চলুন– আইমার প্রতি সুবিচার করতে। এমনিতেই না, সেখানে অতি অবশ্য এ-সব কথা তুলবেন না।
আইমার রান্নার বর্ণনা দেব না। সুশীল পাঠক, তোমার আশি বছরের পাক্কা-পাচিকা ঠাকুরমা যদি থাকেন তবে তুমি অনায়াসে বুঝে যাবে, এঁরা মিন-নোটিশে, দ্বিপ্রহর রাত্রেও কী ভানুমতির ভোজবাজি দেখাতে পারেন।
এখানে ভোজ আমি ভোজন অর্থেই নিচ্ছি। বিক্রমাদিত্য-মহিষীর ইন্দ্রজালও অবশ্য তাতে রয়েছে। আর আমাদের জনপদ কাহিনীতেও আছে, ভোজরাজদুহিতা কালিদাসকে ভোজ দিয়ে পরিতুষ্ট করতেন।
মে মাসে রাত একটায় রাইনল্যান্ডেও বেশ শীত পড়ে। বেরোবার সময় মাটিলডে জোর করে আমার স্কন্ধে তাঁর হাল্কা ম্যাটলটি চাপিয়ে দিয়েছিলেন।
বারবা রসসার কথা যে আমার মনে ছিল না তা নয়। কিন্তু আমার হোটেল কাছেই।
ভেনুসর্বেকভেক-এ নেমেই সামনে পড়ে কাসলের বোটানিক্যাল গার্ডেনের চক্রাকার পরিখা। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দেখি অসংখ্য কুমুদিনী সৌরভজাল বিস্তার করেছে। চর্তুদিক নিঝঝুম নীরব। আমাদের গ্রামাঞ্চলের চেয়েও নীরব কারণ সেখানে বেওয়ারিশ কুকুর, বনের শেয়াল, দম্ভী মোরগা কেউ না কেউ নিস্তব্ধতা ভাঙবেই। দূরে কাইজার প্লৎসে দু-চারখানা মোটরের আনাগোনা আছে নিশ্চয়ই, কিন্তু এরা নিরীহ নিদ্রালুর ঘুম ভাঙানোর জন্যই যে মোটরে হর্ন থাকে সেটা এখনও জানতে পারেনি।
বুকের ভিতরটা কীরকম মুচড়ে মুচড়ে উঠছে। আমি কবি নই, আর্টিস্ট নই– আমার হৃদয় স্পর্শকাতর নয়, কিন্তু অকালে বিনাদোষে হৃতযৌবনা, কিংবা আমার ছোট বোনের সখী তরুণী মাধুরীর থানকাপড়, কিংবা রবীন্দ্রনাথের বিধবা মল্লিকা একমাত্র রুগ্ণ সন্তানকে জলে বিসর্জন দিয়ে মকবাহিনীর কাছ থেকে লব্ধস্বাস্থ্য সন্তানকে ফিরে পাবার আশায় কঙ্কণ-বলয়হীন হাত দুখানি বাড়িয়ে যখন দেখে— দেখে সব মিথ্যা, সব বঞ্চনা– এসব দেখলে কিংবা কবি দেখালে আমার মতো মূঢ় জড়ভরতও চট করে দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যেতে পারে না।
আমি কি ভালোবাসিনি?– আমার মতো অপদার্থ ক্ষণতরে ভালোবাসা পেয়েও ছিল– পথের ভুলে অপদার্থের প্রাণের কূলে বসন্তপবন হঠাৎ কখন এসে যায়, আর যাবার সময় ছেড়ে যায় তার অঞ্চল থেকে গ্রীষ্মের খরতাপ, রৌদ্রদাহ, তৃষ্ণাবাণ। ইচ্ছা করেই। কিন্তু সেকথা থাক। খ্রিস্টের বদনাম ছিল, তিনি মদ্যপ, তিনি নর্তকীকে সাহচর্য দেন। তিনি সব দেখেই বলেছিলেন, কাউকে বিচার করতে যেও না। পয়গম্বর বলেছেন, তোমার সবচেয়ে বড় দুশমন তোমার দুই কাঁধের মাঝখানে–অর্থাৎ তুমি নিজে। তবে কে তোমার প্রতি অবিচার করেছে সে অনুসন্ধানে আপন জান্ পানি কর কেন?
