মেজাজটা তেতো হয়ে গেল। আমি যেসব ঘটনা শুনতে চাইনে সেগুলোই যেন গেস্টাপো ডালকুত্তার মতো আমার পিছনে লেগেছে।
এশ বললেন, কিন্তু ধন্যি মেয়ে! রেস্তোরাঁর এই যে মালিক, সে মেয়েটাকে বড় স্নেহ করে। সে তো রেগে তার উকিল ভাইকে ফোন করে বলল, লাগাও দু-দুটো মোকদ্দমা একটা ফৌজদারি, একটা দেওয়ানি। ব্যাটাকে আমি জেলে পচাব, আর ব্যাটার ডাক্তারি লাইসেন্স দিয়ে টয়লেট পেপার বানাব। কিন্তু ওই যে বললুম, ধন্যি মেয়ে, কিছুতেই রাজি হল না কড়ে আঙুলটি পর্যন্ত তুলতে। কী আকাট, কী আকাট মেয়েগুলো!
আমি কিছু না বলে বিরাট এক পিস কাঁচের দেওয়ালের ভিতর দিয়ে মাটিলডের জন্য পথ চেয়ে রইলুম। দেখা পাওয়া মাত্র বাইরে গিয়ে তাকে সবকথা বললুম।
মাটিলডে কিছুমাত্র আশ্চর্য না হয়ে বললেন, আমি অনেককিছু আজ সকালবেলা একচেঞ্জে গিয়েই জানতে পেরেছি। আমরা সবকিছুই জানতে পাই। এমনকি, বার্লিনস্থ ফ্রান্সের রাজদূত মঁসিয়ো ফ্রাঁসোয়া পঁসে পর্যন্ত কিঞ্চিৎ বিচলিত হয়েছেন।
আমাকে একটু ভাবতে সময় দিন।
খাওয়ার পর হোফ গার্ডেনে বেড়াতে বেড়াতে স্থির হল, কাল সকালের গাড়িতে আমি প্যারিস চলে যাব। ফাড়াটা কেটে গেলে আমি ফের বন চলে আসব। নইলে সে তখন দেখা যাবে।
ফ্রাই এশকে আমরা মনসটার গির্জে অবধি পৌঁছে দিলুম। আচার-নিষ্ঠ রমণী পথে আমার মঙ্গলের জন্য একটা বাড়তি মোমবাতি কিনলেন– মা মেরির পদপ্রান্তে জ্বালাবেন বলে।
মাটিলডেকে একসচেঞ্জে পৌঁছে দিয়ে বললুম, আপনার সঙ্গে ডিনার খাব। কটায় আসব?
পাঁচটার পরে যে কোনও সময়।
হিটলারের ওপর পিত্তিটা চটে গেল। একটা নিরীহ বঙ্গসন্তানকে তার ছুটিটা আরামসে কাটাতে দেয় না। কিন্তু গোস্সাটা অবিমিশ্র নয়। একটা অস্ট্রিয়ান ভ্যাগাবন্ড, যুদ্ধে ছিল মাত্র করপরেল, সে কি না আমাদের দুশমন মহামান্য ইংলন্ডেশ্বর– যার রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না, (অবশ্য ফরাসিরা বলে, ইংরেজকে ভারতীয়দের সঙ্গে অন্ধকারে ছেড়ে দিতে স্বয়ং ব দিয়ো –করুণাময় সৃষ্টিকর্তাও সাহস পান না) এবং তাঁর সবৃ কনজারভেটিভ পুষ্টিকে প্রায় চার বছর ধরে তুর্কি নাচন নাচাচ্ছে, এ-সুসমাচারটি কানে এলেই মনে হয়, ইটিকে লিপিবন্ধ করার জন্য নয়া নয়া মথি মার্কের প্রয়োজন।
অপরাহ্নের এই মধুর আলোতে কার না শরীর অলস আবেশে ভরে যায়। কাইজার পাৎসের ফোয়ারের উপর ক্ষণে ক্ষণে রামধনু লাগছে। পাশে, সেই ১৯৩০ থেকে পরিচয়ের বুড়ো উইলি দিশি-বিদেশি খবরের কাগজ বেচছে। জর্মন কায়দায় সে দি টাইমস-কে টে টিমেস উচ্চারণ করত বলে আমরা কৌতুক অনুভব করতুম। কাছে এসে কানে কানে বলল, সব বিদেশি কাগজ বাজেয়াপ্ত। একটা বাজে কাগজ কী করে এসে গেছে, সক্কলের দৃষ্টি এড়িয়ে। আমার মেয়ে পড়ে বলল, প্যারিস লন্ডনে ধুন্দুমার। বলে পুট করে আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিল কাগজখানা।
নাহ্! এখন পড়ে কী হবে? তার চেয়ে তাকিয়ে থাকব চেনাট সারির দিকে, নাকে আসবে বোটানিকসের সুগন্ধ, কানে আসবে পপেলস্ডফের এভিনিউর কাচ্চাবাচ্চাদের খেলাধুলার শব্দ, কিংবা কারও খোলা জানালা দিয়ে পিয়ানো প্র্যাকটিস। কিংবা
পা দুটো লম্বা করে একটা বেঞ্চিতে হেলান দিয়ে দিব্যি ঘুমিয়ে নিয়েছি।
সামনে মাটিলডে। আপিস থেকে বাড়ি আসা-যাওয়ার পথ তার এইটেই। বললেন, কী স্বপ্ন দেখছিলেন?
