না। ঘৃত লবণ তৈলতণ্ডুল বস্ত্র ইন্ধন একসঙ্গে যায়। আজরবাইজানের প্রতি রুশের লোভ নাই একথা এত জোরে বলা হইতেছে যে, আমরা শেক্সপিয়রি ভাষায় বলি –মহারাজ, মহিলা বড় বেশি প্রতিবাদ করিতেছে। রুশিয়া যে ইরানের প্রতি রুষিয়াছেন তাহাতে কোনও বাতুল সন্দেহ করিবে না। কিন্তু কহি তবু তো ইরানের ইংরেজ-প্রেম সঞ্চারিত হইতেছে না। ইরান ঘ্যান ঘ্যান প্যান প্যান করিয়া অস্থির করিয়া তুলিল, হে কর্তারা, যুদ্ধ তো শেষ হইয়াছে, তবে পূর্ব প্রতিশ্রুতিমতো বিদায় লইতেছ না কেন? তোমাদের জন্য আতর সঞ্চিত করিয়া রাখিয়াছি, আর কেন, আমাদের অনেক শিক্ষা হইয়াছে। কিন্তু মুজঃফর (বিজয়ী) নগরের কম্বল ছাড়িবে কেন?
শুনিয়াছি ইরানে নাকি ভারতীয় সৈন্য আছে; যদি থাকে তবে বড় ভাগ্য মনে গণি যে, ইহাদের কপালে বিজয়তিলক কংগ্রেস-লীগ অঙ্কন করেন নাই। লাঞ্ছন শ্বেত-গৈরিক-শ্যাম নহে।
আফিগানিস্তান সম্বন্ধে আলোচনা নিতান্তই নিষ্প্রয়োজন। আমি সমরশাস্ত্রে নিতান্তই মূর্খ, সংখ্যাতত্ত্বে ততোধিক। যত আফগানযুদ্ধ হইয়াছে তাহাতে কী পরিমাণ গোরা, কী পরিমাণ পাঠান-গুর্খা-শিখ-মারাঠা ছিল জানি না।
আফগানিস্তানের ব্রিটিশ প্রীতি সম্বন্ধে শুধু এইটুকু বলিতে পারি যে, আমি যখন কাবুলে ছিলাম তখন সমগ্র আফগানিস্তানে মাত্র কজন ইংরেজ ছিলেন এবং সকলেই ব্রিটিশ রাজদূতাবাসের কর্মচারী। আফগানিস্তানের স্কুল-কলেজে তখন ফরাসি পড়াইতেন ফরাসি গুরুরা, জর্মন পড়াইতেন জর্মন গুরুরা, কিন্তু ইংরেজি পড়াইতেন ভারতবাসীরা। আমি যখন শিক্ষামন্ত্রীকে বলিয়াছিলাম যে ইংরেজের প্রয়োজন, তা না হইলে ছাত্রদের উচ্চারণ ভালো হইবে না, তিনি মৃদু হাস্যসহকারে বলিয়াছিলেন, কুরান তো আর ইংরেজি ভাষায় লেখা হয় নাই যে উরুশ্চারণের জন্য সায়েবদের মেলা তকলিফ দিয়া এই পাণ্ডববর্জিত দেশে আনিতে হইবে।
ইংরেজ তখন রুশিয়ার পাসপোর্ট বরঞ্চ পাইত, কিন্তু আফগানিস্তান! বরঞ্চ পঞ্চম মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করিতে পাইত, কিন্তু ইংরেজ লান্ডিকোটালের ওই পারে পা দিতে গেলে নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইত।
ইংরেজ-রুশে বন্ধুত্ব হওয়ায় আফগানিস্তান মহা বিপদে পড়িয়াছে। হায় জলালাবাদ হায়, মজার-ই-শরিফ!
বড়লাটি লাঠি আমরা হাতে লইলে বেচারি পাঠানদের দুইখানা লাঠির খর্চার ধাক্কায় পড়িতে হইবে। সে কি উত্তম প্রস্তাব? কাবুলিদের ভদ্রতা-বোধ কম। ভারতবাসীদের তাহারা গোলাম বলে। গোলামের হাতে কি লাঠি শোভে? লাঠি বাজিবে না।
হাইলে সেলাসি সাম্রাজ্যবাদীদের অনুনয় করিয়া বলিয়াছেন, তাহারা যেন দয়া করিয়া আর আদিস-আব্বাবার মতো বর্বর শহরে থাকিয়া বিস্তর কষ্টভোগ না করেন। ইতালীয়রা হাবশিদের যথেষ্ট সভ্য করিয়া গিয়াছে, ওইটুকুতেই তাহাদের কাজ চলিবে। সাম্রাজ্যবাদীরা নাকি তথাপিশ্বেতভদ্রভার নামাইতে পারিতেছেন না। হাবশিদের হৃদয়ও অত্যন্ত কৃষ্ণবর্ণ, সহযোগ যষ্টি লইবার জন্য হস্তোত্তলন করিতেছে না।
তুর্কিরা অবশ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাসীদের দিলিদোস্ত! কারণ কোন মূর্খ বলিবে যে, তুর্কি জর্মনির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা না করিলে জর্মনি পরাজিত হইত। সে যুদ্ধে কী পরিমাণে লোকক্ষয়, বলক্ষয় হইয়াছে তাহা এখনও প্রকাশিত হয় নাই তবে আশা করিতে পারি ভারতবর্ষে যত পরাজিত জাপানি সমরবন্দি আছে, তুর্কিতে তাহা অপেক্ষা বেশি জর্মন বন্দি আছে। তবে সব সময়েই কি আরফলেন পরিচিয়তে। বরঞ্চমা ফলেষু এইক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তৎসত্ত্বেও হায় রে তুর্কি, তোমার দার্দানেলেজ যে যায়-যায়। মিত্রশক্তি যখন তোমাকে অনুনয়-বিনয় করিয়াছিল, তখন তুমি সাম্রাজ্যবাদীর যষ্টি হাতে নাও নাই, এখন তোমার সপ্ত-কৃশ-বৎসরের চক্র। কিন্তু বল তো আলেপ্পো, তোমাকে কে ভেট দিতেছে?
