অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর তিনি বললেন, আপনার এ কথাটি কালিদাসও বলে গেছেন। গৃহিণী, সচিব ইত্যাদি–অতখানি আশা আমি কখনও করিনি। এবং আমি আমাদের প্রণয়ের প্রথমদিন থেকেই জানতুম, ডিগ্রি পাওয়ার পরই তিনি চলে যাবেন আপন দেশে–না, দাঁড়ান, জানলুম কিছুদিন পরে। সংস্কৃত পড়াবার সময় তিনি মহাভারত থেকেও কিছুটা বেছে নেন। তাতে ছিল কচ ও দেবযানীর উপাখ্যান। আপনি ভাববেন না, তিনি কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে ওই উপাখ্যানটিই আমার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। তা হলে হয়তো তাঁর প্রতি অবিচার করা হবে। কিন্তু কী জানি, কে জানে–।
হঠাৎ যেন দিশে পেয়ে বললেন, দেখুন, কাল আপনাকে কথাটা বলেছিলুম, সেটা আবার, আরও জোর দিয়ে বলি, আমি নিওটিক, আমার মন যখন কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, তখন মনে হয়, সেইটেই ধ্রুব। আবার পরে দেখি, সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
হঠাৎ হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বিকৃত কণ্ঠে বললেন, শুধু এই দশ বছরের যন্ত্রণা মিথ্যা নয়।
ক্ষীণ চন্দ্রালোকে দেখি দু হাতের ফাঁক দিয়ে বয়ে বেরুচ্ছে চোখের জল। কত বৎসরের চাপা কান্না, কে জানে? এর পূর্বেও তিনি তার বেদনার উল্লেখ করেছেন, কিন্তু চোখ দুটি ছলছল করতেও দেখিনি। আর এ যে-ধারা নেমে এসেছে, এ তো কোনও পরিণত বয়স্কা রমণীর কান্না নয়, এ যে অবুঝ শিশুর কান্নার মতো। ইনি যখন শাস্ত্রালোচনা করেন তখন মনে হয়, ইনি আমার পিতার বয়সী, দৈনন্দিন আচরণে মনে হয়, ইনি আমার বড়দিদির বয়সী। আর এখন? এখন দেখি তিনি কাঁদছেন আমাদের পরিবারের সবচেয়ে ছোট, আমার অভিমানিনী ছোট বোনের মতো। সে কোনও যুক্তি-তর্ক শোনে না, কোনও সান্ত্বনা মানে না। যেন সে এই বিশ্বসংসারে একেবারে একা– তার সঙ্গী শুধু তার চোখের জল।
কী আছে বলার, কী যায় লেখা?
কিন্তু তাঁর আত্মসংযম অসাধারণ। বছরের পর বছর চোখের জল চেপে রাখার ফলে শুকিয়ে গেছে তার মুখ আর হাত দুখানা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁর জীবনে এই তাঁর প্রথম ভেঙেপড়া।
তার কান্নার ভিতর দিয়ে তিনি শুধু একটি অনুযোগ প্রকাশ করেছিলেন। ডিগ্রি লাভের কয়েকদিন পরই তাঁর বন্ধু দেশে ফিরে যান। বন স্টেশনে তিনি তাকে বিদায় দেন।
তার পর তার কাছ থেকে একখানা চিঠি না, একখানা পোল্টকার্ড না, একটি ছত্র মাত্র না। নববর্ষে, জন্মদিনেও না। সেই যে বন স্টেশন থেকে তিনি বিলীন হলেন, তার পর তিনি বেঁচে আছেন কি না, সেকথাও মাটিলডে জানেন না। মাটিলডে তাঁকে দুখানা চিঠি লিখেছিলেন।
আমি জানতুম, এইবারে আমার অগ্নিপরীক্ষা আসবে, কিন্তু পূর্বেই বলেছি, আমি স্থির করেছিলুম, আমি প্যারিস পালিয়ে গিয়ে সেটা এড়াব না।
এপারে ওপারে যে পারই হোক, হয়ে যাক।
যে প্রশ্ন তিনি বার বার শুধোতে গিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্বে শুধোতে পারেননি, আমি নিজের থেকেই তার উত্তর দিলুম।
ধীরে ধীরে বললুম, আমি ডা, কাণেকে চিনি। চিনি বললে ভুল বলা হবে। সামাজিক অনুষ্ঠানে লৌকিকতার দু-চারটি কথা হয়েছে মাত্র।
এবারে আমারও কড়া একটা কিছু খাওয়ার প্রয়োজন হয়েছে। তারই ছল করে ঘরের ভিতরে চলে গেলুম। ইনি এটা সয়ে নিন।
ফিরে এলে মাটিলডে শুধোলেন, বরোদা তো ছোট শহর; উনি নিশ্চয়ই জানেন, আপনিও বনের ছাত্র ছিলেন। সে নিয়ে কোনও কথাবার্তা হয়নি?