আমি বললুম, সেই যে চীনা দার্শনিক বলেছিলেন, স্বপ্নে দেখলুম আমি প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছি। জেগে উঠে চিন্তায় পড়লুম, এই যে আমি ভাবছি আমি মানুষ, সে কি তবে প্রজাপতির স্বপ্ন? প্রজাপতি স্বপ্ন দেখছে, সে মানুষ হয়ে সোনালি রোদে রুপালি ঝরনার কাছে বসে চা খাচ্ছে।
মাটিলডে বললেন, স্বপ্নে যদি কিছু একটা হবেই, তবে প্রজাপতিটা লক্ষ্মীছাড়া মানুষ হতে যাবে কেন? বরঞ্চ রুপালি ঝরনা হলেই পারে। কত না পাহাড়, কত না সবুজ মাঠ, কত না পাইনবন পেরিয়ে সে হবে প্রশস্ত নদী, তার বুকের উপর দিয়ে ভেসে যাবে নলরাজের রাজহংস, ভরা পালে উড়ে যাবে ময়ূরপঙ্খী, তার বুকে কখনও উঠবে ঝড়ঝঞ্ঝা, কখনও প্রতিবিম্বিত হবে পূর্ণ চন্দ্র। সর্বশেষে সে পাবে তার চরম মোক্ষ পরমা শান্তি-সমুদ্রের সঙ্গে আপন সত্তা মিলিয়ে দিয়ে।
আমি বললুম, অন্তত মানুষ এই স্বপ্নই দেখেছে : নিঝরের স্বপ্নভঙ্গ –আসলে সেটা কবি রবীন্দ্রনাথের স্বপ্ন।
উত্তর মেঘ ও যক্ষের স্বপ্ন।
কিছু উত্তর না দিয়ে মনে মনে বললুম, হায় সৃষ্টিকর্তা, প্রেমের ঠাকুর! কোথায় না এ-রমণী এসব কথা বলবে তার দয়িতের সঙ্গে, আর কোথায় সে এসব বলছে আমার মতো কলাগাছকে। ওমর খৈয়াম তাই পৃথিবীর উপর থুথু ফেলতে চেয়েছিলেন।
মাটিলডে কী খবর জানতে চান, সেটা আমি মোটামুটি অনুমান করতে পেরেছি, কিন্তু হায়, আমি তো তাঁকে এমন কিছু বলতে পারব না, যা শুনে তাঁর বেদনাভার লাঘব হবে। তাই তিনি সেটা না শুধালেই আমি শান্তি পাই। কিন্তু আমি যদি তাঁকে শুধোবার সুযোগ না দিই, তবে কি সেটা আমার পক্ষে অন্যায় হবে না? কাল যাচ্ছি প্যারিস। যদি সত্যি লড়াই লেগে যায়, তবে আমাদের দুজনাতে পুনরায় দেখা-সাক্ষাৎ হওয়ার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।
যা হয় হবে, আমি তাকে সে সুযোগ দেব।
ব্যালকনিতে লম্বমান হয়েছি দুখানা ডেক চেয়ারে। বললুম, দুজনার ভালোবাসা যদি কোনও কমন ইনটারেস্টের চতুর্দিকে গড়ে ওঠে, তবে সেটা হয় বড় প্রাণবন্ত, মধুর ও দীর্ঘস্থায়ী। ব্রাউনিং আর মিসেস ব্রাউনিং দুজনা একে অন্যের মধ্যে মিশে যেতেন কবিতায় কবিতায়। এমনকি, শুষ্ক বিজ্ঞানও দুজন মানুষকে একই রসের বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আপনার কথা যখনই ভাবি, তখনই মনে পড়ে প্রফেসর ও মাদাম কুরির কথা।
