কিন্তু তুর্কি স্বাধীন। হিজ্জাজের ইবনে সউদ স্বাধীন, যমনের ইমাস ইয়হিয়া স্বাধীন। সাম্রাজ্যবাদীদের সঙ্গে তাঁদের সহযোগিতা-অসহযোগিতা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। ট্রেনসজর্ডানও গুছাইয়া লইয়াছে।
বুঝিতে পারিতেছি পাঠকের ধৈর্যচ্যুতির উপক্রম। আর কাব্যবিন্যাস করিব না। তবে আশা করি এইটুকু বুঝিতে কাহারও অসুবিধা হইবে না যে, বড়লাটি লাঠি ভারতীয়দের হাতে না আসায় দুঃখ করিবার কিছু নাই। কংগ্রেস-লীগ ভিন্ন ভিন্ন কারণে লাঠি নেন নাই বা পান নাই, কিন্তু আর যাহাই হউক, মধ্যপ্রাচ্য সেজন্য তাঁহাদের নিন্দা করিবে না। সাম্রাজ্যবাদীরা করিতেছে, তাহাতেই মনে হয় ভালো কর্মই করিয়াছি। আল্লা মেহেরবান, আমাদের অজানাতেই হয়তো আমাদিগকে শুভবুদ্ধি দিয়াছেন।
.
যুবরাজ-রাজা-কাহিনীর পটভূমি
তুলনাত্মক শব্দতত্ত যেরূপ কোনও এক শুভদিনে আপাদমস্তক নির্মিত হয়নি ঠিক সেইরূপ তুলনাত্মক ধর্মতত্ত্ব হঠাৎ একদিন জন্মগ্রহণ করেনি। গ্রিক-রোমান ঐতিহাসিকরা যেসব জাতির সংস্পর্শে আসেন, তাঁদের ধর্মের বিবরণও অল্পবিস্তর দিয়েছেন। বলা বাহুল্য এসব বিবরণের অধিকাংশই পক্ষপাতদুষ্ট। আর এদের ভিতর যারা নাস্তিক ছিলেন তারা নানা ধর্মের বিবরণ দেবার সময় সবকটাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছেন, নিজেরটাকেও ব্যত্যয় দেননি, অর্থাৎ প্রতিচ্ছবির স্থলে কেরিকেচার এঁকেছেন। তথাপি যে পদ্ধতির গ্রন্থই হোক না কেন, এগুলোকে বাদ দিয়ে কোনও বিশেষ ধর্মের বা একাধিক ধর্মের ইতিহাস রচনা করা অসম্ভব, এবং বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস রচিত না হওয়া পর্যন্ত তুলনাত্মক ধর্মশাস্ত্রের গোড়াপত্তনও অসম্ভব।
খ্রিস্টধর্মের প্রচার ও প্রসার হওয়ার ফলে গ্রিক, রোমান তথা ইউরোপীয় অন্যান্য ধর্ম লোপ পায়। শুধু তাই নয়, ভিন্ন ধর্মের বিবরণ লেখার ঐতিহ্য কয়েক শতাব্দী ধরে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা হয়। আজ যারা জানতে চান, গ্রিক, রোমান, টুটনদের ধর্ম প্রাথমিক খ্রিস্টধর্মের ওপর কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল তাঁদের তন্ন তন্ন করে গ্রিক ও রোমানদের সর্বপ্রকারের রচনা পড়তে হয় এবং সেখান থেকে যেসব তথ্য সংগ্রহ করেন সেগুলোর সন্ধান নিতে হয় প্রাথমিক খ্রিস্টধর্মের কোন কোন আচার অনুষ্ঠানে এরা নির্বিঘ্নে অনুপ্রবেশ করেছে, কিংবা খ্রিস্ট ধর্মগ্রন্থের অনুশাসন উপেক্ষা করে নবদীক্ষিত খ্রিস্টানগণ নিজেদের প্রাক খ্রিস্টীয় আচার অনুষ্ঠান নতুন ধর্মে কীভাবে এবং ইউরোপের কোন কোন জায়গায় প্রবর্তন তথা সংমিশ্রণ করেছে– এইসব তাবৎ তথ্য প্রভূত পরিশ্রম তথা গভীর গবেষণা দ্বারা সঞ্চয় করে তবে খ্রিস্টধর্মের সম্পূর্ণ ইতিহাস লেখা সম্ভব। আজ যেরকম ভারতীয় চার্বাক প্রভৃতির লোকায়ত দর্শন পুনর্নির্মাণ করা অতিশয় সুকঠিন কর্ম।
সপ্তম শতাব্দীতে নবজাত ইসলামের সঙ্গে খ্রিস্টধর্মের সংঘর্ষের ফলে একে অন্যের ধর্মের বিরুদ্ধে রূঢ়তম কুৎসা প্রচার করতে আরম্ভ করলেন। কিন্তু মুসলমানদের বাধ্য হয়ে অনেকখানি সংযত ভাষা ব্যবহার করতে হল কারণ পবিত্র কুরানে খ্রিস্টকে আল্লার প্রেরিত-পুরুষ বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, ক্রুসেডের নৃশংস যুদ্ধ সত্ত্বেও দুই ধর্মের গুণীজ্ঞানী একে অন্যের বিজ্ঞান, দর্শন ও ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। আরবরা ব্যাপকভাবে গ্রিক দর্শন পদার্থবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র আরবিতে অনুবাদ করলেন ও পরবর্তীকালে আরব দর্শনশাস্ত্রের লাতিন অনুবাদ ইউরোপে প্রচার ও প্রসার লাভ করল। এবং এস্থলে বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে আরব (ও পরবর্তীকালে ইরানের) সুফিপন্থা (ভক্তিবাদ ও রাজযোগের সমন্বয়) খ্রিস্টীয় মিস্টিজিম বা রহস্যবাদের সঙ্গে বারম্বার নিবিড় সংস্পর্শে এল এবং ফলে একে অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারিত করল। কোনও কোনও ইউরোপীয় পণ্ডিত বিশ্বাস করেন, ইতোমধ্যে ভারতীয় রহস্যবাদ আরব সুফিতত্ত্বকে প্রভাবান্বিত করেছিল।
