দাঁড়িয়ে বললুম, এইবারে উঠি। কাল প্রভাতে প্যারিস গমন। হিটলার আমার সব প্রোগ্রাম তছনছ করে দিয়েছেন। সবাইকে আজ রাত্রেই চিঠি লিখে জানাতে হবে। তার ওপর প্যাকিং রয়েছে।
মাটিলডে যেন চিরকালের মতো দাঁড়ালেন। আমার কাঁধের উপর হাত রেখে প্রায়ান্ধকারে আমার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে রইলেন। আমার মনে হল, আমি যেন তার চোখে একটুখানি জ্যোতি দেখতে পেয়েছিলুম। সত্য জানেন অন্তর্যামী।
কিন্তু মিথ্যে বলেছিলুম আমি মাটিলডেকে। অন্তর্যামী যেন ক্ষমা করেন। আমি কাণের সাফাই গাইনি। আমি চেয়েছিলুম, মাটিলডের বুকের রক্ত দিয়ে গড়া তার বল্লভ যেন ধূলিতলে লুণ্ঠিত না হয়। মাটিলডের জীবন তারই ওপর নির্ভর করছে।
প্যারিসে পৌঁছনো মাত্রই শুনি, চেক সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছে। হিটলার সৈন্য অপসারণ করেছেন। আমি আমার জাহাজের প্রিয়ার অনুসন্ধানে বেরোলুম না। কারণ, বনে থাকতেই তাঁর রোদনভরা প্রথম চিঠি পাই, আমি এখানে বাঁচব কী করে? এ যে বড় হৃদয়হীন জায়গা। তুমি এখানে চলে এসো না, ডার্লিং।
ভ্যাগ্যিস আমি যাইনি। দু দিন পরে দুসরা চিঠি কাল সহকর্মীদের সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে বেড়াতে গিয়েছিলুম। ভেরি ইনটারেসটিং! মনে হচ্ছে এখানে তিন বছর কাটাতে পারব। সাদা চিঠির কাগজে সাদা কালিতে লেখা প্রিয়ার প্রাঞ্জল বাণীটি বুঝতে আমার লহমা-ভর সময়ও লাগেনি। বস্তুত প্রথম চিঠি থেকেই সেটা আমার বুঝে নেওয়া উচিত ছিল। যে বলে, প্যারিস হৃদয়হীন, সে নিশ্চয়ই সেখানে পৌঁছনো মাত্রই পড়ি-মরি হয়ে, উদোম হিয়া নিয়ে হিয়ার সন্ধানে বেরিয়েছিল। ধন্য আমি, এহেন উদারহৃদয়ার সঙ্গে আমার হার্দিক পরিচয় হয়েছিল। ইনি কাণে গোত্রের নন; নিঃশব্দে, নীরবে মহাশূন্যে লীন হন না। প্যারিস ধন্য। মার্কিন প্রবাদ আছে, পুণ্যশীল মার্কিন মাত্রই মৃত্যুর পর জন্ম নেয় প্যারিসে।
আম্মো বেকার দিন কাটাইনি, কারণ, আমার যে কোনও কাজ নেই। করে করে তিন দিনের জায়গায় কেটে গেল দু মাস। সর্বনাশ! প্যারিস বড়ই সহৃদয়, কিন্তু দরাজ-দিল নয়। কিপটেমি শিখতে হলে প্যারিসের খাঁটি বাসিন্দাদের সঙ্গে এক সপ্তাহ বসাই যথেষ্ট। শেষটায় রু্য দা সমরারের ইন্ডিয়া ক্লাবে জাতভাইদের সর্বনাশ করে তাদের তহবিল তছরুপ করে বিজয়গর্বে বন ফিরে এলুম। একদা নেপোলিয়ন যেরকম প্যারিস থেকে বেরিয়ে হেলায় কলোন-বন্ জয় করেছিলেন।
মাটিলডেকে আমার ওপর বেশি চাপ দিতে হল না। আমি সুড়সুড় করে তাঁর ফ্ল্যাটেই ঢুকলাম।
রবিবারে একসঙ্গে গির্জেয় গেলুম।