না, আমি চেষ্টা করেছিলুম, কিন্তু উনি কোনও কৌতূহলই দেখালেন না। তবে আপনি নিশ্চয় জানেন, উনি কথা বলেন অত্যন্ত কম।
মাটিলডে এক ঝটকায় খাড়া হয়ে বসলেন। প্রথমটায় বিস্ময়ে যেন বাক্যহারা। কী বললেন আপনি! পারঙ কথা বলেন কম! আমার সঙ্গে তো অনর্গল কথা বলতেন!
মনে পড়ল আমার বন্ধু সোহরাব ওয়াডিয়ার মন্তব্য। পাণ্ডুরঙ শঙ্কর কাণে সম্বন্ধে। বললুম, যখন দেখলুম তার কৌতূহল অত্যন্ত কম, তখন আমিও তার সম্বন্ধে কোনও খবর নিইনি। তৎসত্ত্বেও তাঁর কথা উঠলে আমার এক বন্ধু বলেছিলেন, আপনজনের মাঝখানে– ওই যে আপনি বললেন– উনি অনর্গল কথা বলেন।
মনে হল, মাটিলডে যেন খানিকটা সান্ত্বনা পেলেন। তাতে আশ্চর্য হবার কী? কবি রুমির দিকে তাঁর গুরু রাস্তায় তাকে ক্রস করার সময় একবার মাত্র একটুখানি স্মিতহাস্য করেছিলেন। সেইটুকুর অনুপ্রেরণায়ই তিনি রচলেন তার মহাকাব্য।
এইবারে আমার শেষ বক্তব্যটুকু বলার সময় এসেছে।
আমি বললুম, মাটিলডে, ডা. কাণের কী করা উচিত ছিল না-ছিল সে জানেন বিধি। হয়তো আপনাকে যাবার পূর্বে সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে গেলে ভালো হত, হয়তো না করে ভালোই করেছেন। আপনি যদি নিওরটিকই হয়ে গিয়ে থাকেন আমার কিন্তু বিশ্বাস হয় না– তা হলে উনি যাই করতেন না কেন, আপনি ভাবতেন, তার উল্টোটা ভালো হত।
কিন্তু সেটা আসল কথা নয়। আসল কথা এই : কাণে বরোদার রাজপ্রাসাদের গোপন-বিভাগে কাজ করেন। সেখানকার আইন অনেকটা ফরেন অফিসের মতো। জানেন তো, বিদেশিনীকে বিয়ে করাও ওদের মানা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে সে-অনুমতিও তারা দেয়– ওদের সিনিকাল বিশ্বাস, বরঞ্চ মানুষ তার স্ত্রীর কাছ থেকে জিনিস গোপন রাখতে পারে, প্রণয়িনীর কাছ থেকে কিছুতেই নয়; এই তো সেদিন গোয়েবলসের মতো প্রতাপশালী মন্ত্রীও এই ধরনের ব্যাপারে হিটলার কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়েছেন। নেটিভ স্টেট মাত্রই চক্রান্তের চাণক্যালয়– আর রাজপ্রাসাদ! সেখানে পরস্পরবিরোধী একাধিক গোপন বিভাগ একে অন্যের বিরুদ্ধে সর্বক্ষণ চক্রান্ত-কর্মে মত্ত। আপনার সঙ্গে পত্রালাপ ধরা পড়তই একদিন না একদিন, এবং তাঁর শত্রুপক্ষ যে সেটা কীভাবে কাজে লাগাত তার কল্পনাও আমি করতে পারিনে। কাণেকে বৃহৎ সংসার পুষতে হয়– তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম।