এস্থলে স্পেনবাসী আরব ধর্মপণ্ডিত ইবন্ হজম-এর উল্লেখ করতে হয়। তিনি ইহুদি, খ্রিস্ট ও ইসলাম নিয়ে অতি গভীর আলোচনা করেন, কিন্তু পুস্তকখানা যদিও বহু বহু স্থলে অমূল্য রত্ন ধারণ করে, তবু পূর্ণ পুস্তক পক্ষপাতদুষ্ট। ইবন্ হজমের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সপ্রমাণ করা : ইসলাম সর্বোৎকৃষ্ট ধর্ম এবং শুধু তাই নয়, ইসলামের যে শতাধিক শাখা-প্রশাখা বহুবিধ সেকট, স্কুলস আছে, তার মধ্যে তিনি নিজের যেটিতে জন্মগ্রহণ করেন সেইটিই সর্বোৎকৃষ্ট বটে ও সর্বগ্রাহ্য হওয়া উচিত।
এক হাজার বছর পূর্বেকার গজনির বাদশাহ মাহমুদের সভাপতি আলবিরুনির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য– যদিও তিনি মূলত তাঁর ভারতের বিবরণ গ্রন্থে হিন্দুধর্ম, তার নানা শাখা-প্রশাখা, আচার-অনুষ্ঠান, কুসংস্কার, কিংবদন্তির বয়ান দিয়েছেন এবং যেহেতু ভারতীয় ধর্ম মাত্রই কোনও না কোনও দর্শনের দৃঢ়ভূমির ওপর নির্মিত, তিনি তাঁর প্রামাণিক গ্রন্থে ভারতীয় দর্শন সাতিশয় নৈপুণ্যসহ বিশ্লেষণ করেছেন। এবং স্থলে স্থলে ইসলামের সঙ্গে তুলনাও করেছেন। প্রতিমানাশক, কট্টরতম মুসলমান মাহমুদের সভাপণ্ডিত কোনও স্থলে হিন্দু ধর্মের বিশেষ কোনও মতবাদ বা আচারের প্রতি দৈবাৎ সহানুভূতি প্রকাশ করলে সেটা যে তার স্বাস্থ্যের পক্ষে সাতিশয় উপকারী হত না সেটা তো সে যুগের রাজ-জুহ্লাদ ভিন্ন অন্যজনও নিঃসঙ্কোচে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারত। তৎসত্ত্বেও পরম আশ্চর্যের বিষয় তিনি ইসলামের প্রতি সরল অনুরাগ প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু ধর্মের প্রশংসনীয় দিকের প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং কোনও কোনও নিন্দনীয় আচারের কারণ দেখিয়েছেন। পাঠক মাত্রই সহজে প্রত্যয় করবেন না, যে-মাহমুদ হিন্দুর প্রতিমা ভঙ্গ করাটা অতিশয় শ্লাঘার বিষয় বলে মনে করতেন তাঁরই সভাপণ্ডিত আভাসে ইঙ্গিতে এবং তুলনার সাহায্যে প্রতিমাপূজার পিছনে যে হেতুটি রয়েছে সেটা যে অত্যন্ত স্বাভাবিক সেটা বুঝিয়ে বলেছেন। এ-স্থলে জরাজীর্ণ স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে সংক্ষেপে সেটি নিবেদন করি : মক্কা গমনে সম্পূর্ণ অসমর্থ অথচ হজ পালন করা যখন তার একমাত্র অবশিষ্ট কাম্য, সেই অর্ধমৃতজনকে যদি কেউ মক্কার একখানা ছবি দেখায় তবে কি তার সর্বাঙ্গ শিহরিত হবে না, অশ্রুজল দুই চক্ষু সিক্ত করবে না, কম্পিত কলেবরে সে হজকামী ছবিখানাকে হয়তো বারম্বার চুম্বন দিতে আরম্ভ করবে এবং হয়তো-বা যুক্তিতর্কের বিধান বিস্মৃত হয়ে সেই অতি সাধারণ জড় কাগজখণ্ডকে অলৌকিক দৈবশক্তির আধার বলে সম্মান প্রদর্শন করতে আরম্ভ করবে! অতএব যে স্থলে কলায় সুনিপুণ শিল্পী বহুমানবের ধারণা সাধনাকে মূয়রূপ দিতে সক্ষম হন, সে-প্রতিমার সম্মুখে কি সাধারণ মানুষ নতজানু হবে না? অবশ্য গোড়াতেই আলবিরুনি প্রতিমাপূজার প্রতি আপন বিরাগ প্রকাশ করেছেন। এস্থলে স্মরণীয় যে অম্মদেশীয় বহু বেদান্তবাগীশ তথা ব্রাহ্মসমাজ প্রতিমা-পূজা সমর্থন করেন না। অন্যান্য অনেকেই এ মার্গকে নিম্নস্তরে স্থান দেন।
