বড়লাটি পরিকল্পনা স্বীকার না করাতে যাঁহারা নিতান্ত মর্মাহত হইয়াছেন, তাহাদের শুধু এইটুকু আমার বলিবার ইচ্ছা যে যাহারা অস্বীকার করিয়াছেন, তাঁহারা সৃষ্টিছাড়া কিছু করেন নাই।
প্রথম ধরুন মিশর। মিশরের ওয়া দল ভারতবর্ষের কংগ্রেস-লীগ অপেক্ষা অনেক বলীয়ান। সে দলকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী যদি কাজে লাগাইতে পারে তবে তাহার যে কত সুবিধা হয়, তাহার খবর ওয়াফ জানে, সাম্রাজ্যবাদীও জানে। ওয়াদ এত ভালো করিয়া জানে যে, যেসব বিভীষণরা সাহায্য করিতে অত্যধিক মাত্রায় প্রস্তুত তাহাদের পরিষ্কার বলিয়া দেয় চাচা যেন আপন প্রাণ বাঁচায়। পাঠকের অজানা নাই যে, কেহ কেহ নিজের প্রাণটা ঠিক রক্ষা করিতে পারে নাই। ইংরেজদের প্রভুত্বহীন মিশরে ওয়া সর্বদাই রাজত্ব করে ও করিতে প্রস্তুত কিন্তু রাজা যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীর ক্রীড়নক হইয়া পড়েন, তখন ওয়া আর সহযোগ করিতে সম্মত হয় না। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ওয়াদকে বলে, তোমরা রাজত্ব চালাইতেছ না কেন? তোমাদের সঙ্গে আমাদের স্বার্থের অনেক মিল, সে কি বুঝিতে পার না। এই ধর না সুয়েজ খাল। তাহার কন্ট্রাক্ট তো প্রায় শেষ হইল, নতুন কন্ট্রাক্টে তোমাদিগকে অনেক কিছু দিতে হইবে, সেজন্য আমরা প্রস্তুত। তোমরা তো এখন আর দুগ্ধপোষ্য শিশু নহ, তোমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার আমরা তো মানিয়া লইয়াছি। তোমরা মুরুব্বি, আইস সুয়েজখাল সম্বন্ধে আলোচনা করা যাউক। হ্যাঁ, আর সেই সুদানের ব্যাপারটা! হ্যাঁ, হ্যাঁ, সুদানও তোমাদের ফিরাইয়া দিতে হইবে বইকি। সে তো আমরা সর্বদাই বলি। তবে কি না কোনও কোনও সুদানি (পাঠকের অবগতির জন্য বলি এইসব সুদানি নুন মুদলেয়ার গোত্রীয়) আপত্তি জানাইয়াছেন, মিটিং করিয়াছেন, ডেপুটেশন ভেজিয়াছেন। সেকথাটাও তো বিবেচনা করিতে হয়। তাই পরিষ্কার কিছু বলিতে পারিতেছি না। আর ছাই বলিবই-বা কাহাকে? তোমরা যদি দেশের রাজ্যশাসনভার গ্রহণ না কর (দিশি ভাষায় বড়লাটি লাঠি গ্রহণ না কর), তবে তোমাদের সঙ্গে আলাপ করিব কী করিয়া, তোমাদের লুকস স্টান্ডি কোথায় (অর্থাৎ মুসলমানি ভাষায় তওবা করিয়া কুফ ইকার কর, বৈদিক ভাষায়, হে ব্রাত্য যজ্ঞোপবীত ধারণ কর)?
আরে আরে, ও শ্যামদাস পালাস কেন? শো-ই না। সেই যে ইংরেজ পল্টন মিশরে বসিয়া আছে। সত্যি ভাই, তাতে মিশরিদের আত্মসম্মানে ঘা লাগে, আমরাও বুঝি। সে বিষয়েও একটা সমঝাওতার বড় প্রয়োজন। আহা কী মুশকিল, পালাচ্ছিস কোথায়?