এর ভিতরকার জলন্ত বহ্নিশিখা এঁর মুখ আর হাত দু-খানিই পুড়িয়ে ফেলল কেন? ওই দুটিই মানুষের ভিতরকার মানুষকে প্রকাশ দেয়– সুখ-দুঃখ, আশা-নৈরাশ্য, তার জন্ম-মৃত্যু। বিশেষ করে মানুষের হাত দু-খানি প্রকাশ করে তার পরিবারের ঐতিহ্যগত স্পর্শকাতরতা, চিন্তাশীলতা কিংবা সে দুটি রসে রসে ভরা। মূঢ় জনের হাত দু-খানি কচ্ছপের খোলের মতো।
ইনি কি জানতেন, যখন তার বন্ধুর থিসিস তিনি টাইপ করে দিচ্ছিলেন যে, প্রত্যেকটি হরপে ঠোকা দেবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার আপন কফিন-বাক্সের ডালায় স্বহস্তে একটি একটি পেরেক পুঁতছেন।
স্বামী-সোহাগিনী কার্লোটা পাগলিনীর মতো ছুটে এলেন সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের কাছে প্যারিসে, তার পর গেলেন তার ভাশুর প্রবল প্রতাপান্বিত অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাটের কাছে পায়ে পড়লেন তাঁদের, তোমরাই আমার স্বামীকে পাঠিয়েছিলে মেকসিকোর সম্রাট করে। আমাকে সামান্য একমুঠো সৈন্য দাও। আমি তাকে বাঁচাতে পারব।
ওদিকে স্বামী মাকসিমিলিয়ান প্রহর গুনছেন কার্লোটার প্রত্যাবর্তন কিংবা অবধারিত মৃত্যুর জন্য। দ্বিতীয়টাই হল। খোয়ারেসের আদেশে তাঁকে দাঁড়াতে হল বন্দুকধারী সৈন্যদের সামনে। এমপেরর মার্কসিমিলিয়ান ক্ষাত্রধর্মের শেষ আভিজাত্যের প্রতীক– মৃত্যুবেদিতে দাঁড়াবার পূর্বে বন্দুকধারীদের প্রত্যেককে তিনি একটি একটি করে সোনার মোহর দিলেন।
সব খবর কার্লোটা পেলেন, প্যারিস-ভিয়েনায় ছুটোছুটির মাঝখানে। তার মাথার ভিতর কী যেন একটা ঘটে গেল। তার চোখে দেখা দিল এক অদ্ভুত দ্যুতি যার দিকে কেউই তাকাতে পারত না। পারলে তার সম্মুখ থেকে পালাত।
তার পর দীর্ঘ ষাট বৎসর ধরে তিনি কথা বলতেন ওপারের লোকের সঙ্গে। আর বার বার ফিরে আসতেন ওই এক কথায়; তাঁর স্বামীকে বলতেন, মাল, মাল, সব দোষ আমারই। আমারই সব দোষ।
আমি বিমূঢ়ের মতো কিছুতেই ভেবে পাইনে মানুষের দোষ কোথায়, তার পাপই-বা কী পুণ্যই-বা কী?
কী সদাশিব, শান্ত এই বন্ শহর। কিন্তু তাই কি? চেস্টনাট গাছের ঘন পাতা থেকে ঝরে পড়ল আমার হাতের উপর এক ফোঁটা হিমিকা। কার এ অশ্রু? আমি জানি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে খুব কম মেয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসত– আদৌ আসত কি না জানিনে– তাই ছাত্রেরা প্রণয় জমাত বন্-বালাদের সঙ্গে। তার পর টার্ম শেষ হতেই অনেকেই চলে যেত ভিন্ন ইউনিভার্সিতে। তাই এ-প্রেমের নাম সেমেস্টার-লিবে বা এক টার্মের প্রণয়। কারও কারও প্রেম অবশ্য অপেক্ষাকৃত দীর্ঘস্থায়ী হত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই আপন আপন অধ্যয়ন সমাপন করে উড়ে চলে যেত এদিক-ওদিক। আর পড়ে রইত বন্-বালাদল তাদের অশ্রুজল নিয়ে।
