আরেক দিন হবে। আপনি এখানে আর কতদিন আছেন?
অন্তত দেড় মাস। কয়েকদিনের জন্য ডুসলডর্ফ যাব, সেই যে বন্ধু পাউলকে ট্রাঙ্ককল করেছিলুম, তার ওখানে। আপনিও চলুন না।
বললেন, মন্দ নয়; পরে দেখা যাবে।
ইতোমধ্যে আইমা একটা বরফে ভর্তি অত্যুজ্জ্বল রুপালি বালতিতে করে এক বোতল শ্যাম্পেন আর এক বোতল মোজেল নিয়ে এসেছেন।
আমি বললুম সর্বনাশ! আইমা কী যেন একটা বললেন। শুধু মাটিলডে শব্দটি বুঝতে পারলুম। তা হলে এর ক্রিশ্চান নাম ওই।
তিনি বললেন, হোখ ডয়েচস্ হাই জর্মন– ব্যুনেন আউস্প্ৰাখে দিয়ে উচ্চারণ করার ফ্যাশান আইমার কুমারী বয়সে চালু হয়নি বলে আমরা এখনও আলজাসের ডায়লেক্ট বলি। আর বোতলগুলো যদিও অত পুরনো নয়, তবু আমার পিতার আমলের। শ্যাম্পেন নাকি পুরনো হলে খারাপ হয়ে যায়। ভালো না লাগলে মোজেলটা খাবেন।
আমি নিজে খাই আর না-খাই, এর মনে যদি একটু রঙ লাগে তবে আমি খুশি।
শুধালুম, আপনি কি এখনও ভারতীয় শাস্ত্রের চর্চা রেখেছেন? আপনার বিশেষ ইন্টারেসট কিসে?
বিষয়টা কঠিন নয়। আপনি নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, বৈদিক যুগে স্ত্রী-পুরুষের সমান অধিকার ছিল। এমনকি হোমযজ্ঞেও স্ত্রী-পুরুষে সমান অধিকার।
আমি বাধা দিলুম, ইন্ডলজি আমার সাবজেক্ট নয়। আপনি সবিস্তার না বললে মোষের সামনে বীণা বাজানোর মতো হবে।
তিনি বললেন, সে কী, আপনি তো ইন্ডিয়ান!
আমি বললুম আপনাদের ইহুদিদের মতো আমারও লয়েলটি দ্বি-ধা। আমাকে আমার পারিবারিক মুসলিম ঐতিহ্যের সঙ্গে যোগ রাখতে হয় আর যে দেশে পুরুষানুক্রমে আছি তার অতীত গৌরবেও আমার হিস্যে আছে। তবে আমাদের দেশের মেজরিটি আপনাদের নাৎসিদের মতো নয়। আমাদের মুসলমান কবি কাজীকে হিন্দুরা মাথায় তুলে নাচে, আর সেদিন নাৎসিদের একখানা বইয়ে পড়ছিলুম, ইহুদি হাইনে সম্বন্ধে বলছে, ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে অপরিচিত। উচ্চাঙ্গের রসিকতা বলতে হবে। যে লোককে ১৮১৭/২০ থেকে তাবৎ জর্মনি ও পরবর্তী যুগের রসগ্রাহী বিশ্বজন চেনে তিনি ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হঠাৎ অপরিচিত হয়ে গেলেন, যেদিন হিটলার চ্যানসেলর হলেন!
তার পর তাড়াতাড়ি বললুম, কিন্তু এসব থাক। আপনার কথা বলুন।
বৈদিক যুগে স্ত্রী-পুরুষের সমান অধিকার। স্মার্ত যুগেই সেটা কমতে আরম্ভ করল। করে করে শেষ পর্যন্ত সতীদাহ পর্যন্ত।
তার পর তিনি যেরকম সবিস্তর ধাপে ধাপে নামতে লাগলেন তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। স্মৃতির আমি জানি সামান্যই কজন হিন্দুই জানে, স্মার্ত পণ্ডিত ভিন্নঃ মৰাদি যেসব শাস্ত্রকারদের নাম তিনি বললেন, তার বারো আনাই আমার অজানা। এবং যেটা আমার সবচেয়ে আশ্চর্য লাগল সেটা এই যে, সর্বদাই তিনি চেষ্টা করছিলেন প্রত্যেক বিধানের পিছনে কী অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে সেটা খুঁজে বার করার। অন্যতম মূল সূত্রস্বরূপ তিনি গোড়াতেই বলেছিলেন, কার্ল মার্কস বলেছেন, যুগান্তকারী সামাজিক বিবর্তনের পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক কারণ –কিন্তু সেটা আমি একমাত্র কারণ বলে স্বীকার করিনে; সার্টেনলি, যদিও সেটা দি মোস্ট ইমপর্টেন্ট কারণ। এই সূত্রটি তিনি বার বার অতি সুকৌশলে প্রয়োগ করছিলেন।
সে রাত্রে তিনি যা বলেছিলেন তার সিকিভাগ লিখতে গেলে আমাকে একখানা পূর্ণাঙ্গ থিসিস বানাতে হয়!