আইমা দেখি কাণের কাছ থেকে বেশ দু-চারটে ইন্ডিয়ান ডিশ বানাতে শিখে নিয়েছিলেন। আর মাত্র তিন দিন বাকি। ভেনিস বন্দরে জাহাজ ধরে বোম্বাই পাড়ি দেব। ট্রাভেল আপিসে ভেনিস অবধি ট্রেনের টিকিট কেটে বাড়ি ফিরে দেখি ধুন্দুমার। গলা-কাটা মুরগির মতো দুই রমণী এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছেন।
সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য! কাণে রাজপ্রাসাদের ঠিকানা দিয়ে মাটিলডেকে কেবল করেছেন, ভারতীয় ডাক্তারের উপদেশে তিনি কঠিন রোগে আক্রান্ত তার ছেলেকে ইউরোপ পাঠাচ্ছেন। মাটিলডে তার দেখভাল করতে পারবেন কি না, যেন কেবল করে জানান।
মাটিলডের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি কেবুলের জবাব তো দিয়েছেনই, এখন বসে গেছেন আরেকটা কেবৃলের মুসাবিদা করতে। আর আমাকে প্রশ্ন, ছেলেটার বয়স কত, কী ব্যামো হতে পারে, সে নিরামিষাশী কি না, এবং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সে নামবে কোন বন্দরে? তিনি সেখানে উপস্থিত থাকতে চান, নইলে তাকে দেখবে কে? মুসাবিদা বন্ধ করে ফোন করেন কখনও বা ট্রাভেল আপিসকে কখনও-বা তার দপ্তরকে পাওনা ছুটির মজুরির জন্য। হঠাৎ সবকিছু বন্ধ করে লেগে যান প্যাক করতে হয় যাবেন মার্সেই, নয় রোম। সেখান থেকে ইটালিয়ান যে কোনও বন্দরে পৌঁছানো যায় ঘণ্টা কয়েকের ভিতর। নইলে এখান থেকে খবর পেয়ে তিনি ইটালিয়ান বন্দরে পৌঁছতে না পৌঁছতে জাহাজ হয়তো ভিড়ে যাবে সেখানে; ট্রাভেল দফতর অভয় দেয়, তিনি মানেন না। ইতোমধ্যে তারা পিয়ন মারফত পাঠিয়ে দিয়েছে, বোম্বাই-ভূমধ্যসাগরের তাবৎ জাহাজ কোম্পানির টাইমটেবল। আমি সেগুলো অধ্যয়ন করতে লেগে গেলুম গভীর মনোযোগ সহকারে।
তাঁর দ্বিতীয় কেবল যাওয়ার পর মাটিলডের মনে জাগল আরেক ঝুড়ি বাস্তব-অবাস্তব প্রশ্ন। তৃতীয় মুসাবিদায় তিনি বসে যান।
হাত নিঙড়াতে নিঙড়াতে পায়চারি করেন আর বলেন, মাইন গট, মাইন গট হে ভগবান, হে ভগবান!
হঠাৎ ছুটে এলেন আমার কাছে। মুখ থেকে শেষ রক্তবিন্দু অন্তর্ধান করেছে। আর্তকণ্ঠে শুধালেন, হঠাৎ যদি যুদ্ধ লেগে যায়, তবে কী হবে? আমি শান্ত কণ্ঠে বললুম, নিরপেক্ষ সুইটজারল্যান্ডে চলে যাবেন। সেখানে চিকিৎসার কোনও ত্রুটি হবে না। যক্ষ্মা হলে যে সেখানেই যেতে হবে সেকথা আর তুললুম না। শুধু বললুম, বরোদার কেবল মহারাজার অজান্তে আসতে পারে না; আপনি তার সাহায্য পাবেন। জর্মন পররাষ্ট্র দফতর বরোদার মহারাজকে প্রচুর সম্মান করে। তিনি আশ্বস্ত হলেন।
গভীর রাত অবধি পাশের ঘরে তাঁর মৃদু পায়চারি শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লুম।
দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যাবেলা আমাকে বললেন, তিনি মনস্থির করেছেন, আমার সঙ্গে পরের দিন ভেনিস যাবেন।
