বন্-এর আপন তরুণদলই এ পরিস্থিতির সঙ্গে সুপরিচিত।
আমার একটি ঘটনা মনে পড়ল। আমার এক বান্ধবীকে রাত্রিবেলা বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ঘরমুখো রওনা হয়ে কয়েক পা এগিয়েছি এমন সময় শুনতে পেলুম বান্ধবী একতলার দিকে ডাকছে তার ঘুমন্ত ভাইকে নিচের সদর দরজা খুলে দেবার জন্য। আমার উল্টো দিক থেকে আমার দিকে এগিয়ে আসছে একটি তরুণ। সে ভেবেছে মেয়েটি বুঝি আমাকে ডাকছে, আর আমি সাড়া না দিয়ে চলে যাচ্ছি। আমাকে পাস করার সময় মিনতি-ভরা মৃদুকণ্ঠে বলল, এত কঠিন হৃদয় হবেন না, য়ুঙার হার (ইয়াং জেন্টলম্যান)।
সে রাত্রে বন্-এর গলিঘুচি বেয়ে বেয়ে অনেক ঘোরাঘুরি করেছিলুম। মনটা বড় অশান্ত। ভোরের দিকে হঠাৎ রোদের একজন পুলিশ আমার সামনে দাঁড়িয়ে বুটের হিলে হিলে ক্লিক করে সেলুট দিল। আমি বললুম গুটন্ আবৃন্ট।
পুলিশ বলল, গুড মর্নিং বলাই কালোপযোগী হবে। ভোর হতে চলেছে।
তার পর গলা নামিয়ে বলল, এই নিয়ে আপনাকে তিনবার ক্রস করলুম। ইস্ট ভাস লো? এনিথিং রং?
এ শহরের পুলিশও দরদী। আমি বললুম, না, অনেক ধন্যবাদ।
বলল, এরকম ছন্নের মতো একা একা রাতভর ঘোরাঘুরি করে কী লাভ? চল, ওই বেঞ্চিটায় বসে আমার সঙ্গে একটা সিগারেট খাবে।
আমি নিজের প্যাকেট বের করলুম। আমার সিগারেট নিতে খুব সহজে রাজি হল না।
বলল, তুমি ভ্যাগাবন্ড নও, রাস্তাও হারাওনি, এবং চুরিতে যদি হাতেখড়ি হয়ে থাকে তবে সে অতি সম্প্রতি। আমি তোমাকে কিছুটা চিনি। কয়েক বছর আগে যখন এখানে ছাত্র ছিলে তখন আমার বিটেই তোমার বাসা ছিল। তার পর কিছুদিন তোমাকে না দেখতে পেয়ে বুঝলুম আর পাঁচটা ফেৎলেস টমাটোর মতো (জর্মনরা কেন টমাটোকে fathless বলে, জানিনে) পাস করে দেশে চলে গেছে। কিন্তু জানো, তোমাকে সে পর্যায়ে ফেলা যায় না। বিশ্বাস করবে না, তুমিই পয়লা বিদেশি যে পরীক্ষা পাস করার পর চলে গিয়ে আবার ফিরে এসেছ। কিছু মনে করো না, আমি বড় খোলাখুলি কথা বলি। হ্যাঁ, তোমার সেই প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড বান্ধবী গেল কোথায়? তোমাদের দুজনার চুল ছিল এই শহরের দুই এস্ট্রিম। সবাই তাকাত।
আমি বললুম, ও! মার্লেনে? সে বিয়ে করে ফ্রিজিয়ান দ্বীপে চলে গেছে।
তাই বুঝি ছন্নের মতো?
আমি ধীরে ধীরে বললুম, না, আজ একটি মেয়ের জীবনকাহিনী শুনে বড় দুঃখ হল। মন শান্ত হচ্ছিল না।
বলল, সরি।
সিগারেট শেষ করে শুপো উঠে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, তোমার পার্সনাল ব্যাপারে আমি টু মারতে চাইনে সে তো স্বতঃসিদ্ধ! তাই শুধু বলি এই বন্ শহরে ক্রাইম এতই কম হয় যে, দুষ্টের দমন অপেক্ষা শিষ্টের পালন করতে হয় আমাদের অর্থাৎ পুলিশের বেশি। আর্তের সাহায্য করতে গিয়ে কিন্তু আমি বার বার দেখেছি, সত্যকার সাহায্য করা অতি কঠিন, প্রায় অসম্ভব। জর্মনে একটা কথা আছে : মমতায় ভরা এই যে মায়ের শরীর, যে তার বাচ্চার জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত, সে কি পারে তার মুমূর্ষ শিশুকে তার মরণে সাহায্য করতে? এইটুকু দুধের বাচ্চাকেও মরতে হয় আপন মরণ। যে অজানা পথে যেতে ত্রিশ বছরের জোয়ানও ভয় পায়, আট বছরের শিশুকেও সেই পথে পা দিতে হয়।
কে কার সাহায্য করতে পারে?