শেষ করলেন এই বলে, শুনেছি, আপনাদের মডার্ন মেয়েরা এখন নাকি তাদের সর্ব পরাধীনতা, দুরবস্থার জন্য স্মৃতিকারদের অর্থাৎ পুরুষদের দোষ দেয়। কিন্তু সম্পূর্ণ দোষ ওঁদের নয়। মেয়েদেরও আছে। সে কথা আরেকদিন হবে। আইমা নোটিশ দিয়েছেন।
ইতোমধ্যে আমি একটি গেলাস চেয়ে নিয়ে সেইটে মোজেলে ভরে আইমার জন্য রান্নাঘরে নিয়ে যেতে বুড়ি প্রাচীন দিনের পদ্ধতিতে দাঁড়িয়ে উঠে দু হাতে দু দিকের স্কার্ট সামান্য তুলে কার্টসি করলেন। বললেন, না বাছা, অতখানি না। বসার ঘরে এসে মাটিলডের গেলাসে প্রায় সবখানি ঢেলে দিয়ে স্বাস্থ্য পান করলেন।
আমি মাটিলডেকে বললুম, আপনি না বলছিলেন, আপনি নিওরটিক? কিন্তু এতক্ষণ ধরে আপনি যে শাস্ত্র-চর্চা করলেন তার প্রত্যেকটি সিদ্ধান্ত তো যুক্তিসঙ্গত প্রতিজ্ঞা, প্রত্যক্ষ ও ন্যায়সঙ্গত অনুমোদনের দৃঢ়ভূমির ওপর নির্মাণ করলেন। এমনকি নিওরসিসের পুনরাবৃত্তি প্রমাদ থেকেও আপনার ধারাবাহিক প্রামাণ্যবিন্যাস সম্পূর্ণ মুক্ত।
মাটিলডে ম্লান হাসি হেসে বললেন, নিওরসিস, অনুভূতির রোগ। তার হৃভূমি আমাদের হৃৎপিণ্ডে, স্মৃতিশাস্ত্র মস্তিষ্ক রাজ্যের নাগরিক।
তার পর ভেবে বললেন, সেখানেও যে হৃৎপিণ্ডের নিপীড়ন একেবারে পৌঁছায় না তা নয়। সেখানেও কিছুটা ইদে ফিস্ এসে গিয়ে মস্তিষ্ককে নতুন কিছু করতে দেয় না। অর্থাৎ আমি সেই স্মৃতিশাস্ত্রে স্ত্রীজাতি থেকে বেরিয়ে গিয়ে কোনও নতুন কিছুর সন্ধানে লাগতে পারিনে। এই বিষয়ে অত্যন্ত কাঁচা বই বেরুলেও, ওটাতে যে কোনও তত্ত্ব নেই জেনেশুনেও সেইটেই পড়ি। দেখি তার বক্তব্য কোথায় কোথায় আমার সিদ্ধান্তের সঙ্গে ক্লিক্ করছে, যার কোথায় কোথায় করছে না। এতে করে কোন নবীন জ্ঞান সঞ্চয় হয়, কোন চরম মোক্ষপ্রাপ্তি! আর ওদিকে পড়ে রইল জ্ঞান-বিজ্ঞান ভুবনের নবাবিষ্কৃত খনির নব নব মণি-ভাণ্ডার– অবহেলা অনাদরে। ঠাকুরমাকে এনে দিলুম বড়দিনের নতুন স্কার্ট, জ্যাকেট, বনেট, জুতো। ঠাকুরমা মুখ গুঁজে রইলেন তাঁর স্ত্রী-ধনের সারাটোগা সিন্দুকের ভিতর। সেনিলিটি, ভীমরতি, ইদে ফিকস্।