কিন্তু মুস্তফা নহাজ পাশা ঘুঘু ছেলে। মুখের ভদ্রতা অন্তত উশকুরুকুম (থ্যাঙ্কু) পর্যন্ত না বলিয়া তিনি তুর্কি টুপির ফুন্না উড়াইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে আজহর মসজিদে আশ্রয় লন। এবং নহহাজ্ব পাশার পিছনে থাকে তামাম দেশ– যাহারা থাকে না, তাহাদের বিপদের কথা পূর্বেই সভয়ে পেশ করিয়াছি।
মুস্তফা ও ওয়াদিরা যে কত বড় লোভ সম্বরণ করিয়া সর্বপ্রকার সমঝাওতা, দরকষাকষি প্রত্যাখ্যান করেন, তাহা আমাদের পক্ষে অনুমান করা শক্ত। সুয়েজ খাল, সুদান, ব্রিটিশ পল্টন এই তিন প্রশ্নের সমাধান তাহাদের কাছে বৌদ্ধদের ত্রিশরণ অপেক্ষাও কাম্য।
ফলস্তিনের (প্যালেস্টাইন) মতো দুর্ভাগ্য দেশ পৃথিবীতে আমি কোথাও দেখি নাই। ইহুদি পঙ্গপাল দেশটাকে ছাইয়া ফেলিবার পূর্বে (১৯১৮) আরবদের সুখে দুঃখে দিন কাটিত– আফগানিস্তান যেমন তাহার দারিদ্র্য নিয়াও বাঁচিয়া আছে। ফলস্তিন তখন তুর্কির অধিকারে ছিল ও খলিফার অধঃপতনের যুগে তাহার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পবাণিজ্যের উন্নতির কোনওপ্রকার চেষ্টা করা হইতেছিল না বলিয়া ফলস্তিন নবীনেরা স্বরাজ্য আন্দোলন আরম্ভ করিয়াছিলেন। সে আন্দোলনের নেতারা সফলতা লাভ করিতেন কি না-করিতেন সে প্রশ্ন অবান্তর- মূল কথা এই যে ফলস্তিন শিক্ষাদীক্ষায় পশ্চাৎপদ থাকিলেও আপামর জনসাধারণ জাফা কমলানেবুর চাষ করিয়া নিজের জমিতে নিজের কুঁড়েঘরে জীবনযাপন করিত।
কুক্ষণে তাহারা লরেনসের ধাপ্পায় ভুলিল, কুক্ষণে তাহারা খাল কাটিয়া ঘরে কুমির আনিল। সে ইতিহাস আজ আর তুলিব না। ইহুদিরা আসিয়া তাহাদের কোটি কোটি টাকার পুঁজির জোরে আরবদের ঘরছাড়া ভিটেছাড়া করিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছাইল যে অবস্থায় মানুষ আর কিছু না করিতে পারিয়া দাঁত দিয়া কামড়ায়, নখ দিয়া ছিঁড়ে। পৃথিবীর সহানুভূতি ফলস্তিন পায় নাই, কারণ ইহুদিরা দুনিয়ার প্রেসের মালিক। তবু মনে আছে ১৯৩৪ সালে যখন আমি ফলস্তিনে বাস করিতেছিলাম তখন ভারতবর্ষের পক্ষ হইতে আমি আরবদের বলিয়াছি যে, আমাদের দেশের জাতীয়তাবাদীরা তাহাদের কল্যাণ কামনা করেন। নিঃস্ব আর্ত আরবদের সেকথা শুনিয়া চক্ষে জল আসিতে আমি দেখিয়াছি। ফলস্তিনের বেদুইন চাষি হয়তো কংগ্রেস-লীগ চিনে না কিন্তু আমি জানি যে সে দেশের শিক্ষিত ব্যক্তিরা খবর পাইয়াছেন যে, ভারতের নিপীড়িত জনসাধারণ কংগ্রেস ও লীগের ভিতর দিয়া আরবদের মঙ্গল কামনা করিয়াছে। দোহাই কংগ্রেস-লীগের কর্তাগণ, যাহা খুশি কর কিন্তু তোমাদের আশীর্বাদ লইয়া যেন গুর্খা পাঠান শিখ মারাঠা ফলস্তিনে না যায়।
ফলস্তিন পূর্ণ স্বাধীনতা চাহিয়াছে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন করিয়াছে। কিন্তু ইহুদিরা গণতন্ত্র চায় না যতদিন না দেশের লোক শতকরা ৫১ জন ইহুদি হয়। ততদিন দলে দলে ইহুদি আমদানি হইতেছে।