পারেন শুধু মা মেরি।
আবার দেখা হবে, য়ুঙার হ্যাঁর, শুধু শুধু মনখারাপ না করে হোটেলে গিয়ে শুয়ে পড়। আর দরকার হলে পুলিশের পুৎসির খবর নিয়ো।
বড় দুশ্চিন্তায় পড়লুম। আমার ছাত্রজীবনের ল্যান্ড-লেডি এখন থাকেন ব্যুকেবুর্গ নামক ছোট্ট শহরে। তার পাশে একটা গ্যারিসন। তিনি এসেছিলেন বলে, এবং আমার খবর জানতেন বলে আমাকে ফোন করলেন, বললেন জরুরি খবর আছে। তাঁকে লাঞ্চে নিমন্ত্রণ করলুম তাঁর প্রিয় আম রাইন রেস্তোরাঁয়। সেখানে গিয়ে দেখি, তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমার বিস্ময় প্রকাশ করার পূর্বেই তিনি বললেন, নাৎসিদের গোয়েন্দাগিরি চরমে পৌঁছেছে। এঁদের অনেকেই দূর থেকে সুদ্ধমাত্র ঠোঁটের নড়া থেকে কথা বুঝে নিতে পারে। তাই বাইরেই জরুরি গোপন কথাটা সেরে নিই।
খবরের কাগজে নামগন্ধ নেই, লার্ক-হক জানে না, কিন্তু আমরা গ্যারিসনের কাছে থাকি, আমাদের কাছে ট্রপ মুভমেন্ট লুকানো অসম্ভব। পরশু রাতে প্রায় পঁচিশ হাজার সৈন্য গেছে চে-সুড় এটেন্ সীমান্তে। লড়াই যদি আচমকা লেগে যায়, তবে আপনি ইন্ডিয়ান, অতএব ব্রিটিশ, অতএব শত্রু। নজরবন্দি হয়ে থাকবেন। দেশ থেকে টাকা আসবে না। দুরবস্থার চরম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাই দেখেছি।
তার সদুপদেশ– না বললেও আমি বুঝলুম ইংরেজ লড়াই হারলে যে তার নিজস্ব আবিষ্কার করা ভাষায় বলে বাহাদুরিকে সাথ হটনা (বীরত্বের সঙ্গে পলায়ন! শোলার পাথর বাটি, ডুববেও ভাসবেও) সেইটি আমার অবলম্বন করা।
বললুম, চলুন, ভিতরে গিয়ে খেতে খেতে চিন্তা করি।
এ-রেস্তোরাঁর সঙ্গে ল্যান্ড-লেডির নিদেন চল্লিশ বছরের পরিচয়। মালিক, ওয়েট্রেস, সবাই উদ্বাহু হয়ে তাকে অভিনন্দন জানাল।
হঠাৎ যদি এখন আমাকে জর্মনি ত্যাগ করতে হয়, তবে তার পূর্বে মাটিলডেকে তার শেষ প্রশ্ন শুধোবার একটা সুযোগ দিতে হয়।
টেলিফোনে তাঁকে লাঞ্চের নিমন্ত্রণ জানালুম আর টাপে-টোপে বোঝালুম, আমার বিশেষ প্রয়োজন।
ফিরে আসতে ফ্রাউ এশ ফিসফিস করে বললেন, কাউন্টারের পিছনে ওই ওয়েট্রেসটিকে লক্ষ করুন। বেচারি পড়েছিল এক পিচেশের পাল্লায়। একটা গরিব ডাক্তারির ছাত্র করে ওর সঙ্গে প্রণয়। মেয়েটি পুরো ছ বছর ওর খরচা যোগায়। কথা ছিল শেষ পরীক্ষার পর সে তাকে বিয়ে করবে। পরীক্ষা পাসের তিন দিন পরে বদমাইশটা এক খানদানি, ধনী মেডিকেল স্টুডেন্টকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে তাকে বিয়ে করেছে।
